চাল নিয়ে চালবাজির শংকা!
প্রকাশিত হয়েছে : ২৪ জুলাই ২০২৩, ১২:৩০:৩৪ অপরাহ্ন
বাসমতি চাল ছাড়া সব ধরনের চাল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে ভারত। দেশের অভ্যন্তরে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে এ পদক্ষেপ নিয়েছে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার। ব্যবসা বাণিজ্যভিত্তিক প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদ মাধ্যমে সিএনবিসি’র এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানা গেছে। এতে বলা হয়, এল নিনো আবহাওয়ার প্রভাবে চলতি বছর ভারতে ধান উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। এতে চালের দাম বেড়ে গেছে। মূলত: তাতে লাগাম টানতে রপ্তানি এবং দেশের অভ্যন্তরে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে খাদ্যপণ্যটির রপ্তানি নিষিদ্ধ করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। এতে বিশ্ববাজারে সরবরাহ সংকট দেখা দেয়ায় উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। এর জেরে ইতোমধ্যে অনেক দেশে চালের দর বৃদ্ধি পেয়েছে। ভিয়েতনামে রপ্তানি মূল্য বিগত ১০ বছরের মধ্যে সর্বাধিক উচ্চতায় পৌঁছেছে।
প্রতিবেদন অনুসারে এ সপ্তাহে প্রতি মেট্রিক টন ভিয়েতনামের ৫ শতাংশ ভাঙা চালের দর স্থির হয়েছে ৫১৫ থেকে ৫২৫ ডলারে। ২০১১ সালের পর যা সবচেয়ে বেশী। গত সপ্তাহে যা ছিলো ৫১০ থেকে ৫১৩ ডলার।
লক্ষণীয় যে, বিশ্বাবাজারে গমসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের দাম নিম্নমুখী হলেও বাংলাদেশে প্রধান খাদ্যপণ্য চালসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম অস্বাভাবিক। মূল্যস্ফীতি সাধারণ সীমিত আয়ের মানুষের সহ্যের বাইরে। এ অবস্থায় এক অসহনীয় আর্থিক দুরবস্থার শিকার এদেশের কোটি কোটি মানুষ। এ অবস্থায় ভারতের চাল নিষেধাজ্ঞার ফলে বাংলাদেশে চালের মূল্যবৃদ্ধির শংকা সৃষ্টি হয়েছে। কারণ বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশী চাল আমদানি করে ভারত থেকে। এক হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে আমদানিকৃত চালের ৪০ শতাংশই আসে ভারত থেকে।
বাংলাদেশে এবার ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। চালের মজুতও যথেষ্ট। চালের দামও মোটামুটি স্থির রয়েছে। কিন্তু হঠাৎ করে ভারতের চাল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা যাতে বাংলাদেশের বাজারে কোন বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি না করে সেদিকে সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের কড়া নজরদারি প্রয়োজন। অভিযোগ রয়েছে, বাণিজ্যমন্ত্রীসহ এদেশের অনেক নেতামন্ত্রী এমপি’র চালসহ বিভিন্ন পণ্যের আড়ত ও ব্যবসা রয়েছে। এ নিয়ে সাম্প্রতিককালে মিডিয়ায় বহু আলোচনা সমালোচনা হয়েছে। দেশের চালসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম না কমার পেছনে এ ধরনের সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের কারসাজি ও কূটকৌশলকে দায়ী করেছেন অর্থনীতিবিদ ও অন্যান্য সচেতন মহল। তাদের মতে, দেশে যথেষ্ট চাল উৎপাদন হওয়া সত্বেও এবং চালের ভালো মজুদ থাকা সত্বেও শুধু কিছু ব্যবসায়ীকে সুবিধা দেওয়ার জন্য বিদেশ তথা ভারত থেকে চাল আমদানি করতে দেয়া হয়। আমদানি মূল্যের চেয়ে অনেক বেশী দামে তারা চাল বিক্রি করে। এছাড়া দেশের চালের বাজারকে কুক্ষীগত করে কৃত্রিমভাবে তারা দাম বৃদ্ধি করে। বিগত বছরগুলোতে এবং বর্তমানে যে দামে এদেশে চাল বিক্রি হচ্ছে, তা বিস্ময়করভাবে বেশী। কৃষকেরা এই বর্ধিত মূল্য পাচ্ছে না, জনগণের পকেট কাটা অর্থ চলে যাচ্ছে সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের পকেটে। সার বীজ কৃষি উপকরণ ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির ফলে এদেশের কৃষকদের ফসল উৎপাদনের ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সরকারী প্রণোদনা বা ভর্তুকি নেই। এই সুযোগকে কাজে লাগাচ্ছে চাল আমদানিকারকরা। তারা অনেক কম দামে চাল আমদানি করে অস্বাভাবিক বেশী দরে চাল ছাড়ছে বাজারে। দেখা গেছে, যখন ভারত, ভিয়েতনাম, চীন, থাইল্যান্ডে কিংবা মিয়ানমারে এক কেজি চালের দাম বাংলাদেশী মুদ্রায় ৩০-৩৫ টাকা তখন বাংলাদেশে ৫০ থেকে ৭৫ এমনকি ৮০ টাকা। এভাবে মধ্যস্বত্বভোগী আমদানিকারক সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীরা কারসাজি করে প্রতি কেজিতে ২০ থেকে ৫০-৬০ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। যে কেউ একটু খোঁজ নিয়ে বিষয়টির সত্যতা যাচাই করতে পারেন। কিছুদিন আগে এ নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে দেশের একটি শীর্ষ দৈনিক। কিন্তু দেশে কোন জবাবদিহিতা না থাকায় এসব সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। ফলে তাদের অপকর্ম অব্যাহত রয়েছে।
আমরা এই আর্থিক সংকটময় মুহূর্তে ভারত কর্তৃক চাল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা নিয়ে উদ্বিগ্ন। দেশে চালের মজুদ যথেষ্ট। উৎপাদনও ভালো হয়েছে। এ অবস্থায় আমরা ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠ ও স্বার্থের অংশীদার সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীরা যাতে ভারতের চাল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞাকে পুঁজি করে চালের বাজারে কোন সংকট সৃষ্টি না করে সেদিকে কঠোর দৃষ্টি রাখার আহবান জানাচ্ছি। আশা করি খাদ্য ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ সরকারের উর্ধ্বতন মহল এদিকে দৃষ্টি দেবেন।




