বিশ্ববিদ্যালয়ে উপেক্ষিত গবেষণা কার্যক্রম
প্রকাশিত হয়েছে : ১৫ আগস্ট ২০২৫, ১২:৩০:০১ অপরাহ্ন

দেশের শিল্পখাতকে প্রায় ধ্বংস করে ফেলেছিলো স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকার। তারা দেড় দশকের শাসনকালে প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা খাতকে পর্যন্ত তছনছ করে ফেলেছিলো। স্কুল পর্যায়ের শিক্ষাকে খেল তামাশা এবং কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চ পর্যায়ের শিক্ষাকেন্দ্রগুলোকে পরিণত করেছিলো রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি, দুর্নীতি ও নানা ব্যক্তিগত, গোষ্ঠীগত দলীয় সুযোগ সুবিধা লাভের স্থান বা মাধ্যম হিসাবে। কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ধ্বংসস্তূপ থেকে শিক্ষাকে বের করে এনে যথাস্থানে সন্নিবেশিত করার চেষ্টা করছেন। এর একটি প্রমাণ হলো, সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয় শিক্ষা খাতে উচ্চতর গবেষণা সহায়তা কর্মসূচির আওতায় ২০২৫-২৬ অর্থ বছরের জন্য গবেষণা প্রস্তাব আহবান করেছে। দেশের সরকারী-বেসরকারী বিশ^বিদ্যালয় ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষক গবেষকরা আবেদন করতে পারবেন। এতে ১১টি গবেষণা ক্ষেত্র নির্ধারণ করা হয়েছে। সেগুলো হলো, শিক্ষা, কৃষি, জীবন-সম্পর্কিত বিজ্ঞান, ভৌত বিজ্ঞান, সামাজিক বিজ্ঞান, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি), মৎস্য, ব্যবসায় শিক্ষা, বাংলাদেশ উন্নয়ন অধ্যয়ন, প্রকৌশল ও প্রযুক্তি এবং উন্নয়ন ও জননীতি। সরকারী-বেসরকারী বিশ^বিদ্যালয়ের পাশাপাশি জাতীয় বিশ^বিদ্যালয় ও উন্মুক্ত বিশ^বিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজের শিক্ষক, গবেষক এবং সরকারী বা স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও আবেদন করতে পারবেন। এক্ষেত্রে মৌলিক ও ফলিত গবেষণাকে অগ্রাধিকার দেয়া হবে।
বলা বাহুল্য, বিশ^বিদ্যালয়ে গবেষণা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া, যা জ্ঞান সৃষ্টি, নতুন ধারণা তৈরী এবং সমাজের বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে সহায়তা করে। বিশ^বিদ্যালয়গুলো মূলত: উচ্চশিক্ষা প্রদান ও গবেষণার কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। এখানে মৌলিক ও ফলিত উভয় প্রকার গবেষণা হয়ে থাকে, যা একাডেমিক ও সমাজের উন্নয়নে অবদান রাখে।
দুর্ভাগ্যের বিষয়, বিগত দীর্ঘকাল বিশেষভাবে স্বৈরশাসনের দেড়দশক বাংলাদেশ উপরোক্ত বিষয়ে চরম উদাসীন ছিলো। গত বছর ৯ ফেব্রুয়ারী দেশের একটি জাতীয় মিডিয়ায় ‘বিশ^বিদ্যালয়ে গবেষণায় এতো অবহেলা কেনো’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এতে বলা হয়, বিশ^বিদ্যালয়কে যদি আমরা জ্ঞান সৃষ্টির আধার হিসেবে গণ্য করি, সেখানে উপযুক্ত গবেষণা থাকতেই হবে। কিন্তু বাংলাদেশে শিক্ষার নীতি নির্ধারক ও উদ্যোক্তারা একের পর এক বিশ^বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় যতো আগ্রহী, গবেষণার বিষয়ে ততোটাই অনাগ্রহী। বিস্ময়কর হলেও সত্য, ২০২২ সালে গবেষণা খাতে একটি টাকাও বরাদ্দ রাখা হয়নি। আবার কোন কোন বিশ^বিদ্যালয় এতো কম বরাদ্দ রেখেছে, যা দিয়ে কোন মানসম্পন্ন গবেষণা সম্ভব নয়। এমনকি এর আগের বছরেও ২১টি বিশ^বিদ্যালয়ে গবেষণার জন্য শূন্য বরাদ্দ ছিলো। এর অর্থ, ওইসব বিশ^বিদ্যালয় গবেষণা যে উচ্চশিক্ষার অপরিহার্য অংশ, সেটাই অগ্রাহ্য করেছে। এক্ষেত্রে বরাদ্দের অপ্রতুলতাকে দায়ী করা হয়। বর্তমানে অনুমোদিত বিশ^বিদ্যালয় ১৬৯টি। এর মধ্যে ৫৫টি সরকারী ও ১১৪টি বেসরকারী। অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৪৭ লাখ ৫৬ হাজার ৭৪৭। ইউনেস্কোর পরামর্শ অনুযায়ী, মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৬ শতাংশ শিক্ষাখাতে ব্যয় করার কথা। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে শিক্ষায় বরাদ্দের হার সবচেয়ে কম। বাংলাদেশে ১.৭৬ শতাংশ ব্যয় করা হয়। বিশে^র সেরা বিশ^বিদ্যালয়সমূহের র্যাংকিংয়ে অর্থাৎ মানক্রমে বাংলাদেশ যে ক্রমশঃ পিছিয়ে যাচ্ছে, তারও অন্যতম কারণ গবেষণায় দুর্বলতা ও অপ্রতুলতা। আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী উচ্চশিক্ষার বরাদ্দের ২ শতাংশ গবেষণায় ব্যয় করা প্রয়োজন। সর্বোপরি বিশ^বিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা কার্যক্রমের লক্ষ্য হচ্ছে, জ্ঞান সৃষ্টি, শিক্ষার মান উন্নয়ন, সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও উদ্ভাবন। কারণ গবেষণার মাধ্যমে শিক্ষার মানোন্নয়ন করা সম্ভব। নতুন পাঠ্যক্রম তৈরী এবং শিক্ষার্থীদের জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনে এটা সহায়ক। এছাড়া গবেষণার মাধ্যমে সমাজের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নতুন পণ্য ও প্রক্রিয়া উদ্ভাবনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়নেও সহায়তা করে।
সর্বোপরি গবেষণা নতুন ধারণা ও উদ্ভাবনের পথ খুলে দেয়। সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয় গবেষণা সহায়তা কর্মসূচির আওতায় যে গবেষণা প্রস্তাব আহবান করেছে, তা উচ্চতর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে বিশেষ করে বিশ^বিদ্যালয়গুলোতে অবহেলিত ও উপেক্ষিত গবেষণা কার্যক্রমের নতুন সৃষ্টি করবে, এমন প্রত্যাশা সচেতন মহলের।



