জকিগঞ্জে প্রাথমিক শিক্ষায় স্থবিরতা
প্রকাশিত হয়েছে : ০৯ নভেম্বর ২০২৫, ৬:০৯:২৫ অপরাহ্ন
৭৩ বিদ্যালয়ে নেই স্থায়ী প্রধান শিক্ষক

এখলাছুর রহমান, জকিগঞ্জ: জকিগঞ্জ উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। শিক্ষক সংকটের পাশাপাশি ‘চলতি দায়িত্বপ্রাপ্ত’ ও ‘ভারপ্রাপ্ত’ প্রধান শিক্ষকের আধিক্য এখন শিক্ষার মানোন্নয়নের অন্যতম প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
উপজেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, জকিগঞ্জে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে মোট ১৩৬টি। এর মধ্যে প্রধান শিক্ষক কর্মরত আছেন ১১৭ জন। কিন্তু তাদের মধ্যেও ৫৪ জন ‘চলতি দায়িত্বপ্রাপ্ত’, অর্থাৎ তারা সহকারী শিক্ষক পদে থেকেই অস্থায়ীভাবে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া ১৯টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক পদ সম্পূর্ণ শূন্য, সেখানে কাজ চালানো হচ্ছে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে। ফলে পুরো উপজেলার ১৩৬টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৭৩টি বিদ্যালয়ে নেই কোনো স্থায়ী প্রধান শিক্ষক। মাত্র ৬৩ জন স্থায়ী প্রধান শিক্ষক দিয়েই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে জকিগঞ্জের প্রাথমিক শিক্ষা।
চলতি দায়িত্বপ্রাপ্ত ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকরা স্থায়ী পদে না থাকায় বিভিন্নভাবে সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। অনভিজ্ঞতার কারণে তাঁরা শিক্ষক স্টাফকে সুচারুভাবে পরিচালনা করতে পারছেন না। বিদ্যালয়ের আয়-ব্যয়ের হিসাব সংরক্ষণেও বাধার মুখে পড়ছেন। এছাড়া ‘ব্যবস্থাপনা কমিটি’র সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা ও উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতেও অনেকের মধ্যে ভীতি ও সংকোচ দেখা দেয়। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকদের অভিযোগ, নিয়মিত প্রধান শিক্ষক না হওয়ায় তাঁরা ‘লিডারশিপ ট্রেনিং’ নেওয়ার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হন। ফলে দায়িত্ব সম্পর্কিত ধারণা ছাড়াই তাঁদের কাজ করতে হয়। যদিও চলতি দায়িত্বপ্রাপ্তদের এই প্রশিক্ষণ দেওয়ার নিয়ম রয়েছে।
চলতি দায়িত্বপ্রাপ্তদের নামমাত্র ১ হাজার ৫০০ টাকা দায়িত্বভাতা দেওয়া হলেও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকরা তাও পান না। দীর্ঘদিন কোনো আর্থিক সুবিধা ছাড়াই দায়িত্ব পালন করতে করতে অনেকের মধ্যে অনীহা তৈরি হয়েছে। এর ফলে বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম, শিক্ষক মনিটরিং, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও পাঠদানের মানে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে।
উপজেলার কামালপুর (ক) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. জোবায়ের আহমদ বলেন, প্রতিদিন নানা তিক্ত অভিজ্ঞতা অর্জনের মধ্য দিয়ে দায়িত্ব পালন করে চলছি। দায়িত্ব কাঁধে চাপায় দপ্তরী, কেরানি, ঝাড়ুদার ও নিরাপত্তাকর্মী হিসেবেও আমাকে কাজ করতে হয়। এটা একটি জাতীয় সমস্যা। সারাদেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর একই চিত্র, একই অবস্থা। কাজেই কষ্ট হলেও এই দায়িত্ব পালন করতেই হবে।
দেখা গেছে, অনেক চলতি দায়িত্বপ্রাপ্ত বা ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সহকারী শিক্ষক হিসেবে নিয়মিত পাঠদানের পাশাপাশি প্রশাসনিক কাজ করতে গিয়ে সবকিছুতে তালগোল পাকিয়ে ফেলেন। তারা না পারছেন সঠিকভাবে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতে, আর না পারছেন মনোযোগ সহকারে মানসম্মত পাঠদান দিতে।
হামিন্দপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চলতি দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সুলতান আহমদ বলেন, নামমাত্র কিছু ভাতায় একটি গুরুদায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। অধিদপ্তর থেকে আমাদের নিয়মিতকরণের কথা বিভিন্ন সময় শোনা গেলেও বাস্তবে তা দেখা যাচ্ছে না। চালিয়ে যাচ্ছি, যেহেতু অন্য কোনো উপায় নেই।
এ বিষয়ে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুল বারেক বলেন, আমি নতুন যোগদান করেছি। মাত্র একদিন অফিস করেছি। এখন আবার ছুটিতে আছি। তাই পুরোপুরি তথ্য দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।বিশ্লেষকরা মনে করেন, যে উপজেলাজুড়ে অর্ধেকের বেশি বিদ্যালয়ে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নেই, সেখানে শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় স্থবিরতা দেখা দেওয়াই স্বাভাবিক। দ্রুত স্থায়ী নিয়োগ ও পদায়ন না হলে জকিগঞ্জের প্রাথমিক শিক্ষার অগ্রগতি বড় বাধার মুখে পড়বে।





