একটি সেতুর অভাবে কয়েক যুগ ধরে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন কয়েক গ্রামের মানুষ
প্রকাশিত হয়েছে : ০৮ নভেম্বর ২০২৫, ৭:৩২:২০ অপরাহ্ন

সংবাদদাতা: বিগত সরকারের সময় দেশব্যাপী যে উন্নয়ন যজ্ঞের ফিরিস্তি দফায় দফায় গাওয়া হয়েছে, তার বাস্তব চিত্র অনেকাংশেই ম্লান সিলেটের প্রান্তিক অঞ্চলে। এর অন্যতম একটি উদাহরণ বিয়ানীবাজার উপজেলার পাতন-ফুলমলিক করতি খাল এলাকা।
গত ৫৪ বছরেও উপজেলার সবচেয়ে বড় লোকালয় এবং প্রান্তিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ স্পটে হয়নি একটি সেতু। স্থানীয় বাসিন্দারা উপজেলার পাতন-ফুলমলিক করতি খালের ওপর একটি সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছেন শতাব্দি ধরে। বিভিন্ন সময় জনপ্রতিনিধি ও জনপ্রশাসনের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।এমন পরিস্থিতিতে ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই এলাকার অন্তত ২০ হাজার মানুষ চরম ভোগান্তি পোহাচ্ছেন। তাদের দাবি ওই খালের ওপর একটি সেতু; যা আশপাশের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ গ্রামের মানুষের যোগাযোগে গতি আনবে। সেই সঙ্গে বাড়বে কৃষিপণ্যের সরবরাহ। এর মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
একটি সেতুর অভাবে কয়েক যুগ ধরে যোগাযোগের ক্ষেত্রে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন পাতন, ফুলমলিক, ঘাঘুয়াসহ কয়েক গ্রামের মানুষ। অথচ তিন বছর আগে ভুক্তভোগী এলাকার বাসিন্দাদের চলাচলের দুর্ভোগ দূর করতে দেশব্যাপী চলমান অনূর্ধ্ব ১০০ মিটার সেতু নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় মন্ত্রণালয়ে একটি প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল উপজেলা প্রকৌশল অফিসের পক্ষ থেকে। ওই প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হতে চললেও প্রস্তাবিত সেতুটি নির্মাণের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিয়ানীবাজার উপজেলার আলীনগর ইউনিয়নের ফুলমলিক-ঘাঘুয়া গ্রামে যাওয়ার একমাত্র যোগাযোগ সড়কটি পাতন-ফুলমলিক খালে বিভক্ত রয়েছে। খালের ওপর সেতু না থাকায় গ্রামবাসী অবিচ্ছিন্ন সড়ক যোগাযোগে সকল মানবিক ও সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত রয়েছেন।
প্রায় ৫০ মিটার দীর্ঘ ওই খালের ওপর গ্রামবাসী একটি বাঁশের সাঁকো নির্মাণ করে কোনোভাবে খাল পারাপারের ব্যবস্থা করেছেন। শুকনো মৌসুমে এই সাঁকো ব্যবহার করা গেলেও ভরা বর্ষায় তীব্র স্রোতের কারণে প্রায়ই ভেঙে পড়ে সাঁকোটি। এলাকায় কেউ অসুস্থ হলে তাকে জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে নেওয়া অসম্ভব। তা ছাড়া এই সাঁকোটি বর্ষার সময় যখন তখন হেলে পড়ে। আকস্মিক পরিস্থিতিতে বিপাকে পড়তে হয় মানুষকে। এ এলাকার আর্থিকভাবে অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর ভোগান্তি সবচেয়ে বেশি। একই সঙ্গে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কৃষিপণ্যের সরবরাহ কমে আসায় উদ্বিগ্ন চাষিরা।
গ্রামবাসী জানান, কয়েক গ্রামের বাসিন্দাদের উদ্যোগে ২০১৯ সালে চাঁদা তুলে দেড় লাখ টাকা খরচ করে নির্মাণ করা হয় বাঁশের সাঁকোটি। ২০২২ সালের ভয়াবহ বন্যায় বাঁশের সাঁকোটি ভেঙে গেলে গ্রামবাসী ছোট আকারে আরেকটি সাঁকো তৈরি করেন। ২০২৪ সালের বন্যায় আবারও সাঁকো ভেঙে গেলে বিপাকে পড়তে হয় স্থানীয়দের। বর্তমানে এক বাঁশের এই সাঁকো দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে পারাপার করছেন পাতন, ফুলমলিক ও ঘাঘুয়া এলাকার বাসিন্দারা। দুই গ্রামের মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া খালটি পাতন ও ফুলমলিক গ্রামকে বিভক্ত করেছে। গ্রামীণ জনপদকে বিভক্ত করা পাতন-ফুলমলিক খালের ওপর সেতু নির্মাণ করে আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপনের উদ্যোগ নিতে দায়িত্বশীলদের আহ্বান জানিয়েছেন গ্রামবাসী।
উপজেলা প্রকৌশল অফিস জানান, ২০২২ সালে বন্যাপরবর্তী সময়ে উপজেলার আলীনগরের পাতন-ফুলমলিক খালের ওপর একটি সেতু নির্মাণের জন্য মন্ত্রণালয়ে প্রাথমিক প্রস্তাব প্রেরণ করা হয়েছিল। অনূর্ধ্ব ১০০ মিটার ব্রিজ প্রকল্পের আওতায় এ প্রস্তাব পাঠানো হয়।
গ্রামের প্রবীণ মুরব্বি আকমল আলী বলেন, কয়েক মাস আগে গ্রামের এক যুবকের মৃত্যু হলে তাঁর মরদেহ বাড়ি আনতে গিয়ে চরম সংকটে পড়েন স্বজনরা। পরে বাধ্য হয়ে কয়েকজন লাশ কাঁধে করে এলাকায় নিয়ে যায়। গ্রামের যুবক আব্দুল করিম বলেন, বর্তমানে এমন জীর্ণ সেতু অন্য কোথাও আছে কিনা সন্দেহ। সরকার পরিবর্তন হয় কিন্তু তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন হয় না।
উপজেলা প্রকৌশলী দীপক কুমার দাস বলেন, তিন বছর আগে অনূর্ধ্ব একশ মিটার প্রকল্পের আওতায় এ খালের ওপর একটি সেতু নির্মাণের প্রস্তাব পাঠানো হয়।প্রবাসী অধ্যুষিত বিয়ানীবাজারের যুক্তরাজ্য প্রবাসী ও যুক্তরাজ্যের বাঙ্গালী কমিউনিটি নেতা, বিয়ানীবাজার ক্যান্সার এন্ড জেনারেল হাসপাতাল ফাউন্ডেশনের সিইও এন্ড এমডি মোহাম্মদ সাব উদ্দিন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গকে নিয়ে আলোচিত এলাকাটি পরিদর্শন করেন। তিনি দেশের সকল সরকারি -বেসরকারি, প্রবাসী সকলকে এই অঞ্চলের অমানবিক জীবন যাত্রার পরিবর্তনে দ্রুতই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করার আহবান ব্যক্ত করেন।
এই সময় মোহাম্মদ সাব উদ্দিনকে আহবায়ক করে ১৮ (আঠারো) সদস্যের একটি সেতু নির্মাণ বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সদস্যরা হলেন যথাক্রমে- যুক্তরাজ্য প্রবাসী মো: মঞ্জুরুস সামাদ চৌধুরী মামুন, স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আহবাবুর রহমান শিশু, সমাজসেবক হোটেল স্কাই সিটি ঢাকা’র পরিচালক তোফায়েল খান, জামিল ইকবাল লিমিটেড-এর স্বত্তাধিকারী জাহিদ ইকবাল, জাকির হোসেন খান, রফিক উদ্দিন বাসন, জুনায়েদ আজম চৌধুরী, আব্দুল কাদির, নাদিয়া সুলতানা, এনাম উদ্দিন, মাওলানা আবুল হাসান, স্থানীয় ইউপি সদস্য গৌস উদ্দিন, মো: মনিরুজ্জামান মনির, আফতাব উদ্দিন, সমাজসেবক আব্দুর শুকুর, শরফ উদ্দিন, রহিম উদ্দিন, মাওলানা রায়হান উদ্দিন ও হোসেন আহমদ প্রমূখ।





