জকিগঞ্জ সরকারি কলেজে অনার্স কোর্স চালু নিয়ে সংশয়
প্রকাশিত হয়েছে : ১৩ নভেম্বর ২০২৫, ৬:৫৮:২১ অপরাহ্ন

এখলাছুর রহমান, জকিগঞ্জ: সিলেট শহর থেকে প্রায় ৯১ কিলোমিটার দূরের সীমান্তবর্তী উপজেলা জকিগঞ্জ। এ জনপদের মানুষের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন ছিল উপজেলার একমাত্র সরকারি কলেজে অনার্স কোর্স চালু। কিন্তু চালু হয়নি। এজন্য এখানকার শিক্ষার্থীদের সিলেট শহরের কোনো কলেজে গিয়ে ভর্তি হতে হচ্ছে।
কুতুব উদ্দিন নামের একজন অভিভাবক আক্ষেপ করে বলেন, উপজেলার একমাত্র সরকারি কলেজে অনার্স কোর্স চালুর জোরালো দাবি ছিল। আমি একজন স্বল্প আয়ের ব্যবসায়ী। একটি ধর্মপ্রাণ পরিবারের সন্তান হিসেবে ইচ্ছে ছিল মেয়েকে বাড়িতে রেখে জকিগঞ্জ সরকারি কলেজে পড়াবো। কিন্তু এই কলেজে অনার্স কোর্স না থাকায় বাধ্য হয়ে তাকে সিলেট সরকারি মহিলা কলেজে ভর্তি করেছি। পরিবার ছাড়া একটি মেয়ে সেখানে থাকছে, বিষয়টি আমাকে ভীষণ পীড়া দেয়।
জানা যায়, ১৯৮৫ সালে সাবেক আইজিপি ও ভূমিমন্ত্রী মরহুম এম এ হক-এর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় জকিগঞ্জ কলেজ। তার অক্লান্ত প্রচেষ্টায় মাত্র তিন বছরের মাথায় ১৯৮৮ সালে কলেজটি সরকারিকরণ হয়। সে সময় থেকেই এটি সীমান্ত অঞ্চলের হাজারো শিক্ষার্থীর জন্য উচ্চশিক্ষার আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করছে। দীর্ঘ আন্দোলন ও সংগ্রামের পর ২০০৩ সালে এখানে (এইচএসসি) বিজ্ঞান বিভাগ এবং ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্তিতে ডিগ্রি (পাস) কোর্স চালু করা হয়। বর্তমানে কলেজের তিনটি বিভাগ (বিজ্ঞান, মানবিক ও বাণিজ্য) মিলিয়ে ১ হাজার ৮৫ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে।
খবর নিয়ে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠার পর প্রায় ৪০ বছর বছর পেরিয়ে গেলেও এই কলেজে এখনো অনার্স কোর্স চালু হয়নি, যা নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে রয়েছে হতাশা। অনেক শিক্ষার্থীকে অনার্সে ভর্তি হতে সিলেট শহরে যেতে হয়, যা ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ।
কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোঃ মোসলেহ উদ্দিন খান বলেন, আমরা অনার্স কোর্স চালুর জন্য সর্বেচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এটি চালু হলে গ্রামের ও দূরবর্তী এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষার সুযোগ আরও প্রসারিত হবে। তবে এ লক্ষ্যে শিক্ষকসংখ্যা বৃদ্ধি অপরিহার্য। তিনি হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, বর্তমানে কলেজে ১১ জন শিক্ষক, ১২ জন কর্মকর্তা এবং ৯ জন কর্মচারী রয়েছেন। ১৯৮৮ সালে সরকারীকরণের সময় যে ১১টি শিক্ষক পদ সৃষ্টি হয়েছিল, এখনো সেই সংখ্যাই বহাল রয়েছে। অথচ বর্তমানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কয়েকগুণ বেড়েছে এবং নতুন বিভাগও যুক্ত হয়েছে। কলেজে অনার্স কোর্স চালু হলে অনেক শিক্ষকের প্রয়োজন হবে।
সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে, অবকাঠামোগত দিক থেকেও রয়েছে সীমাবদ্ধতা। বর্তমানে কলেজে রয়েছে মাত্র তিনটি একাডেমিক ভবন, একটি আইসিটি ল্যাব ও একটি গ্রন্থাগার। কিন্তু নেই কোনো ছাত্রাবাস ভবন। এতে দূরবর্তী এলাকার শিক্ষার্থীদের পড়ালেখায় মারাত্মক ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। এসব সমস্যা থাকা সত্ত্বেও শিক্ষার্থীরা নিয়মিতভাবে ভালো ফলাফলের জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছে।
স্থানীয় শিক্ষা বিশ্লেষক ও অভিভাবকরা মনে করেন, জকিগঞ্জ সরকারি কলেজ একটি ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান। এটি উপজেলার একমাত্র সরকারি কলেজ। জেলা শহরের সাথে জকিগঞ্জের দূরত্ব বিবেচনায় অনতিবিলম্বে এই কলেজে অনার্স কোর্স চালু করা প্রয়োজন।
উপজেলার প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক সমিতির সভাপতি মোঃ আব্দুল হালিম বলেন, কলেজটির প্রতিষ্ঠাতা মরহুম এম এ হকের স্বপ্ন ছিল জকিগঞ্জে উচ্চশিক্ষার পূর্ণাঙ্গ সুযোগ সৃষ্টি করা। তাই এখন প্রয়োজন সরকারের উদ্যোগ এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা। তবেই জকিগঞ্জ সরকারি কলেজে অনার্স কোর্স চালু হয়ে এই অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ হবে এবং সীমান্ত এলাকার শিক্ষার মান উন্নয়নের নতুন অধ্যায় সূচিত হবে।





