নানা সমস্যায় জর্জরিত চা শিল্প
প্রকাশিত হয়েছে : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ৮:৩৭:৩১ অপরাহ্ন

মাধবপুর প্রতিনিধি : হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার ৫ টি চা বাগানে গত কয়েক বছর ধরে চলছে টানাপোড়েন। দেশের কৃষিভিত্তিক ৫ চা বাগানে ইদানীং চায়ের উৎপাদন কমে যাওয়া, ভাল দাম না পাওয়া এবং খরচ বেড়ে যাওয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। বিগত কয়েক বছর ধরে এনটিসির জগদীশপুর ও তেলিয়াপাড়া চা বাগানে লোকসান হচ্ছেই।
বিগত পাঁচ বছর থেকে সিন্ডিকেটের কারণে নিলাম বাজারে চায়ের ন্যায্যমূল্য পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে ক্রমাগত লোকসান গুনতে হচ্ছে বাগানগুলোকে। চা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এই সংকট কাটিয়ে উঠতে না পারলে চা-বাগানগুলো চিরতরে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ইতোমধ্যে অর্থ সংকটে নোয়াপাড়া চা বাগানের কারখানা তিন বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। বৈকুন্ঠপুর চা বাগানে গত ১০ বছর প্রায় কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। নোয়াপাড়া চা বাগানের ডেপুটি ম্যানেজার সোহাগ মাহমুদ জানান, বাগানগুলোর আর্থিক সংকট দূরীকরণে চার থেকে পাঁচ ভাগ হারে ব্যাংক ঋণ প্রদানসহ নানা অসুবিধা দূরীকরণে বাগান মালিকরা চা সংসদের চেয়ারম্যানের পদক্ষেপ দাবি করেছেন। একইসঙ্গে তারা চা-শিল্পকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে কৃষি মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা, সিলেটে একটি নিলাম কেন্দ্র স্থাপন, চা বেশি পরিমাণে রপ্তানি করা, চা-শ্রমিকদের ভূমির অধিকার নিশ্চিত করার উদ্যোগসহ ১২টি প্রস্তাবনা চা-সংসদ চেয়ারম্যান বরাবরে উত্থাপন করেছেন।
একইসঙ্গে তারা উত্তরাঞ্চলে মান নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চায়ের উৎপাদনে চায়ের দরপতনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উত্থাপন করেছেন চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে। বৈকুন্ঠপুর চা বাগানের ম্যানেজার শামসুল ইসলাম জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে চা বাগানের ফসলের পরিমাণ কমে যাওয়ায় গুণগত মানে বিঘ্ন ঘটানো এবং উৎপাদনের অস্থিরতা প্রভৃতি পরিবর্তন সরাসরি দৃশ্যমান। চা গাছের জন্য উপযুক্ত তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা বজায় রাখতে না পারা, নানা রোগ ও পোকামাকড়ের প্রকোপ বাড়ায় উৎপাদন প্রভাবিত হচ্ছে। এই সমস্যা মোকাবেলায় প্রযুক্তির আধুনিকীকরণ ও নতুন পদ্ধতির প্রয়োগ অপরিহার্য। চা-শ্রমিকদের রেশন, বেতন-ভাতা প্রদানসহ নানা বিষয় নিয়ে বাগান মালিকরা চরম সংকটে রয়েছেন।
সুরমা চা বাগানের সিনিয়র সহকারী ম্যানেজার মিরন হোসেন জানান, এ বছর চায়ের উৎপাদন অনেক কমে গেছে। কিন্তু উৎপাদন খরচ বেড়েছে। চা বাগান এখন টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। স্বল্প সুদে সরকার ব্যাংক ঋণ দিলে বাগান বাঁচিয়ে রাখা যাবে। বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের (বাচাশ্রই) ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নিপেন পাল বলেন, চা শুধু একটি জনপ্রিয় পানীয় নয় এটি বাংলাদেশের লাখো কৃষক ও শ্রমিকের জীবিকা ও সামাজিক সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। চা শ্রমিকদের অধিকাংশই নারী, যারা তাদের পরিবারের অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে তুলতে চা শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। তাই শ্রমিকদের ভূমি অধিকার সুরক্ষা, ন্যায্য মজুরি নিশ্চিতকরণ এবং কল্যাণমূলক কার্যক্রম গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি।
সিনিয়র টি-প্লান্টার এবং বাংলাদেশীয় চা সংসদের সিলেট ব্রাঞ্চ প্রতিনিধি ইবাদুল হক বলেন, সরকার নিলামমূল্য প্রতি কেজি চা ২৪৫ টাকা নির্ধারণ করে দিলেও সিন্ডিকেটের তৎপরতায় বাগানমালিকসহ সংশ্লিষ্টরা এ নিয়ে শঙ্কিত। এমনিতেই সার কীটনাশক তেল ইত্যাদির দাম বেড়েছে। এই অবস্থায় চায়ের আকাঙ্খিত মূল্য পাওয়া না গেলে চায়ে লোকসান বাড়বে। দেশের চা-বাগানগুলোর আদৌ টিকে থাকবে কি না সন্দেহ।
তিনি বলেন, ২০১৫ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত চায়ের উৎপাদন খরচ বেড়েছে ৫৮ দশমিক ৩০ শতাংশ। একই সময়ে চায়ের দর বেড়েছে ৯ দশমিক ১৬ ভাগ। দামের তুলনায় উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় চা-শিল্পের আর্থিক সক্ষমতা কমেছে। তাই চা-শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে প্রতি কেজি চায়ের গড় মূল্য ২৫০ টাকায় উন্নীত করতে হবে।






