দেশে শক্তিশালী ভূমিকম্পের আঘাত
প্রকাশিত হয়েছে : ২১ নভেম্বর ২০২৫, ৮:২৫:৫৪ অপরাহ্ন
রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ৫ দশমিক ৭ নিহত অন্তত: ৬,
আহত অর্ধ সহস্রাধিক , উৎপত্তিস্থল নরসিংদী

জালালাবাদ রিপোর্ট: এক ভূমিকম্প কাঁপিয়ে দিল গোটা বাংলাদেশকে। সিলেটে কম অনুভূত হলেও ঢাকাসহ আশাপাশ এলাকায় তীব্র ঝাঁকুনি শুক্রবার সকালের এই ভূমিকম্প। এই ঝাঁকুনিকে এযাবৎকালের সর্বোচ্চ বলা হচ্ছে।
সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে এই ভূমিকম্প আঘাত হানে। ভূমিকম্পটি কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী ছিল। বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৭। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) মাত্রা দেখাচ্ছে ৫ দশমিক ৫। ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল নরসিংদীর মাধবদীতে, ভূপৃষ্ঠের ১০ কিলোমিটার গভীরে।কম্পনের ধাক্কায় অনেক ভবনের জানালার কাঁচ ভেঙে গেছে এবং অনেক জায়গায় ভবন হেলে পড়ার খবর পাওয়া গেছে। বেশ কিছু ভবনের দেওয়ালে ফাটল দেখা গেছে। ঢাকায় নিহত হয়েছেন অন্তত: ৪ জন। ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় আহত হয়েছেন অন্তত: অর্ধ সহস্রাধিক।
ইউএসজিএস আরও জানায়, ভূমিকম্পটি ভারতীয় প্লেটের ভেতরে অগভীর গভীরতায় রিভার্স ফল্টের ফলে সংঘটিত হয়েছে। ফোকাল মেকানিজম বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পূর্বমুখী মাঝারি ঢালযুক্ত একটি ফল্টে অথবা পশ্চিম-উত্তর-পশ্চিমমুখী মাঝারি ঢালযুক্ত আরেকটি মাঝারি ঢালযুক্ত ফল্টে বিচ্ছেদ বা রাপচার ঘটেছে।
ইউএসজিএস-এর তথ্যমতে, ভূমিকম্পটির কেন্দ্রস্থল রাজধানী ঢাকা থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে। এদিকে, এমন ভূমিকম্পের শঙ্কা বিশেষজ্ঞরা আগেই প্রকাশ করে আসছিলেন। এই ভূমিকম্প বাংলাদেশের জন্য সজাগ হওয়ার বার্তা বলে মনে করছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পূরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মেহেদি আহমেদ আনসারী।ভূমিকম্প-বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক হুমায়ুন আখতার বেলা ১১টার দিকে বলেন, যে অঞ্চলে ভূমিকম্পটি হয়েছে, সেটি ইন্দো-বার্মা টেকটোনিক প্লেটের অংশভুক্ত। ভূমিকম্পটিতে যে তীব্র, যে প্রচণ্ড ঝাঁকুনি অনুভূত হয়েছে, তা তাঁর অভিজ্ঞতায় বাংলাদেশের পটভূমিতে এযাবৎকালের মধ্যে সর্বোচ্চ।
ঢাকায় ভূমিকম্পের ফলে তীব্র ঝাঁকুনি অনুভূত হলেও সিলেটে তা ছিল তুলনামূলকভাবে হালকা। অনেকেই টেরও পাননি। তবে ঢাকার ঝাঁকুনিতে সিলেটে নগর এলাকার বহুতল ভবনের মানুষ আতঙ্কে রাস্তায় বেরিয়ে আসেন।
বাংলাদেশ বা এই ভূখণ্ডে বড় ভূমিকম্পের মধ্যে আছে ১৭৬২ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্প। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৮ দশমিক ৫। এটি ‘গ্রেট আরাকান আর্থকোয়েক’ নামে পরিচিত। এর ফলে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম, ফেনী, এমনকি কুমিল্লা পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এরপর ১৮৯৭ সালে আসামে সংঘটিত ভূমিকম্প ছিল ৮ দশমিক ৭ মাত্রার।১৯১৮ সালে সিলেটের বালিসিরা উপত্যকায় ৭ দশমিক ৬ মাত্রায় এবং ১৯৩০ সালে আসামের ধুবড়িতে ৭ দশমিক ১ মাত্রার ভূমিকম্প হয়।
বড় ভূমিকম্পগুলো ১৫০ বছর পরপর ফিরে আসার আশঙ্কা থাকে। এদিক থেকে ৭ মাত্রার ভূমিকম্পগুলো ফেরত আসার সময় হয়ে গেছে। তাই গতকালের এই ভূমিকম্পের পর সবাইকে সচেতন ও সাবধান হতে হবে।
পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও এই ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এনডিটিভির খবরে বলা হয়, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতাসহ আশপাশের এলাকায় ভূমিকম্প অনুভূত হয়। ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল নরসিংদী।
পুরান ঢাকায় নিহত ৩, তিন জেলায় আহত অর্ধশতাধিক :
ভূমিকম্পে শুক্রবার সকালে ৩ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। ঢাকা, নরসিংদী, গাজীপুরে আহত হয়েছেন অর্ধশতাধিক।নিহতদের মধ্যে দুজনের নাম জানা গেছে। একজনের নাম রাফিউল ইসলাম। তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্র বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক। তবে মিটফোর্ড হাসপাতালের জরুরি বিভাগের ওয়ার্ড মাস্টার সাজ্জাদ বলেছেন, তিনি সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের ছাত্র।
মিটফোর্ড হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, নিহত আরেকজনের নাম সবুজ। তাঁর বয়স ৩০ বছর। ৮ বছরের একটি শিশুর মরদেহ আনা হয়েছে। তার পরিচয় জানা যায়নি।স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ) আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান জানান, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৩ জন মারা গেছেন।
মিটফোর্ড হাসপাতালের জরুরি বিভাগের ওয়ার্ড মাস্টার সাজ্জাদ বলেন, ভূমিকম্পের পর তিনজনের মরদেহ আনা হয়েছে। পুরান ঢাকা থেকে তাঁদের মরদেহ আনা হয়।পুলিশের লালবাগ বিভাগের উপকমিশনার মল্লিক আহসান উদ্দিন সকালে বলেন, ভূমিকম্পের সময় পুরান ঢাকার কসাইটুলি এলাকার একটি ভবনের রেলিং ধসে পড়ে তিনজন ঘটনাস্থলে নিহত হন। তাঁরা রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ সদস্যরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তাৎক্ষণিকভাবে সকালে নিহতদের নাম-পরিচয় জানাতে পারেনি পুলিশ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, ভূমিকম্পে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১০ জন আহত হয়েছেন। গাজীপুরের তাজউদ্দীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আহত হয়েছেন ১০ জন।
নরসিংদী জেলা হাসপাতালে আহত ৪৫ জনের মধ্যে তিনজনকে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়েছে। নরসিংদী ১০০ শয্যা হাসপাতালে আহত হয়েছেন ১০ জন। টেলিফোনে হতাহতের এসব খবর জানা গেছে বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে।
উৎপত্তিস্থল নরসিংদীতে আতঙ্ক-হুড়োহুড়ি, প্যানিক অ্যাটাকে হাসপাতালে ৬২ :
নরসিংদীতে ভূমিকম্পের সময় একটি একতলা ভবনের ছাদ ধসে দুই শিশুসহ তিনজন গুরুতর আহত হয়েছেন। শুক্রবার সকালে সদরের চিনিশপুর ইউনিয়নের গাবতলী এলাকার একটি মহিলা মাদ্রাসাসংলগ্ন বাড়িতে এই দুর্ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া আরও ৫৯ জন ব্যক্তি সামান্য আহত হয়ে, অজ্ঞান হয়ে ও প্যানিক অ্যাটাকের কারণে নরসিংদী সদর হাসপাতাল ও জেলা হাসপাতালে এসেছেন বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা।
গুরুতর আহত তিনজন হলেন, ওই বাড়ির বাসিন্দা মো. দেলোয়ার (৩৭), তাঁর দুই সন্তান তাসফিয়া (১৭) ও মো. ওমর (৯)। নরসিংদী সদর হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ৩ জনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।
স্থানীয়রা বলছেন, ভূমিকম্পের সময় পার্শ্ববর্তী একটি বহুতল ভবনের ছাদ থেকে নির্মাণসামগ্রী ছিটকে পড়ে একতলা ভবনটিতে। এতে ভবনটির ছাদের কিছু অংশ ধসে পড়ে। এ সময় দেলোয়ার, তাসফিয়া ও ওমর ঘর থেকে বাইরে বের হচ্ছিলেন। ছিটকে পড়া নির্মাণসামগ্রী ও ধসে পড়া ছাদের টুকরো মাথায় পড়ে গুরুতর আহত হন তাঁরা।
গাজীপুরের দুই কারখানায় হুড়োহুড়ি, আহত দুই শতাধিক শ্রমিক :
গাজীপুর মহানগরের টঙ্গী ও জেলার শ্রীপুরে ভূমিকম্পের সময় আতঙ্কে তাড়াহুড়ো করে কারখানা থেকে বের হতে গিয়ে দুই শতাধিক শ্রমিক আহত হয়েছেন। আহতদের বেশিরভাগকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
শুক্রবার সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে সারাদেশে ভূমিকম্প অনুভূত হলে টঙ্গীর বিসিক এলাকার ফ্যাশন পালস লিমিটেড এবং শ্রীপুর পৌরসভার কেওয়া পূর্বখণ্ড গ্রামের ডেনিম্যাক কারখানায় এ ঘটনা ঘটে।
শ্রমিক ও স্থানীয় সূত্র জানায়, সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও টঙ্গীর ফ্যাশন পালস লিমিটেডে কয়েক হাজার শ্রমিক কাজ করছিলেন। ভূমিকম্প শুরু হলে নয়তলা ভবনের প্রায় সব শ্রমিক একসঙ্গে বের হওয়ার চেষ্টা করেন। এতে কারখানার ভেতরে হুড়োহুড়ি শুরু হয়। এ সময় জরুরি নিরাপত্তা গেট বন্ধ থাকায় পদদলিত হয়ে অনেকে আহত হন। পরে আহতদের টঙ্গীর শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতালসহ আশপাশের বিভিন্ন হাসপাতালে নেওয়া হয়।





