নির্বাচনের দিন গণভোট : ইসির সামনে নানা চ্যালেঞ্জ
প্রকাশিত হয়েছে : ২৬ নভেম্বর ২০২৫, ৯:০৪:৫৮ অপরাহ্ন

জালালাবাদ রিপোর্ট : গণভোট ও সংসদ নির্বাচন। একই দিনে দুই ভোট দেখার অপেক্ষায় দেশ। এই দুই ভোট সবার আগ্রহের কেন্দ্রে থাকলেও ‘চোখে সর্ষে ফুল’ নির্বাচন কমিশনের। সুষ্ঠু ও সফলভাবে ভোট আয়োজনে চ্যালেঞ্জও দেখছে ইসি।
বাংলাদেশে এর আগে তিনটি গণভোট হলেও জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন গণভোট আয়োজনের কোন নজির নেই। এমন পরিস্থিতিতে প্রবাসী ভোটসহ একই দিনে প্রায় ১৩ কোটি ভোটারের নির্বাচন আয়োজনে ইসির সক্ষমতা কতটুকু সেই প্রশ্নও সামনে আসছে।
গত শনিবার ঢাকায় একটি অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেছেন, একই দিনে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট আয়োজন করতে ইসিকে অনেকগুলো অতিরিক্ত কাজ করতে হবে।মঙ্গলবার র গণভোটের অধ্যাদেশ জারির পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকে একটি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সেখানে আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল বলেছেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন যে সব কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হবে সে সব কেন্দ্রেই অনুষ্ঠিত হবে গণভোট। এবং জাতীয় নির্বাচনের ফলাফলের সাথেই গণভোটের ফলাফল ঘোষণা করা হবে।
এখন নির্বাচন বিশ্লেষকরা বলছেন, সংসদ নির্বাচনের দিন সারাদেশে একসাথে দুটি ভোট দেওয়া ও সেটি গণনা করতে হলে একদিকে যেমন ভোটারদের দীর্ঘ লাইন তৈরি হবে, অন্যদিকে গণনা শেষে ফলাফল প্রস্তুত করতেও অনেক সময় লাগবে।
গণভোটের সিদ্ধান্ত হওয়ার আগেই জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে সারাদেশের ভোটকেন্দ্রের তালিকা ও সংখ্যা চূড়ান্ত করে ইসি নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করেছে বেশ কয়েকদিন আগে।যেখানে একটি নারী বুথে ৫০০ জন, আর পুরুষ বুথে ৬০০জন ভোট দিবে এমন হিসাব করে কেন্দ্র বিন্যাস করা হয়েছিল।এখন গণভোটের সিদ্ধান্তের পর কেন্দ্রে ভোটারের দীর্ঘ লাইন ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরির শঙ্কাও দেখছেন বিশ্লেষকরা।
এ অবস্থায় গতকাল বুধবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সন্তোষজনক নয়। তবে নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার পর পরিস্থিতি ভালো হবে।
কীভাবে হবে গণভোট?
গত ১৩ নভেম্বর জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস একই দিনে দুইটি নির্বাচন আয়োজনের ঘোষণা দেন।এরপরই গণভোট নিয়ে অধ্যাদেশ বা তৈরির কাজ শুরু করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। মঙ্গলবার সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে গণভোট অধ্যাদেশ-২০২৫ এর খসড়া নীতিমালার অনুমোদন দেয়া হয়।
পরে সংবাদ সম্মেলনে আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল বলেন, প্রথমবারের মতো প্রবাসীর ভোট দিবে। আবার একই দিনে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জটা অনেক বড়।
আইন উপদেষ্টা জানান, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতকৃত ভোটকেন্দ্রেই গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। সেই বিষয়টিও যুক্ত করা হয়েছে অধ্যাদেশে। একই সাথে জাতীয় নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতকৃত ভোটার তালিকাই হবে গণভোটের ভোটার তালিকা।
সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সংসদ নির্বাচনের জন্য দায়িত্বে যে সব রিটার্নিং অফিসার, প্রিসাইডিং অফিসার বা পোলিং অফিসাররা থাকবেন, তারাই গণভোটের নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করবেন। গণভোটের চারটি বিষয় উল্লেখ থাকলে হ্যাঁ বা না ভোট দেওয়ার জন্য একটি মাত্র ভোট দিতে হবে বলেই জানিয়েছেন আইন উপদেষ্টা।তিনি বলেন, কমিশন কর্তৃক নির্ধারিত পদ্ধতিতে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। গণভোটের প্রশ্নটিতে হ্যাঁ/না ঘরে কমিশন কর্তৃক নির্ধারিত সিল দিয়েই ভোট প্রদান করা হবে।
এবার প্রথমবারের মতো প্রবাসীদের ভোট দিতে এরই মধ্যে নানা প্রস্তুতি শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন। যে কারণে জাতীয় নির্বাচনের মতো গণভোটেও ভোট দিতে পারবেন প্রবাসী ভোটাররা।
এক দিনে দুই ভোটে যত চ্যালেঞ্জ :
জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোটের সিদ্ধান্ত সরকারের পক্ষ থেকে আগেই জানানো হয়েছিল। গণভোট আয়োজন কবে হবে এ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও নানা মতপার্থক্য তৈরি হয়।এমন সংকটের মধ্যেই জুলাই সনদ চূড়ান্তে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনই গণভোট আয়োজনে সরকারের সিদ্ধান্তের কথা গত ১৩ নভেম্বর জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে জানান প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। গত বৃহস্পতিবার এই ভোট আয়োজনের প্রস্তুতি নিতে নির্বাচন কমিশনকে চিঠি পাঠায় সরকার।
সরকারের ওই চিঠি পাওয়ার গত শনিবার ঢাকায় একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেন, একই দিনে নির্বাচন ও গণভোট আয়োজন করতে হবে, একই রিসোর্স ব্যবহার করে। এটা আগে ছিল না। আগের কোনো কমিশনকে এই চ্যালেঞ্জ নিতে হয়নি। এজন্য অনেকগুলো অতিরিক্ত কাজ করতে হবে।
নির্বাচন কমিশনের একাধিক কর্মকর্তা বিবিসিকে বলেছেন, আর কয়েকদিনের মধ্যেই জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হবে। যে কারণে আগেই ভোটকেন্দ্র চূড়ান্ত করা হয়েছে। কয়েক মাস আগে থেকে প্রশিক্ষণও শুরু হয়েছে।
ইসির সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এর আগে ৩০০টি সংসদীয় আসনের জন্য ইসির নির্ধারিত কেন্দ্রের সংখ্যা ছিল ৪২ হাজার ৭৬১টি। এরমধ্যে পুরুষদের জন্য এক লাখ ১৫ হাজার ১৩৭ এবং নারীদের জন্য এক লাখ ২৯ হাজার ৬০২ ভোটকক্ষ নির্ধারণ করা হয়েছিল।
এক্ষেত্রে গড়ে ৬০০ পুরুষ ভোটারদের জন্য একটি কক্ষ এবং ৫০০ নারী ভোটারদের জন্য একটি কক্ষ নির্ধারণ করা হয়েছিল।কমিশনের সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তারা বলছেন, এবারের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ফেব্রুয়ারির শুরুতে। তখন শীতকাল থাকবে। ভোট হবে সকাল ৮টা থেকে বিকেলে ৪টা পর্যন্ত।সেক্ষেত্রে ৪৮০ মিনিটের মধ্যে একটি নারী বুথে ৫০০ জন এবং পুরুষ বুথে ৬০০ জনকে ভোট দিতে হবে। যেটিকে অনেকটা চ্যালেঞ্জিং বলে মনে করছে বিশ্লেষকরা।
সাবেক নির্বাচন কর্মকর্তা ও বিশ্লেষক জেসমিন টুলী বলেন, এমনিতেই শীতের দিন। তার ওপর দুইটি ব্যালটে ভোট দিতে হবে। আমাদের দেশের অনেক ভোটারই এটি নিয়ে খুব একটা সচেতন না। যে কারণে ভোট দিতে সময় লাগতে পারে। যাতে বিশৃঙ্খলাও বাড়তে পারে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক নির্বাচনের ইতিহাস বলছে, একই দিনে ৩০০ আসনে একটি ব্যালটে ভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার পর ফলাফল হতেই দীর্ঘ সময় লেগে যায়। এবার সেখানে বাড়তি একটি ব্যালট যুক্ত হচ্ছে যেটি ইসির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
গত ১৩ নভেম্বরই জাতির উদ্দেশে ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা জানিয়েছিলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে চারটি বিষয়ের ওপর আলোকপাত করা হলেও সেখানে একটি প্রশ্নই থাকবে। এবং এতে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দেবেন ভোটাররা।





