হবিগঞ্জে ইটভাটায় পুড়ছে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য
প্রকাশিত হয়েছে : ১২ নভেম্বর ২০২৫, ৬:৫৬:০৩ অপরাহ্ন

হবিগঞ্জ প্রতিনিধি: হবিগঞ্জ জেলার আকাশ এখন ধোঁয়ার কুণ্ডলীতে ঢাকা। সকাল-সন্ধ্যা কালো ধোঁয়া, ধুলা আর জ্বলন্ত কয়লার গন্ধে দম নিতে কষ্ট হয় সাধারণ মানুষের। শতাধিক অবৈধ ইটভাটা থেকে নির্গত ধোঁয়ায় দুষিত হচ্ছে বায়ু, নষ্ট হচ্ছে কৃষিজমি, হারিয়ে যাচ্ছে জীববৈচিত্র্য। আইনের তোয়াক্কা না করে, নবায়নকৃত লাইসেন্স ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই ভাটাগুলো চালু রেখেছেন মালিকরা। সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে চলছে নতুন করে ইটকাটা ও পুড়ানোর কাজ।
হবিগঞ্জ জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, হবিগঞ্জে বর্তমানে ১০৩টি ইটভাটা সক্রিয়। এর মধ্যে একটিরও নবায়নকৃত লাইসেন্স বা পরিবেশ ছাড়পত্র নেই। তারপরও এই ইটভাটাগুলো দিনে-রাতে ধোঁয়া ছড়িয়ে চলছে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে। পরিবেশ, কৃষি, জীববৈচিত্র্য সবকিছুর উপরই এর প্রভাব মারাত্মক। পরিবেশবাদীরা বলছেন, ইটভাটা নিয়ন্ত্রণে সরকারের নিজস্ব আইন থাকলেও তার কোনো প্রয়োগ দেখা যায় না।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন হবিগঞ্জ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল সোহেল বলেন, কোনো ইটভাটাই সরকারি নিয়ম-নীতি অনুসরণ করছে না। ফলে এলাকার পরিবেশ মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়েছে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের জারিকৃত নির্দেশনা অনুযায়ী, ইটভাটা স্থাপনের জন্য কেবল অকৃষি জমি ব্যবহার করা যাবে। ইট পোড়ানোর নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী কোনো ইটভাটা উপজেলা সদর, সংরক্ষিত বনাঞ্চল, আবাসিক এলাকা বা ফলজ বাগান থেকে অন্তত তিন কিলোমিটার দূরে থাকতে হবে। কিন্তু হবিগঞ্জের বাস্তবতা উল্টো। বাহুবল ও চুনারুঘাট উপজেলার অধিকাংশ ইটভাটা উপজেলা সদর বা জনবসতিপূর্ণ এলাকার মধ্যেই স্থাপিত।
বাহুবলের মিরপুর-ধুলিয়াখাল, মিরপুর-বাহুবল, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের মিরপুর-শায়েস্তাগঞ্জ অংশ এবং শায়েস্তাগঞ্জ-চুনারুঘাট সড়কের পাশে সারি সারি ইটভাটা দৃশ্যমান। স্কুল, মসজিদ ও বাজারের পাশেও জ্বলছে চুল্লি এ যেন ইটভাটা মালিকদের আইনের প্রতি একরাশ বৃদ্ধাঙ্গুলি।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, জেলায় কোনো ইটভাটারই নবায়ন বৈধ নেই। বাহুবল উপজেলার মেসার্স পলাশ ব্রিকসের মেয়াদ শেষ হয়েছে ২৩ জুনে ২০২৩ সালে, মেসার্স সামিন ব্রিকসের মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২২ সালে, মেসার্স পদ্মা ব্রিকসের মেয়াদ শেষ ২০২৩ সালের জুনে। চুনারুঘাটের মেসার্স সামস ব্রিকস ২০২২ সালে মেয়াদোত্তীর্ণ। নবীগঞ্জের মেসার্স মাষ্টার ব্রিকস ও গোল্ড ব্রিকসের মেয়াদ শেষ ২০২১ সালে। ব্লুঅটো ব্রিকসের মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০১৯ সালে। হবিগঞ্জ সদর উপজেলার মেসার্স সোনালী ব্রিকসের মেয়াদও শেষ ২০২০ সালে। তবুও কেউ থেমে নেই। চুল্লি জ্বলছে, শ্রমিক ব্যস্ত, মাঠে সাজানো হচ্ছে কাঁচা ইট।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন ইটভাটা মালিক স্বীকার করেছেন, জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের কিছু প্রভাবশালী কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করেই চলছে এই অবৈধ ব্যবসা। হবিগঞ্জ ইটভাটা মালিক সমিতির কিছু প্রভাবশালী সদস্য প্রশাসনের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে সরকারি দিবস ও অনুষ্ঠানে অনুদান দেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
বাহুবল ও চুনারুঘাটের বসিনা, বানিয়াগাঁও, দৌলতপুর, মুগকান্দি, শ্রীরামপুর, শ্রীকুটা, গোগাউড়া প্রভৃতি এলাকায় শত শত বিঘা ফসলি জমি থেকে মাটি কেটে নেওয়া হচ্ছে ইট তৈরির জন্য। এর ফলে ফসল উৎপাদন কমে গেছে, জমির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে। স্থানীয় কৃষকরা জানান, আম-কাঁঠালসহ মৌসুমি ফলের গাছে আর আগের মতো ফল আসে না। ধুলার আস্তরণে গাছের পাতা বিবর্ণ হয়ে গেছে।
হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক ড. ফরিদুর রহমান বলেন, যেসব ইটভাটা পরিবেশনীতি লঙ্ঘন করছে, তাদের বিরুদ্ধে সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পরিবেশ অধিদপ্তর হবিগঞ্জের উপপরিচালক ড. মো. ইউসুফ আলী জানান, অবৈধ ইটভাটার তালিকা তৈরি করে বিভাগীয় অফিসে পাঠানো হয়েছে। উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আদেশ পেলে অভিযান পরিচালনা করা হবে।





