বিশেষ সম্পাদকীয় : নিষ্ঠাবান সহকর্মী তুরাবের মর্মান্তিক বিদায়
প্রকাশিত হয়েছে : ১৯ জুলাই ২০২৫, ১১:০০:২২ অপরাহ্ন
মুকতাবিস উন নূর ::
এটিএম তুরাব, দৈনিক জালালাবাদ পরিবারে আমাদের সর্বকনিষ্ঠ সহকর্মী ছিলো। ফটোগ্রাফার হিসাবে জালালাবাদে যোগ দিলেও তার মেধা ও দক্ষতার কারণে সে স্টাফ রিপোর্টার পদে উন্নীত হয়। একপর্যায়ে সে জাতীয় দৈনিক নয়াদিগন্তের সিলেট ব্যুরো প্রধানের দায়িত্ব অলংকৃত করে। মৃত্যুর মাস কয়েক আগে অভিবাসন বিষয়ে সাংবাদিকদের একটি জাতীয় প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে তুরাব প্রথম পুরস্কার লাভ করে মেধার স্বাক্ষর রাখে।
তুরাব আমার কনিষ্ঠতম সহকর্মী হওয়া সত্ত্বেও তার সাথে আমার সম্পর্ক ছিলো অত্যন্ত গাঢ়। তুরাবের পিতা বিয়ানীবাজার প্রেসক্লাব সভাপতি মাস্টার আব্দুর রহীম তুরাবকে সবসময় গাইড করার অনুরোধ আমাকে করতেন। তিনি মৃত্যুর কয়েকদিন আগে ইবনে সিনা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আমার হাতে হাত রেখে তুরাবকে আমার হাতে সঁপে দেন। আমিও তুরাবকে আমার প্রিয় সহচর হিসাবে গ্রহণ করি। সেও আমাকে পিতৃতুল্য সম্মান করতো। তুরাব ও আমার বাসা কাছাকাছি হওয়ায় প্রতিরাতে অফিস শেষে তার মোটরসাইকেলে চড়েই আমি বাসায় ফিরতাম।
তুরাবের মর্মস্পর্শী মৃত্যুর মাত্র ৪ দিন আগে আমি বিশেষ প্রয়োজনে লন্ডন যাত্রা করি। আমার যাওয়ার দিন সিলেটের চিনি চোরাচালান বিষয়ে তুরাবের একটি অনুসন্ধানী নিউজ জালালাবাদে লীড নিউজ হিসাবে প্রকাশিত হয়, যা আমি দেখে ছাড়ি। এই রিপোর্টে চোরাচালানের সাথে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ রাজনীতি সংশ্লিষ্ট অনেকের নাম উল্লেখ ছিলো। হয়তো এই রিপোর্টও তাকে টার্গেট কিলিংয়ের অন্যতম কারণ।
তুরাবের মর্মান্তিক মৃত্যুর মাত্র কয়েকঘন্টা আগে ১৮ জুলাই বাংলাদেশ সময় রাত ৩টায় তুরাব ভিপিএন মাধ্যমে আমাকে ফোন করে জানায় ইন্টারনেট সমস্যার কারণে দেশ থেকে অনলাইনে নিউজ আপলোড করা যাচ্ছে না, আমি যেন তার দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ নিউজগুলো আপলোড করি। তুরাবের পত্রিকার ডিউটি রাত ১০ টা সাড়ে দশটা পর্যন্ত। কিন্তু সে গভীর রাতে যখনই কোন গুরুত্বপূর্ণ নিউজ পেতো আমাকে তা শেয়ার করে অনলাইনে দিতো। তুরাবের কর্মনিষ্ঠার এমন অসংখ্য উদাহরণ আছে।
আমি পরদিন কথা হবে বলে ফোন রাখি, নিউজগুলো আপলোড করে ঘুমিয়ে পড়ি। পরদিন ১৯ জুলাই ঘুম থেকে উঠে বাইরে বের হবো। লণ্ডন সবেমাত্র দুপুর শুরু হচ্ছে, এর মধ্যে জালালাদের যুগ্ম বার্তা সম্পাদক আহবাব মোস্তফা খান বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে তুরাবের মর্মান্তিক মৃত্যুর দুঃসংবাদটি জানায়। আমি হতবিহ্বল হয়ে পড়ি। ধাতস্থ হওয়ার পর লণ্ডনে বাংলাদেশী সহকর্মীদের দুঃসংবাদটি জানাই। পরে আমরা লণ্ডন-বাংলা প্রেসক্লাবে একত্রিত হই।
সাহসী ও নিষ্ঠাবান সাংবাদিক তুরাবের গায়ে ঘটনার সময় ‘প্রেস’ লেখা জ্যাকেট ছিলো, হাতে ক্যামেরা ছাড়া কিছুই ছিলো না, অথচ ঘাতক পুলিশ ও তাদের দোসররা তার দিকে বৃষ্টির মতো গুলি ছুঁড়ে। হাসপাতালের ফরেনসিক রিপোর্ট অনুযায়ী তার সারা শরীরে ৯৮ টি ছররা গুলি বিঁধেছিলো।
তুরাবের হত্যাকাণ্ড সুপরিকল্পিত এতে সন্দেহের বিন্দুমাত্র অবকাশ নেই। ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে একজন পুলিশ অফিসার তার সিপাহির হাত থেকে অস্ত্র কেড়ে নিয়ে তুরাবকে লক্ষ্য করে গুলি করেছেন। টার্গেট করে একজন অনডিউটি সাংবাদিককে গুলি করে নির্মমভাবে হত্যার কারণ ও এর সাথে জড়িত অন্যদের শনাক্তক্রমে তুরাব হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্তদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে দৃষ্টান্তমূলক শান্তি তুরাব পরিবার ও তার সহকর্মীদের মূল দাবি। একইসাথে সাংবাদিকদের সুরক্ষা নিশ্চিতে কঠোর আইন প্রণয়নসহ সকল পদক্ষেপ রাষ্ট্রকে নিতে হবে।
পরিশেষে আমাদের প্রিয় সহকর্মী তুরাবের মানবীয় ত্রুটি বিচ্যুতি ক্ষমা করে আল্লাহপাক তাকে শাহাদতের মর্যাদা ও জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন। আমিন






