অভিযানেও থেমে নেই পাথর লুট
প্রকাশিত হয়েছে : ১৮ আগস্ট ২০২৫, ৮:২০:০৬ অপরাহ্ন
♦এবার টার্গেট লোভা ও রাংপানি ♦অ্যাকশনে বালু-পাথর জব্দ
স্টাফ রিপোর্টার : কোনভাবেই থামছেনা সিলেটের পাথর লুট। সাদাপাথরসহ বিভিন্ন স্পট থেকে লুট হওয়া পাথর উদ্ধারে চলছে লাগাতার অভিযান। প্রতিদিন জব্দ হচ্ছে হাজার হাজার ঘনফুট পাথর। এরপরও থেমে নেই পাথর লুট।
অভিযানের বিষয়টি মাথায় রেখে পাল্টেছে লুটের কৌশল। এবার নিলামকে হাতিয়ার বানিয়ে কানাইঘাটের লোভায় চলছে পাথর লুট। অপরদিকে এবার লুট হচ্ছে জৈন্তাপুরের ভারত সীমান্তঘেঁষা পর্যটনকেন্দ্র রাংপানির পাথর। সেখানে দিনদুপুরে দৃষ্টির আড়ালে পাথর লুট করছে পাথরখেকোরা। রোববার পর্যন্ত সেখানে অথচ নীরব রয়েছে প্রশাসন। যদিও সোমবার (১৮ আগস্ট) রাংপানিতে অভিযান চালিয়েছে প্রশাসন। এসময় বিপুল পরিমাণ বালু ও পাথর জব্দ করা হয়।
লোভায় নিলামের আড়ালে পাথর লুট :
সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার সীমান্তবর্তী লোভা নদীতে নিলামের আড়ালে চলছে অবৈধ পাথর উত্তোলন। নদীর দুই পাড়ে সারি সারি বাল্কহেড, খননযন্ত্র ও ক্রাশার মেশিন বসিয়ে প্রতিদিনই শত শত শ্রমিক পাথর তুলছেন। যদিও সরকার ২০২০ সালে এ কোয়ারি থেকে পাথর উত্তোলন বন্ধ ঘোষণা করেছিল।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নিলামে বিক্রি হওয়া পাথর সরানোর নামে নতুন করে নদী থেকে পাথর তোলা হচ্ছে। এ কাজে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী নেতাও জড়িত। তারা বলছেন, রাতের অন্ধকারে নির্বিঘেœ পাথর সরানো হয়, প্রশাসনের উপস্থিতি নেই।
সিলেটের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শের মাহবুব মুরাদ জানান, নিলামে পাওয়া প্রতিষ্ঠানকে পাথর সরানোর জন্য ৪৫ দিন সময় দেওয়া হয়েছিল। পরে আরও ৩০ দিন বাড়ানো হলেও নির্ধারিত সময় শেষ হয়ে গেছে। দ্বিতীয় দফায় সময় বাড়ানোর আবেদন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় নাকচ করেছে। তাই আর কোনো বৈধ সুযোগ নেই।

ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান মেসার্স পিয়াস এন্টারপ্রাইজের মালিক কামরুল হাসান চৌধুরী বলেন, বিপুল পরিমাণ পাথর সরানোর জন্য দেওয়া সময় যথেষ্ট ছিল না। তাই তিনি উচ্চ আদালতে রিট করেছেন। আদালত তাঁকে তিন মাস সময় দিয়েছেন এবং স্থগিতাদেশ না আসায় কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর দাবি, তিনি অন্যাভাবে কোনো নতুন পাথর তুলছেন না, বরং নিলামে কেনা পাথরই সরাচ্ছেন।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) বলছে, নিলামের কাগজকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে চক্রটি নির্বিচারে নতুন পাথরও তুলছে। এতে লোভা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও আশপাশের পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এব্যাপারে কানাইঘাট থানার ওসি আব্দুল আউয়াল দৈনিক জালালাবাদকে বলেন, লোভা থেকে পাথর উত্তোলনের কোন তথ্য আমাদের কাছে নেই। প্রশাসন অভিযান পরিচালনা করলে পুলিশ সহযোগিতা করে। নিলামকৃত পাথর সরানো কার্যক্রম চলমান বা বন্ধ রয়েছে এই ধরণের কোন নির্দেশনা আমরা পাইনি।
এবার রাংপানিতে লুটেরার থাবা :
সাদাপাথরসহ বিভিন্ন স্পটের পাথর লুটপাটের সমালোচনা ও উদ্ধার অভিযানের মধ্যে এবার জৈন্তাপুরের ভারত সীমান্তঘেঁষা পর্যটনকেন্দ্র রাংপানির পাথর লুটের খবর পাওয়া গেছে। সেখানে দিনদুপুরে দৃষ্টির আড়ালে পাথর লুট করছে পাথরখেকোরা, অথচ নীরব রয়েছে প্রশাসন। স্থানীয়দের অভিযোগ, উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ ও বার্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) নিষ্ক্রিয়তার কারণেই লুটপাট চলছে। যদিও সোমবার (১৮ আগস্ট) অভিযান চালিয়ে উপজেলা প্রশাসন। এসময় বিপুল পরিমাণ পাথর ও বালু জব্দ করা হয়।
এদিকে রোববার (১৭ আগস্ট) সকালেও রাংপানি নদী থেকে বড় বড় পাথর তুলতে দেখা যায় লুটেরাদের। এলাকাবাসীর দাবি, পাথর উত্তোলনের কারণে তাদের ঘরবাড়িও ঝুঁকির মুখে পড়ছে। বিজিবি ঘটনাস্থলে গেলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি, সদস্যরা শুধু বাঁশি বাজিয়ে এলাকা ছেড়ে গেলে বলে অভিযোগ উঠেছে।
অথচ জৈন্তাপুরের মোকামপুঞ্জি সীমান্ত এলাকায় অব্যাহতভাবে চলছে লুটপাট। ছোট পাথর ইতোমধ্যে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। রোববার বড় পাথরগুলোও তুলে নিচ্ছিল পাথরখেকোরা।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাংপানি নদীর চারটি পয়েন্ট- শ্রীপুর কোয়ারি, আদর্শগ্রাম, খড়মপুর ও বাংলাবাজার ঘাট থেকে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন চলছে। ২০২৪ সালের আগস্টের আগেও এসব কোয়ারি ছিল আওয়ামী লীগ নিয়ন্ত্রিত। তবে ৫ আগস্টের পর থেকে বিএনপির কয়েকজন নেতার সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের মতে, রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়া ও প্রশাসনের ভূমিকার কারণেই লুটপাট বন্ধ হচ্ছে না।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জৈন্তাপুর উপজেলার আসামপাড়া এলাকায় দুই বছর আগে জাফলং ও শ্রীপুর পাথর কোয়ারি থেকে স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ী অধিক মুনাফার আশায় পাথর লুট করেন। কয়েক মাস আগে শ্রীপুর পাথর কোয়ারি থেকে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনের অভিযোগে বর্তমান উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ফারজানা আক্তার লাবনী মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেন। তিনি লুট হওয়া পাথর জব্দ করেন।
এলাকাবাসীর দাবি, উদ্ধার হওয়া পাথর আসলে রাংপানি, জাফলং ও শ্রীপুর এলাকার। অথচ সমালোচনা এড়াতে এগুলোকে ‘সাদাপাথর’ বলে ভোলাগঞ্জে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তাদের অভিযোগ, প্রশাসন দায় এড়ানোর জন্যই এসব পাথর ভোলাগঞ্জের বলে চালিয়ে দিচ্ছে। একই সঙ্গে নদীপথে বলগেট দিয়ে দিন-রাত পাথর পাচার হলেও এখনো কোনো অভিযান চালানো হয়নি। এ বিষয়ে স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, জব্দ হওয়া পাথরগুলো তারা অনেকদিন ধরেই এখানে দেখতে পাচ্ছেন। এগুলো জৈন্তাপুরের রাংপানি, শ্রীপুর ও জাফলং এলাকার পাথর- ভোলাগঞ্জের নয়।
পাথর লুটের এসব ঘটনায় পর্যটনকেন্দ্রগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছেন এলাকাবাসী। তারা বলছেন, নদী পথে দিনরাত সমানতালে পাচার চলছে। ভোলাগঞ্জের ঘটনায় সামনে আসায় পর্যটন ধ্বংসের দায় এড়াতে প্রশাসন এখন দায়সারা অভিযান চালাচ্ছে।
জৈন্তাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জর্জ মিত্র চাকমা বলেন, লুট বন্ধ ও লুট হওয়া পাথর উদ্ধারে প্রতিদিনই বিভিন্ন স্পটে আমাদের অভিযান চলছে। আজও রাংপানিতে অভিযান হয়েছে।
এদিকে সোমবার (১৮ আগস্ট) অভিযানে নেতৃত্ব দেয়া জৈন্তাপুরের সহকারী কমিশনার (ভুমি) ফারজানা আক্তার লাবনী দৈনিক জালালাবাদকে জানান, আমাদের অভিযান প্রতিদিইন ভিন্ন স্পটে হয়েছে। আজ রাংপানি ও এর আশপাশ এলাকায় ৪০ ট্রাক বালু জব্দ করা হয়েছে। এছাড়া বাংলাবাজার একটি ক্রাশার মেশিন থেকে সাড়ে ৯ হাজার ঘনফুট পাথর জব্দ করা হয়েছে।





