আমলাদের বিরুদ্ধে মামলার ঝড়!
প্রকাশিত হয়েছে : ১৫ অক্টোবর ২০২৪, ১২:৩৫:১৮ অপরাহ্ন

গতকাল মিডিয়ায় ‘দুর্নীতিগ্রস্ত আমলারা আতঙ্কে’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ‘গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর জনপ্রশাসনের দুর্নীতিগ্রস্ত শীর্ষ কর্মকর্তাদের নামে একের পর এক মামলা হচ্ছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে উচ্চপদস্থ এতো আমলার বিরুদ্ধে মামলা কিংবা গ্রেফতারের ঘটনা আর কখনো ঘটেনি।
জানা গেছে, শেখ হাসিনার মূখ্য সচিব কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী, আবুল কালাম আজাদ ও নজিবুর রহমান ইতোমধ্যে গ্রেফতার হয়েছেন। অন্য দুই মূখ্যসচিব তোফাজ্জল হোসেন মিয়া ও আহমেদ কায়কাউসের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। একজন দেশের বাইরে, অন্যজন আত্মগোপনে। প্রশাসনের আরেক শীর্ষ পদ মন্ত্রী পরিষদ সচিব। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দায়িত্বে থাকা দুই মন্ত্রী পরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম ও কবির বিন আনোয়ারের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। আরেক মন্ত্রী পরিষদ সচিব মাহবুব হোসেনের নামে মামলা হয়েছে। গত ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হওয়ার পর থেকে ২ মাসে বেশ কয়েকজগন সচিবকে ওএসডি করা হয়েছে এবং বেশ কয়েকজনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে মামলা হচ্ছে। এছাড়া ইতোমধ্যে গ্রেফতার হয়েছেন ৪ জন সচিব। তারা হলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মোঃ জাহাঙ্গীর আলম এবং একই মন্ত্রণালয়ের আরেক সাবেক জ্যেষ্ঠ সচিব শাহ কামাল এবং সাবেক যুব ও ক্রীড়া সচিব মেজবাহ উদ্দীন আহমদ। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সাবেক জ্যেষ্ঠ সচিব মেজবাহ উদ্দিন চৌধুরী ও ফয়েজ আহমদ এবং সাবেক সচিব আনিসুর রহমানের বিরুদ্ধেও মামলা হয়েছে।
সাবেক সচিব ও বাংলাদেশ লোক প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের রেক্টর এ কে এম আব্দুল আউয়াল মজুমদার বলেন, সরকার আসবে, সরকার যাবে। আমলাদের নিরপেক্ষ থাকতে হবে। কিন্তু গত ১৫ বছরে দলীয় আমলাতন্ত্র হয়েছে। আমলারা রাজনীতিবিদদের সাথে মিশে গেছেন। যার খেসারত এখন দিতে হচ্ছে।
বলা বাহুল্য, অতীতে আরো অনেক সরকার এসেছে। এক সময় সেই সরকার বিদায় নিয়েছে। কিন্তু এটা আমলাদের মধ্যে তেমন কোন প্রভাব ফেলতে দেখা যায়নি। সরকার পরিবর্তনে বড় জোর সচিব আইজি ইত্যাদি শীর্ষ পদে কিছু রদবদল হয়েছে। কিন্তু সরকার পতনের পর পাইকারী হারে আমলাদের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেফতার হতে কখনো দেখা যায়নি। এমনকি দুর্নীতি দমনে নিয়োজিত দুদকের শীর্ষ ব্যক্তির বিরুদ্ধেও দুর্নীতির মামলা হতে দেখা যাচ্ছে এবার।
ইতোপূর্বে একবার আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর বিএনপিপন্থী আখ্যা দিয়ে বহু কর্মকর্তাকে ওএসডি করা হয়। কিন্তু কাউকে জেলে পাঠানো হয়নি কিংবা কারো বিরুদ্ধে মামলাও দায়ের করা হয়নি। এক্ষেত্রে এসব কর্মকর্তার অপরাধ ছিল তারা ক্ষমতাসীন দল বিএনপিকে পছন্দ করতেন। এজন্য অনেকে পদোন্নতিসহ বাড়তি নানা সুযোগ সুবিধা নিয়েছিলেন। কিন্তু বিগত ১৫ বছরের আওয়ামী শাসনামলে প্রশাসনকে সম্পূর্ণ আওয়ামীকরণ করা হয়। অতীতে ছাত্রলীগ বা আওয়ামী লীগ করেছেন, এমন ব্যক্তিদের যোগ্যতা না থাকা সত্বেও সচিব পরিচালক বা এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়। এক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠতার নিয়মনীতিসহ সরকারী চাকুরীবিধির প্রতি কোনরূপ তোয়াক্কা করা হয়নি। শুধু তা-ই নয়, উচ্চপদসহ নিম্নপর্যায় পর্যন্ত বিএনপি সমর্থক দূরে থাক, আওয়ামী লীগ পন্থী বা আওয়ামী লীগের লোক ছাড়া কাউকে নিয়োগ দান প্রায় নিষিদ্ধ করা হয়। এজন্য কড়া পুলিশ ভেরিফিকেশনের ব্যবস্থা করা হয়।
প্রধানমন্ত্রীর জনৈক উপদেষ্টা প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন যে, ছাত্রলীগ ছাড়া কাউকে সরকারী চাকুরীতে নিয়োগ দেয়া হবে না। ফলে অনেক প্রার্থী বিসিএসে বার বার সুপারিশ লাভের পরও শুধু পুলিশী ক্লিয়ারেন্স না পাবার কারণে বিসিএস ক্যাডার হতে পারেননি। এভাবে সম্পূর্ণ প্রশাসনকে দলীয়করণ করেই ক্ষান্ত হয়নি আওয়ামী লীগ সরকার। সমগ্র আমলা গোষ্ঠীকে দুর্নীতির সুযোগও করে দেয়। আর এই সুযোগ গ্রহণ করে অনেক শীর্ষ আমলা শত শত এমনকি হাজার কোটি টাকার মালিক বনে যান কয়েক বছরের মধ্যেই। এজন্য শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্ব যেমন দায়ী, তেমনি দায়ী আমলা কর্মকর্তা নিজেরাও। আমলারা যদি গোড়া থেকেই সরকারের এমন অপরাধ অপকর্মের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতেন, তবে সরকার তথা নেতামন্ত্রীরা এতো ব্যাপক হারে দুর্নীতি করতে পারতেন না। কিন্তু এটা করেননি তারা। করেননি এজন্য যে তারা আমলা হলেও সবাই ছিলেন দুর্নীতিবাজ রাজনৈতিক শাসক দলের অতীত নেতাকর্মী বা সমর্থক। ফলে যা হবার, তা-ই হয়েছে। সরকার পরিবর্তনের পর রীতিমতো বিপর্যয় নেমে এসেছে তাদের মাথার ওপর। এসব থেকে বর্তমান আমলা কর্মকর্তা কর্মচারীদের শিক্ষা নেয়ার অনেক কিছুই আছে। আমাদের প্রত্যাশা, বর্তমান প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এদিকে বিশেষ দৃষ্টি ও মনোযোগ দেবেন, শিক্ষা গ্রহণ করবেন।



