বন্ধ হোক এ আত্মঘাতী তৎপরতা
প্রকাশিত হয়েছে : ১৮ আগস্ট ২০২৩, ১২:৩০:৩৪ অপরাহ্ন
গতকাল একটি জাতীয় মিডিয়ায় ‘সিলেটে টিলা কেটে গড়ে ওঠছে আবাসন’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ছোট বড় টিলাকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠেছে সিলেট নগর। কিন্তু গত তিন চার দশকে বহু টিলা কেটে সমতল করে ফেলা হয়েছে। জমির পরিবর্তন করে জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করে এসব জায়গায় আবাসিক এলাকা, আধুনিক ভবন গড়ে তোলা হয়েছে। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) বলেছে, ১৯৫৬ সালে ভূমির জরিপের তথ্যে সিলেটের ৬ উপজেলায় ১ হাজার ২৫ টি টিলার অস্তিত্ব ছিলো। এর বাইরে ৩টি উপজেলায়ও বেশ কিছু টিলা ছিলো। এর মধ্যে অন্ততঃ ১০০ টিলা পুরোপুরি কিংবা আংশিক সাবাড় হয়ে গেছে। সেই ১ হাজার ২৫ টি টিলার মধ্যে নগর ও উপকন্ঠ মিলিয়ে সিলেট সদর উপজেলায় টিলা ছিলো ১৯৯টি। এর বাইরে গোলাপগঞ্জ উপজেলায় ৪১৩ টি, বিয়ানীবাজারে ২৭০ টি, জৈন্তাপুরে ৯৮টি, গোয়াইনঘাটে ৪৪ টি ও কোম্পানীগঞ্জে একটি টিলা ছিলো সে সময়।
সিলেটের জনৈক আঞ্চলিক সেটেলমেন্ট কর্মকর্তা বলেন, ২০০০ সালের জরিপে সিলেট অঞ্চলের ব্যক্তিমালিকানাধীন অনেক টিলার শ্রেণী পরিবর্তন প্রতীয়মান হয়েছে। ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি কেউ চাইলে বেচাকেনা করতে পারেন। অনেকে টিলাকে টিলা বাড়ি হিসাবে রেকর্ড করেছেন। এভাবে শ্রেণী পরিবর্তন করেই এসব টিলা কাটা হয়েছে।
দেখা গেছে, সিলেট নগরীতে যতো টিলা উজাড় হয়েছে তার অধিকাংশ স্থানেই আবাসিক এলাকা গড়ে তোলা হয়েছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে টিলা কেটে সরকারী স্থাপনাও তৈরী করা হয়েছে। পরিবেশবাদীদের অভিযোগ, যুগ যুগ ধরে ভূমি কার্যালয়, পরিবেশ অধিদপ্তরের কার্যালয় এবং সরকারী কর্মকর্তা ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের যোগসাজশে এসব টিলা কাটা হয়েছে। গত দুই দশকে নগরীর আখালিয়া, ব্রাহ্মণশাসন, করেরপাড়া, গ্রিনসিটি, দুসকি, জাহাঙ্গীর নগর, বালুচর ও বড়গুল এলাকায় টিলা কেটে অনেক আবাসিক এলাকা গড়ে তোলা হয়েছে। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সিলেট শাখার মতে, পরিবেশ দপ্তরের নিলিপ্ততার কারণে টিলা কাটা ও টিলা ধ্বংস বন্ধ হচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে এই অধিদপ্তর আইওয়াশধর্মী জরিমানার ঘোষণা দিলেও টিলা কাটা ঠিকই হয়। একই টিলায় একাধিকবার জরিমানা করার নাটক করা হয়েছে বলে তাদের অভিযোগ। অবশ্য এসব অভিযোগের জবাবে পরিবেশ অধিদপপ্তরের সিলেট বিভাগীয় পরিচালক বলেন, টিলা কাটা বন্ধে আমরা গত ২ বছরে ১০০ টি অভিযান পরিচালনা করেছি। দুই থেকে আড়াই কোটি টাকার বেশী জরিমানা করা হয়েছে।
পরিবেশ আন্দোলনের জনৈক সংগঠক বলেন, জরিমানা কিংবা মামলা করেও টিলা কাটা বন্ধ করা যায়নি। এসবই মূলতঃ আইওয়াশ। জরিমানা ও মামলার মধ্যেও টিলা কাটার অনেক ঘটনা ঘটতে দেখা গেছে। সর্ষের মধ্যে ভূত থাকলে যা হয়, তাই হচ্ছে।
লক্ষণীয় যে, পাহাড় টিলা ও জঙ্গলবেষ্ঠিত সিলেট অঞ্চলের আবহাওয়া দীর্ঘকাল যাবৎ শান্ত শীতল ও মনোরম। আর এজন্যই এই অঞ্চল গোটা দেশের মানুষকে আকর্ষণ করে। এমন অনেক মানুষ আছেন, যারা এই অঞ্চলে চাকুরী ও কাজের জন্য এসে এই অঞ্চলের মনোরম পরিবেশ ও আবহাওয়ার প্রতি আকৃষ্ঠ হয়ে এখানেই স্থায়ী বসতি গড়ে তুলেছেন। এছাড়া সিলেট অঞ্চল প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও মনোরম আবহাওয়ার জন্য পর্যটন অঞ্চল হিসেবে দেশ বিদেশে পরিচিত। কিন্তু সিলেটের এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও আবহাওয়ার প্রধান বৈরী হয়ে দাঁড়িয়েছে নির্বিচারে টিলা কর্তন ও বনাঞ্চল উজাড়। সরকারী টিলাভূমি ও বনাঞ্চল উজাড়ে সম্মুখ সারিতে রয়েছে স্থানীয় প্রভাবশালী চক্র, বর্তমানে ক্ষমতাসীন মহল। সংশ্লিষ্ট সরকারী কর্মকর্তাদের যোগসাজশে চলছে এমন অবৈধ ও অন্যায় তৎপরতা। বেসরকারী পর্যায়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের একশ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তাদের সহায়তায় চলছে টিলা কর্তন, যা ইতোমধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। সর্বোপরি পরিবেশের ভারসাম্য নষ্টকারী এ ধরনের কর্মকান্ডের ফলে সিলেটসহ গোটা দেশের আবহাওয়ার এখন এক বিরূপ প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ইতোমধ্যে এক সময়ের শান্ত শীতল ও মনোরম অঞ্চল সিলেটসহ গোটা দেশের উষ্ণতা বৃদ্ধি পেয়েছে, যার ফলে নানা ধরণের অসুখ বিসুখ দেখা দিচ্ছে। দিন দিন এটা বাড়ছে। এ অবস্থায় টিলা কর্তন, বনাঞ্চল উজাড়করণসহ প্রকৃতির ভারসাম্য বিনষ্টকারী তৎপরতা ও কর্মকান্ড বন্ধ করা অতীব জরুরী হয়ে পড়েছে। নিজেদের অস্তিত্বের স্বার্থেই এটা করতে হবে, নইলে সামান্য অর্থের লোভে কৃত এসব কর্মকান্ড অচিরেই আত্মঘাতী ও বিপর্যয় সৃষ্টিকারী কর্মকান্ড হয়ে যে দেখা দেবে, এতে কোন সন্দেহ নেই।




