জকিগঞ্জের ফিশারী শিল্পে সহস্রাধিক যুবকের কর্মসংস্থান
প্রকাশিত হয়েছে : ২৯ নভেম্বর ২০২৫, ৮:০৮:৪১ অপরাহ্ন

এখলাছুর রহমান, জকিগঞ্জ: সিলেটের সীমান্তঘেঁষা উপজেলা জকিগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে মৎস্যসম্পদের জন্য পরিচিত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কয়েকডজন ফিশারী গড়ে ওঠার ফলে স্থানীয় অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। বারঠাকুরী, আটগ্রাম, কাজলশাহ, সোনাসার, খলাছড়া ও কসকনকপুর এলাকায় গড়ে ওঠা এসব ফিশারীতে রুই, কাতলা, মৃগেল, তেলাপিয়া, পাঙ্গাসসহ বিভিন্ন উন্নতজাতের মাছ চাষ করা হচ্ছে।
ফিশারী মালিকরা জানিয়েছেন, আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করে পুকুর পরিচালনা ও মাছ চাষ করলে উৎপাদন অনেক বৃদ্ধি পায়। কাজলসার এলাকার ফিশারী মালিক মারুফ আহমদ বলেন, আমরা আগে শুধু মৌসুমি মাছ ধরতাম। এখন আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে সারা বছর মাছ উৎপাদন করতে পারছি। এতে পরিবারের আয় বেড়েছে এবং গ্রামের যুবকরা কাজে যুক্ত হচ্ছে।
বিরশ্রীর ফিশারী মালিক জামাল মিয়া বলেন, শুকনো মৌসুমে মাছ চাষের মাধ্যমে সন্তোষজনক উপার্জন করতে পারলেও বর্ষা মৌসুমে বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয়। এসময় জেলেদের জালে প্রচুর পরিমাণ দেশীয় প্রজাতির মাছ ধরা পড়ে। ফলে ক্রেতাসাধারণের আগ্রহ থাকে দেশীয় মাছের দিকেই। এছাড়া বন্যা হলে অনেক সময় ফিশারির পাড় পানিতে ডুবে যায়। এতে ফিশারীর মাছ বেরিয়ে যাওয়ার ফলেও ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয়। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, শুধুমাত্র নদীতে শক্তিশালী বাঁধ নির্মাণ না করার কারণে বন্যার পানিতে আমাদেরকে বিরাট ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয়। আমাদের ফিশারী মালিকদের টিকিয়ে রাখতে হলে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নদীর উপরে টেকসই বাঁধ নির্মাণে উদ্যোগী হতে হবে।
ফিশারির কারণে স্থানীয় শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হওয়ায় তাঁরাও সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। বারঠাকুরীর ফিশারী শ্রমিক জয়নাল আবেদীন বলেন, শুধু মৌসুমে মাছ ধরে জান বাঁচানো যেতো না। বছরের বিরাট অংশ উপার্জনহীন থাকতে হতো। এখন ফিশারীর কারণে পুরো বছর কাজ করতে পারি। এতে পরিবারের খরচ মেটানোসহ কিছু সঞ্চয়ও হয়।
জকিগঞ্জ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম জানান, জকিগঞ্জের হাওরাঞ্চল মাছ চাষের জন্য খুবই উপযুক্ত। এখানে ফিশারী খাত দ্রুত উন্নতি করছে। আমরা চেষ্টা করছি আরও যুবককে মাছ চাষে উৎসাহিত করতে প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়ে তাদের সক্ষম করে তুলতে।
এছাড়া জকিগঞ্জ উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা রাজু আহমেদ বলেন, হাওরের ফিশারী খাত শুধুমাত্র অর্থনৈতিক কারণেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, এটি যুবসমাজের জন্য নতুন কর্মসংস্থানও সৃষ্টি করেছে। আমরা স্থানীয় যুবকদের প্রশিক্ষণ, ঋণ সুবিধা ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়ে তাদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। হাওরের ফিশারীগুলো শুধু স্থানীয় বাজারে নয়, দেশের বিভিন্ন জেলায়ও মাছ সরবরাহ করছে। এতে ব্যবসায়ীরা লাভবান হচ্ছেন এবং স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হচ্ছে। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে যখন কৃষিকাজ কম থাকে, তখন এই খাত শতাধিক পরিবারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করছে। তবে কিছু সমস্যা ও চ্যালেঞ্জও রয়েছে। পুকুরের জলাবদ্ধতা, মাছের খাদ্য সরবরাহ, রোগ নিয়ন্ত্রণ এবং পর্যাপ্ত সরকারি সহায়তার অভাব কিছু ক্ষেত্রে উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছে। বারহালের ফিশারী মালিক আবদুল হামিদ বলেন, যদি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষ, সরকারি ঋণ সুবিধা এবং প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা যায়, তাহলে জকিগঞ্জের হাওরাঞ্চল দেশের অন্যতম বড় মাছ উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত হতে পারে। ফলে হাওরে ফিশারী খাত কেবল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করছে না, স্থানীয় যুবকদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানও সৃষ্টি করছে। স্থানীয়রা আশাবাদী যে, সঠিক পরিকল্পনা ও সরকারি সহায়তার মাধ্যমে জকিগঞ্জের হাওরাঞ্চল দেশের বৃহৎ মাছ উৎপাদন কেন্দ্র হয়ে উঠবে।





