যুক্তরাজ্যে লেবার পার্টির নিরংকুশ জয়
প্রকাশিত হয়েছে : ০৬ জুলাই ২০২৪, ১২:৩০:১৮ অপরাহ্ন
নির্বাচনপূর্ব জরীপকে সত্য প্রমাণ করে লেবার পার্টির নিরংকুশ জয় হয়েছে যুক্তরাজ্যের জাতীয় নির্বাচনে। দেশটিতে টানা ১৪ বছর ক্ষমতা থেকে সরে গেলো রক্ষণশীল দল। বিদায় নিতে হলো প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাককে। তিনি পরাজয় মেনে নিয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার সকাল ৭টা থেকে ব্যালটের মাধ্যমে ভোট গ্রহণ শুরু হয়। চলে রাত ১০টা পর্যন্ত। নির্বাচনে ছোট বড় মিলিয়ে অন্তত: ৯৮টি রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করে। ৩৫টি রাজনৈতিক দল মাত্র ১জন করে প্রার্থী দেয়। রেকর্ড ভেঙে এবার ৪ হাজার ৫১৫ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। একেকটি আসনে গড়ে ৭ জন করে প্রার্থী। ৩১৭ টি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী ৪৫৯ জন। যুক্তরাজ্যে এবার সাধারণ নির্বাচনে বিভিন্ন দলের মনোনয়নে প্রার্থী হন বেশ কয়েকজন বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক। এর বাইরে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন অনেকে। সব মিলিয়ে অন্ততঃ ৩৪ জন বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। বাংলাদেশী প্রার্থীদের মধ্যে ৮ জন লেবার পার্টি এবং ২ জন রক্ষণশীল দল থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এছাড়া ওয়ার্কার্স পার্টি অব ব্রিটেন থেকে ৬ জন, রিফর্ম পার্টি থেকে ১ জন, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি থেকে ১ জন, স্কটিশ ন্যাশনালিষ্ট পার্টি থেকে ১ জন, আর স্বতন্ত্র থেকে ১১ জন বাংলাদেশী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন ব্রিটেনের জাতীয় নির্বাচনে। সর্বোপরি যুক্তরাজ্যের নির্বাচনে প্রায় ৯৮টি রাজনৈতিক দল অংশ নিয়েছে। হাউস অব কমন্সের ৬৫০টি আসনের বিরুদ্ধে ভোটযুদ্ধে শরিক হন সাড়ে ৪ হাজারেরও বেশী প্রার্থী।
লেবার পার্টির নিরংকুশ বিজয়ের ফলে যুক্তরাজ্যের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন কেইর স্টার্মার। ধারণা করা হচ্ছে, ভোটের মাঠে লেবার পার্টির এমন সাড়া জাগানো সাফল্যের নেপথ্য নায়ক স্যার কেইর স্টার্মার। কেইর স্টার্মারের জন্ম রাজধানী লন্ডনে। ৬১ বছর বয়সী স্টার্মার রাজনীতিতে আসার আগে ছিলেন একজন মানবাধিকার আইনজীবী। যুক্তরাজ্যের পাবলিক প্রসিকিউশন দপ্তরের পরিচালক পদে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।
২০২০ সালের এপ্রিলে লেবার পার্টির নেতা হিসেবে দায়িত্ব নেন স্টার্মার। জেরেমি করবিনের স্থলাভিষিক্ত হন তিনি। দায়িত্ব নিয়ে দলকে যুক্তরাজ্যের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসেন তিনি। নির্বাচনের আগে বাংলাদেশী অভিবাসীদের নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন। অবশ্য পরে তিনি সুর নরম করে বাংলাদেশী কমিউনিটির নিকট দুঃখ প্রকাশ করেন। এক পর্যায়ে তিনি বলেন, আমি কারো অনুভূতিতে আঘাত করতে চাইনি। কিন্তু আমি প্রকৃত অর্থে উদ্বিগ্ন যে আমি সেটি করেছি। বলা বাহুল্য, লেবার পার্টি ও বাংলাদেশী কমিউনিটির মধ্যে সম্পর্ক যেমন দীর্ঘকালের তেমনি অত্যন্ত শক্তিশালী।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কনজারভেটিভ পার্টি অর্থাৎ রক্ষণশীল দলের এবারের নির্বাচনে ভরাডুবির অন্যতম প্রধান কারণগুলোর মধ্যে তাদের অভিবাসন সংক্রান্ত রুয়ান্ডা নীতি, এনএইচএস-এর ওয়েটিং লিস্ট কমাতে ব্যর্থতা ও চিকিৎসকদের উপুর্যুপরি ধর্মঘট, আবাসন সংকট ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা অন্যতম। এছাড়া স্বজনদের যুক্তরাজ্যে আনতে স্পন্সরশীপের জন্য বেতনের থ্রেশোড বা আয়সীমা বৃদ্ধিও ক্ষুব্ধ করেছে অনেককে।
বলা বাহুল্য, ক্ষমতা গ্রহণের পর লেবার পার্টিকে সর্বাগ্রে অর্থনৈতিক সমস্যা মোকাবেলার দিকে মনোযোগ দিতে হবে। ইনস্টিটিউট ফর ফিসক্যাল স্টাডিজের (আইএসএফ) হিসেবে গত দেড় দশকে যুক্তরাজ্যে আয় বেড়েছে সবচেয়ে ধীরগতিতে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি এবং বেতন না বাড়ায় ব্রিটেনের জনগণ তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় সংকুলানে হিমশিম খাচ্ছেন। এছাড়া রয়েছে আবাসন সংকট। এজন্য সম্পত্তির দাম ও ভাড়া বৃদ্ধি এবং নতুন ভবন নির্মাণের খরচ বৃদ্ধি বিশেষভাবে দায়ী।
লেবার পার্টি তাদের নির্বাচনপূর্ব ইশতেহারে বলেছে, আবাসন সমস্যার মধ্যে ২০২৩ সালে বাড়ি নির্মাণের যেসব কর্মসূচি বাতিল হয়েছিলো, এবারের নির্বাচনে জয় পেলে তারা সেই কাজগুলো ফের চালু করবেন। সামনের বছরগুলোতে ১৫ লাখ ঘরবাড়ি নির্মাণের লক্ষ্য রয়েছে তাদের। যুক্তরাজ্যের জনগণের প্রত্যাশা, দীর্ঘদিন পর ক্ষমতায় আসা লেবার পার্টি দেশের জনগণের বিশেষভাবে কম সুবিধাভোগী শ্রমিকশ্রেণীর দীর্ঘদিনের দুঃখ-দুর্দশা লাঘব ও প্রত্যাশা পূরণে বহুলাংশে সফল হবে, যা কনজারভেটিভদের দীর্ঘকালীন শাসনামলে সম্ভব হয়নি।
একথা অনস্বীকার্য যে, লেবার পার্টির এমন জয়ের জন্য চাতক পাখির মতো আশা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষায় ছিলেন বিশাল প্রবাসী বাংলাদেশী কমিউনিটি। লেবার পার্টির রাজনীতিতে বহু বাংলাদেশী নেতানেত্রী সক্রিয়ভাবে জড়িত। আশা করা যায়, সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় যুক্তরাজ্যের জনগণের ভাগ্যোন্নয়নের পাশাপাশি প্রবাসী বাংলাদেশী জনগোষ্ঠীর বিদ্যমান সমস্যা ও সংকট বহুলাংশে দূর হবে এবং আগামী দিনগুলো আগের চেয়ে সুন্দর ও সমৃদ্ধ হবে। নির্বাচনে লেবার পার্টির বিজয়ে তাদের নেতা কেইর স্টার্মারসহ সংশ্লিষ্ট সকল নেতাকর্মীদের অভিনন্দন জানাচ্ছি। অভিনন্দন জানাচ্ছি বিজয়ী ব্রিটিশ বাংলাদেশী প্রার্থীদের।




