বড়দের ঋণে খেলাপির হার ছোটদের তিনগুণ
প্রকাশিত হয়েছে : ২৩ নভেম্বর ২০২৫, ৮:৪৯:৫২ অপরাহ্ন

জালালাবাদ ডেস্ক: দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ দিন দিন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ছোট ও মাঝারি ঋণের তুলনায় বড় ঋণগুলো বেশি খেলাপিতে পরিণত হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ১ কোটি টাকার মধ্যে দেওয়া ছোট ঋণের খেলাপি হার ১৬ শতাংশ হলেও ৫০ কোটি টাকার ঊর্ধ্বে দেওয়া বড় ঋণে খেলাপি হার উঠেছে ৪৮ শতাংশে। অর্থাৎ বড় ঋণে খেলাপির হার ছোট ঋণের তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেশি। অর্থনীতিবিদসহ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ প্রবণতা অত্যন্ত ঝুঁঁকিপূর্ণ। কারণ বড় ঋণের খেলাপি শুধু ব্যাংককে নয়, দেশের সার্বিক আর্থিক স্থিতিশীলতাকে নাড়িয়ে দিতে পারে। বড় গ্রাহকরা যখন ঋণ ফেরত দেয় না, তখন ব্যাংকের মূলধন থেকে শুরু করে আমানতকারীর অর্থ পর্যন্ত ঝুঁঁকিতে পড়ে। এই ঝুঁকি রোধে যথাযথভাবে ঋণ নিয়মাচার পরিপালন, প্রভাবশালী গ্রাহকদের প্রতি অতিরিক্ত নমনীয়তা বন্ধ ও বারবার ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ সীমিতকরণ, ঋণ আদায়ে তদারকি জোরদার এবং খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারে কঠোর আইন প্রয়োগের পরামর্শ দেন তারা।
ব্যাংকগুলো বরাবরই বড় গ্রাহকদের ঋণ দিতে বেশি আগ্রহী। আবার এসব ঋণে প্রভাবশালীদের চাপ এবং অনিয়ম-দুর্নীতি বেশি হয়। অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকের সক্ষমতা ও ঝুঁকি বিবেচনা না করে এবং উপযুক্ত জামানত ছাড়াই ঋণ তুলে দেওয়া হয়। সূত্র বলছে, শেখ হাসিনা সরকারের আমলে ব্যাংকগুলোতে ঋণের নামে যে লুটপাট হয়েছে, তার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন বড় গ্রাহকরা। এখন সেসব গ্রাহকের প্রকৃত চিত্র দেখানো শুরু করায় ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণও ঊর্ধ্বমুখী হয়ে পড়েছে। এতে তাদের মূলধন হারানোর ঝুঁকিও বেড়েছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমেদ চৌধুরী আমাদের সময়কে বলেন, বড় গ্রাহকদের ঋণের তথ্যই বেশি লুকানো হয়। সেটি এখন বেরিয়ে আসছে। এটা কমাতে ঋণ আদায়ে জোর দিতে হবে। সেই সঙ্গে ঋণ বিকেন্দ্রীকরণ তথা ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের মাঝে বিতরণ বাড়াতে হবে। এর জন্য দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা উচিত।
গত সপ্তাহে ব্যাংকিং সেক্টর আপডেট শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ওই প্রতিবেদনে গ্রাহকের ঋণের পরিমাণ (আকার) অনুযায়ী খেলাপির হারও তুলে ধরা হয়েছে। তাতে দেখা যায়, গত জুন শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রথমবার ছয় লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। সার্বিক খেলাপির হার উঠেছে প্রায় ৩৫ শতাংশ। এর মধ্যে বড় গ্রাহকদের (৫০ কোটি ১ টাকা থেকে তদূর্ধ্ব) বিতরণ করা ঋণের বিপরীতে খেলাপির হার দাঁড়িয়েছে ৪৮ দশমিক ২ শতাংশ। আর মাঝারি ঋণে খেলাপির হার ৩৮ থেকে ৪৫ শতাংশের মধ্যে। এর মধ্যে ৪০ কোটি থেকে ৫০ কোটি টাকার মধ্যে ঋণে খেলাপির হার ৪৫ দশমিক ৭০ শতাংশ, ৩০ কোটি থেকে ৪০ কোটি টাকার মধ্যে ঋণে খেলাপির হার ৪২ দশমিক ১০ শতাংশ, ২০ কোটি থেকে ৩০ কোটির ঋণে খেলাপির হার ৩৮ শতাংশ এবং ১০ কোটি থেকে ২০ কোটির ঋণে ৪৫ দশমিক ৭০ শতাংশ। আর ক্ষুদ্র ও ছোট ঋণের খেলাপির হার ১৬ থেকে ২৬ শতাংশ। এর মধ্যে ১ কোটি ১ টাকা থেকে ১০ কোটি টাকার ঋণে খেলাপির হার ২৬ দশমিক ১০ শতাংশ এবং ১ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণে খেলাপ্রি হার ১৬ শতাংশ।
বেসরকারি ব্যাংকের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন এমডি বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ আমলে বড় ঋণগ্রহীতাদের অতিরিক্ত সুবিধা দেওয়া হয়। তাদের ঋণ পুনঃতফসিল করা হয় বারবার, এমনকি নতুন ঋণ দিয়ে পুরনো ঋণ ঢেকে দেওয়া হয়। ফলে খেলাপি ঋণ লুকানো অবস্থায় ছিল। তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর অবস্থানে সেই লুকানো খেলাপি ঋণ এখন বেরিয়ে আসছে। এ কারণে তাদের খেলাপির হারও সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, ছোট ঋণগ্রহীতারা নিয়ম মেনে চললেও বড়রা নিয়ম ভাঙে বেশি। এ অবস্থা না বদলালে ব্যাংকিং খাতের ওপর চাপ আরও বাড়বে।
বড় ঋণে খেলাপি কেন বেশি : বেশিরভাগ বড় ঋণ খেলাপি হওয়ার ক্ষেত্রে মোটা দাগে চারটি সমস্যা চিহ্নিত করেছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। এগুলো হলো- দুর্বল ঋণ মূল্যায়ন, প্রভাবশালী গ্রাহকদের প্রতি অতিরিক্ত ছাড়, ঋণ ব্যবহার না করে অন্যত্র সরানো এবং তদারকির ঘাটতি। ব্যাংকের ঋণ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, বড় অংকের ঋণ অনুমোদনে অনেক সময় ‘প্রভাবশালী’ গ্রাহকদের চাপ থাকে। ফলে ঋণ বিতরণে ব্যবসার প্রকৃত লাভজনকতা বা প্রকল্পের বাস্তবায়ন সক্ষমতা পর্যাপ্তভাবে যাচাই করা হয় না। ফলে পরবর্তীকালে দেখা যায়, প্রকল্প লাভজনক হয়নি বা আয় কমে যাওয়ায় ঋণ ফেরত দিতে পারছে না গ্রহীতারা। আবার সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের ঋণ অন্যত্র সরিয়ে ফেলার নজিরও রয়েছে বড় গ্রাহকদের মধ্যে।
ছোট ঋণে খেলাপি কেন কম : ব্যাংকাররা জানান, ছোট উদ্যোক্তা বা খুচরা গ্রাহকের ক্ষেত্রে নিয়ম মেনে যেমন ঋণ দেওয়া হয়, তেমনি কঠোর তদারকি করে ব্যাংকগুলো। আবার ছোট উদ্যোক্তারা বড়দের মতো বিশেষ ছাড় ও অতিরিক্ত সুবিধা তেমন পান না। তাঁরা কিস্তি মিস করলে দ্রুতই সতর্কবার্তা আসে, এমনকি আইনি নোটিশও আসে। ফলে ছোটরা ঋণ পরিশোধে বেশি মনোযোগী থাকে এবং তাদের খেলাপি হওয়ার ঝুঁকি কম থাকে।





