এক অসামান্য সাফল্য গাথা
প্রকাশিত হয়েছে : ০৮ আগস্ট ২০২৫, ৮:২৮:৫১ অপরাহ্ন

সম্প্রতি একটি জাতীয় মিডিয়ায় ‘খামারের মাছ-মাংস আর ফল-ফসলে স্বপ্নের মতো জীবন হান্নানের’ শীর্ষক একটি চমৎকার প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এতে মোঃ আবদুল হান্নান নামক একজন অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তার এক অসামান্য সাফল্যের খবর প্রকাশিত হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গোলা ভরা ধান আর পুকুর ভরা মাছের স্বপ্ন কতজনই না দেখেন। তবে মৌলভীবাজার সদর উপজেলার বাহারমর্দন গ্রামের মোঃ আব্দুল হান্নানের মতো কয়জন সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে পারেন। অবসরপ্রাপ্ত এই ব্যাংক কর্মকর্তা নিজের জমিতে প্রয়োজনীয় প্রায় সব খাদ্যপণ্য উৎপাদন করেন। লবন-চিনি ছাড়া বাজার থেকে তেমন কিছু কিনতে হয় না তাঁর। শাকসবজী, ফলমূল, মাছ, ডিম ও মাংস-সবই আসে নিজের খেত, খামার, বাগান ও পুকুর থেকে। আবদুল হান্নান ছিলেন একজন বেসরকারী ব্যাংকের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। অবসর জীবনে তিনি মাটির টানেই ফিরে গেছেন চাষাবাদে, যা ছিলো তার শৈশবের আকর্ষণের বিষয়। শুরু করেন শাকসবজি, মসলা, দেশী বিদেশী ফল, মাছ এবং দেশী জাতের মোরগ পালন। তার বাগানে শোভা পাচ্ছে সৌদীর খেজুর থেকে শুরু করে অ্যাভাকাডো, জলপাই, আতাসহ দেশী বিদেশী নানা ফল। পুকুরে চাষ হচ্ছে রুই কাতলা, মৃগেল, কার্প, পাঙ্গাসসহ বিভিন্ন জাতের মাছ। প্রয়োজন হলেই পুকুরে বড়শি ফেলেন তিনি।
আব্দুল হান্নান বলেন, চাকরী থেকে অবসর নেওয়ার পর চাষাবাদের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে নেন। প্রায় ৬০ শতাংশ জমিতে শাকসবজি ও মসলার চাষ শুরু করেন। ধান চাষ আগে থেকেই করতেন। পেঁয়াজ, রসুন, আদা, হলুদ, শর্ষে, দারুচিনি, মরিচ, ধনিয়া, তেজপাতা সবই নিজে উৎপাদন করেন। শর্ষে থেকে পরিবারের ভোজ্য তেলের চাহিদা পূরণ হচ্ছে। ৬০ শতাংশ জমিতে দেশী বিদেশী ফলের চাষ করেছেন। সৌদী খেজুরের একটি গাছে এবার খেজুর এসেছে। ১০০ থেকে ১৫০ টি দেশী জাতের মোরগ-মুরগী পালন করছেন। সেখান থেকে ডিম ও মাংসের চাহিদা পূরণ হচ্ছে। পরিবারের প্রয়োজন মিটিয়ে উদ্ধৃত্ত ফল ও পণ্য বাজারে বিক্রিও করেন আবদুল হান্নান। বেশ তৃপ্তি নিয়ে তিনি বলেন, লবণ ও চিনি ছাড়া আর কিছু কিনি না। মাছ মাংস ফল ফসল সব নিজেই উৎপাদন করি। চেষ্টাটাই আসল। খুব বেশী খরচ না করেও অনেক কিছু সম্ভব।
অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা আবদুল হান্নানের উপরোক্ত সাফল্যের কাহিনী শুধু ব্যক্তি পর্যায়েই নয়, জাতীয় পর্যায়েও আশা ও আলোক সঞ্চারী। মহান সৃষ্টিকর্তা বাংলাদেশকে অজ¯্র দানে ধন্য করেছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বড়ো নেয়ামত হচ্ছে এদেশের উর্বর জমি। এখানে অতি সহজেই দেশী বিদেশী যে কোন শস্য ও ফলের গাছ জন্মানো যায়। আঙ্গুর ও খেজুরের মতো অনেক বিদেশী ফল এখন এদেশেই উৎপন্ন হচ্ছে। গত বছর একটি জাতীয় মিডিয়ায় ‘বিদেশী ফলে ভরছে দেশের মাঠ’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এতে বলা হয়, ড্রাগনসহ ৩৪টি বিদেশী ফল এখন দেশেই চাষ হচ্ছে। এর মধ্যে ৮টির চাষ হচ্ছে বাণিজ্যিকভাবে। লাভ হওয়ায় চাষ বাড়ছে। দেশে এসব ফল পাওয়া যাচ্ছে, তাই কমছে আমদানি, সাশ্রয় হচ্ছে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলেছেন, দেশে বর্তমানে ৭২ রকমের ফল চাষ হচ্ছে। এর প্রায় অর্ধেকই বিদেশী ফল। দেশে উৎপাদিত বিদেশী ফলের বাজার মূল্য প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা। তথ্য অনুযায়ী, বিদেশী ফল এদেশের মানুষের ভিটামিনের চাহিদা পূরণে মূল্যবান ভূমিকা রাখছে। ৩৮ জেলায় এখন ড্রাগন ফলের চাষ হচ্ছে, মাল্টার চাল হচ্ছে ২৮ জেলায়, কমলা ২১ জেলায়, স্ট্রবেরি ১৩ জেলায়, রকমেলন ৭ জেলায় এবং থাই পেয়ারা ও সৌদী খেজুরের চাষ হচ্ছে ৬ জেলায়। দেশে চাষ হওয়া অন্য বিদেশী ফলগুলোর মধ্যে রয়েছে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার রাম্বুটান, মেক্সিকো ও মধ্য আমেরিকার অ্যাভোকাডো, চীনের পাসিমিন, লংগান, বারোমাসি আঠাবিহীন কাঁঠাল, থাই কুল, পেঁপে ইত্যাদি।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে বিদেশী ফলের বাজার ১০ হাজার কোটি টাকারও বেশী। দেশে বিদেশী ফল উৎপাদন হওয়ায় আমদানি কমেছে।
বলা বাহুল্য, শুধু ফলমূলই নয় অন্যান্য খাদ্যপণ্যেও বাংলাদেশের মানুষ যে আত্মনির্ভরশীল হতে পারে, এর উজ্জ্বল উদাহরণ অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা আবদুল হান্নান। আর এভাবে এদেশে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পেলে যে আর্থিক সংকট বা মন্দায় সহজেই উৎরে যেতে পারবে বাংলাদশ। যেমনটি সম্ভব হয়েছিলো আশির দশকের বিশ^ মন্দার সময়ে।



