জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে
প্রকাশিত হয়েছে : ১৩ নভেম্বর ২০২৫, ৯:১৭:৫৮ অপরাহ্ন

জালালাবাদ রিপোর্ট: জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য গণভোট এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আগামী ফেব্রুয়ারিতে একই দিনে হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস। বৃহস্পতিবার দুপুরে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেছেন, আমরা সকল বিষয় বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনই গণভোটের আয়োজন করা হবে। অর্থাৎ জাতীয় নির্বাচনের মতো গণভোটও ফেব্রুয়ারির প্রথমার্থে একইদিনে অনুষ্ঠিত হবে। এতে সংস্কারের লক্ষ্য কোনোভাবে বাধাগ্রস্ত হবে না।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলো সংলাপে যেসব সংস্কার প্রস্তাব চূড়ান্ত করে জুলাই সনদে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, সেগুলোর বিষয়ে জনগণের সম্মতি নেওয়া হবে সেই গণভোটে।
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের উপায় নিয়ে গত ২৮ অক্টোবর অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে দুটি বিকল্প সুপারিশ জমা দেয় জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। সেখানে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি করে গণভোটের মাধ্যমে জনগণের রায় নেওয়ার সুপারিশ করা হয়।
সুপারিশে বলা হয়েছিল, আদেশ জারির পর সংসদ নির্বাচনের আগে কিংবা সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে একই দিনে এই গণভোট হতে পারে। তবে এ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গুরুতর মতপার্থক্য দেখা দেয়।
বিএনপিসহ সমমনা কয়েকটি দল জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে এক দিনে গণভোট করার পক্ষে অবস্থান নেয়।অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীসহ আট দল রোববারের মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি এবং নভেম্বর মাসেই গণভোট আয়োজনের দাবিতে আন্দোলনে নামে। রোববারের মধ্যে দাবি পূরণ না হলে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনার সামনে অনির্দিষ্টকালের অবস্থান কর্মসূচি শুরুরও ঘোষণা দেয় তারা।
এর মধ্যেই বৃহস্পতিবার প্রধান উপদেষ্টার সভাপতিত্বে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে তার কার্যালয়ে উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক হয়। সেখানে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ অনুমোদন পায়।পরে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ওই আদেশে সই করেন বলে তার দপ্তর থেকে জানানো হয়।
এর ঘণ্টাখানেকের মধ্যে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিতে এসে গণভোটের সময়সূচি এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া ঘোষণা করেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস।একই দিনে দুই ভোট করার পক্ষে যুক্তি দিয়ে তিনি বলেন, তাতে নির্বাচন আরও উৎসবমুখর ও সাশ্রয়ী হবে। গণভোট অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে উপযুক্ত সময়ে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করা হবে।
তিন লক্ষ্যের অগ্রগতি :
ভাষণের শুরুতে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আমাদের সরকারের ওপর ন্যস্ত দায়িত্ব ছিল মূলত তিনটি। হত্যাকাণ্ডের বিচার করা, একটি জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উত্তরণের জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কারের আয়োজন করা এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা। আমরা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকালে তৎকালীন ফ্যাসিস্ট সরকারের নির্দেশে সংগঠিত হত্যাকাণ্ডের বিচারকাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। এই বিচারের উদ্দেশ্যে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাদের প্রথম রায় শীঘ্রই দিতে যাচ্ছে।
ড. ইউনূস বলেন, ট্রাইব্যুনালে আরও কয়েকটি মামলার বিচার চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। সাধারণ ফৌজদারি আদালতগুলোতেও জুলাই হত্যাকাণ্ড সম্পর্কিত কিছু বিচারকাজ শুরু হয়েছে। আমরা একইসাথে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো গুমের মতো নৃশংস অপরাধের বিচারকাজ শুরু করেছি।
তিনি বলেন , আমি আনন্দের সঙ্গে আপনাদের জানাতে চাই যে সংস্কারের ক্ষেত্রেও আমরা ব্যাপক অগ্রগতি অর্জন করেছি। অন্তর্বর্তী সরকার নিজ উদ্যোগে বা বিভিন্ন সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবের ভিত্তিতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের কাজ সম্পন্ন করেছে। কিছু প্রস্তাবিত সংস্কারের কাজ এখনও চলমান আছে। অধ্যাদেশের মাধ্যমে বা বিদ্যমান আইন সংশোধন করে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, বিচার ব্যবস্থাপনা, আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, ডিজিটালাইজেশন সম্প্রসারণ ও দুর্নীতি প্রতিরোধে বিভিন্ন সংস্কার সম্পন্ন করা হয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আমাদের আরেকটি গুরুদায়িত্ব হচ্ছে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান। আমি ঘোষণা করেছি যে আগামী ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই নির্বাচন উৎসবমুখর, অংশগ্রহণমূলক ও সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠানের জন্য আমরা সব প্রস্তুতি গ্রহণ করছি।
সংস্কারের লক্ষ্য নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের দীর্ঘ কর্মপ্রক্রিয়ার কথা তুলে ধরে কমিশনের সভাপতি ইউনূস বলেন, ঐকমত্য কমিশনের প্রণীত জুলাই সনদে সংবিধান বিষয়ক ৩০টি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাবে রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে ঐকমত্য তৈরি হয়েছে। এটি একটি ঐতিহাসিক অর্জন।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, এসব বিবেচনায় রেখে এবং রাজনৈতিক দলগুলো কর্তৃক স্বাক্ষরিত জুলাই সনদকে মূল দলিল হিসেবে ধরে নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার আজকের উপদেষ্টামণ্ডলীর সভায় জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ অনুমোদন করেছে। এটি বিরাট খবর। প্রয়োজনীয় স্বাক্ষর শেষে এটি ইতোমধ্যে গেজেট নোটিফিকেশন করার পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।
জুলাই সনদ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এই আদেশে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিধান রাখার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, এর মধ্যে রয়েছে সনদের সংবিধান বিষয়ক সংস্কার প্রস্তাবনার ওপর গণভোট অনুষ্ঠান এবং পরবর্তী সময়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের সিদ্ধান্ত।





