ভোটের আগে অস্ত্র উদ্ধারে চ্যালেঞ্জ
প্রকাশিত হয়েছে : ০২ ডিসেম্বর ২০২৫, ১২:৩০:৪৬ অপরাহ্ন
১ মাসে ৮ এয়ারগানসহ ১৩ অস্ত্র উদ্ধার

এমজেএইচ জামিল:
দেশে নির্বাচনের ঢামাডোল বেজে উঠেছে। ফেব্রুয়ারীতে ত্রয়োদশ নির্বাচন আয়োজন নিয়ে ব্যাপক প্রস্তুতি। এমন পরিস্থিতিতে সিলেটজুড়ে আতংক বাড়াচ্ছে আগ্নেয়াস্ত্র। শুধু তাই নয়, সিলেটে সীমান্তে আগ্নেয়াস্ত্রের পাশাপাশি উদ্ধার হচ্ছে শক্তিশালী বিস্ফোরক দ্রব্য ও ডেটোনেটর। পাওয়া যাচ্ছে সাউন্ড গ্রেনেডও।
গত নভেম্বর মাসে র্যাব ও বিজিবির অভিযানে ৮টি এয়ারগানসহ ১৩ টি অস্ত্র, ২৫০ গ্রাম বিস্ফোরক, দুটি ডেটোনেটর উদ্ধার করা হয়। এয়ারগান আগ্নোয়াস্ত্রের আওতায় না পড়লেও এটি জনসাধারণের জন্য ব্যবহার নিষিদ্ধ। এছাড়া একটি অসাধু চক্র এয়ারগানকে শর্টগানে রূপান্তর করে এগুলোকে আগ্নেয়াস্ত্রে পরিনত করছে। তাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনী এয়ারগান উদ্ধারে অভিযান জোরদার করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে।
র্যাব, পুলিশ ও বিজিবির পৃথক অভিযানে সিলেট থেকে অস্ত্র ও বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনায় জনমনে বাড়ছে উদ্বেগ। একই সাথে ২০২৪ এর ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে খুয়া যাওয়া অস্ত্র এখনো উদ্ধার না হওয়ায় আগামী নির্বাচনে এর ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন খোদ প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা। র্যাব ও বিজিবি অভিযান জোরদারের কথা জানালেও অস্ত্র উদ্ধারের পুলিশের ভুমিকা হতাশাজনক। সচেতন মহলের দাবী পুলিশ চাইলেই খুয়া যাওয়া অস্ত্রসহ সবধরণের অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার কোন ব্যাপার না। এজন্য প্রয়োজন শক্তিশালী গোয়েন্দা তৎপরতা। অন্যথায় আগামী জাতীয় নির্বাচনে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে শঙ্কা অনেকের।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত নভেম্বর মাসে শুধু র্যাবের অভিযানেই সিলেট থেকে ১টি বিদেশী পিস্তল, ১টি শর্টগান, ৮টি এয়ারগান, ১টি সাউন্ড গ্রেনেড, ২টি পিস্তলের আদলে তৈরী দেশীয় আগ্নেয়াস্ত্র, ২টি ম্যাগজিন, ৭ রাউন্ড গুলি ও ১ হাজার ১২৫টি এয়ারগানের গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া নভেম্বর মাসে সিলেট ব্যাটালিয়ন ৪৮ বিজিবির অভিযানে ১টি বিদেশী রিভলবার, শক্তিশালী বিস্ফোরক ও ২টি ডেটোনেটর উদ্ধার করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৫ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী সরকারের পতনের পর সিলেট মহানগরীর ৬টি থানা ও কয়েকটি ফাঁড়িতে হামলা চালিয়ে দুর্বৃত্তরা লুট করে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গুলি। পুলিশের তথ্যমতে, মোট ১০১টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ৫৭৪০ রাউন্ড গুলি লুট হয়। যার মধ্যে এখনো ১৮টি অস্ত্র ও ৫১৯৯ রাউন্ড গুলির কোনো হদিস নেই। এছাড়াও ২০২৪ সালের মাঝামাঝি থেকে ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত সিলেট নগরীতে প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে রাজপথে মহড়া দেয় আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠন যুবলীগ ও ছাত্রলীগের একাংশ। নগরীর আখালিয়া, কোর্ট পয়েন্ট, জিন্দাবাজার ও চৌহাট্টা এলাকায় এসব সশস্ত্র মহড়ায় দেখা গেছে আধুনিক পিস্তল, রাইফেল ও স্নাইপারগান। গোয়েন্দা সূত্র বলছে, এসব অস্ত্র ১৮ জুলাই ও ৪ আগস্টের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় প্রকাশ্যে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু প্রদর্শিত অস্ত্রের একটিও উদ্ধার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনী।
অনুসন্ধানে আরো জানা গেছে, সিলেটের কানাইঘাট, জৈন্তাপুর ও সুনামগঞ্জের সীমান্তপথ দিয়ে প্রায় সময়ই অস্ত্র ও বিস্ফোরকের চালান দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে। গোয়েন্দা তথ্যমতে, ভারতীয় ‘আমিন এক্সপ্লোসিভ প্রাইভেট লিমিটেড’ কোম্পানিতে তৈরি নিওজেল-৯০ বিস্ফোরক, ডেটোনেটরসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম চোরাইপথে ঢুকছে বাংলাদেশে।
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ-এসএমপি সূত্রে জানা গেছে, চব্বিশের ৫ আগস্ট এসএমপির বিভিন্ন থানা, ফাঁড়ি ও পুলিশ সদস্যদের কাছ থেকে লুণ্ঠিত ১০১টি আগ্নেয়াস্ত্রের মধ্যে ৮৩টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হলেও বাকি ১৮টি আগ্নেয়াস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি। অন্যদিকে লুন্ঠিত ৫ হাজার ৭৪০ রাউন্ড গুলির মধ্যে ৫৪১ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া অস্ত্রগুলোর মধ্যে- এসএমজি, চায়না রাইফেল, পিস্তল, শর্টগান এবং গ্যাস গান রয়েছে বলে জানা গেছে।
র্যাব-৯ সূত্রে জানা গেছে, সর্বশেষ গত শনিবার (২৯ নভেম্বর) দিবাগত রাত প্রায় আড়াইটার দিকে র্যাব-৯ কর্তৃক সিলেটের জৈন্তাপুর থানার লক্ষীপ্রসাদ ফেরিঘাট এলাকার রশিদ ফিল্ড খেলার মাঠ সংলগ্ন একটি ক্লাবঘরের বারান্দায় অভিযান চালিয়ে আবর্জনার স্তুপের ভেতর থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় পিস্তল সদৃশ দেশীয়ভাবে তৈরি ২টি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে র্যাবের ধারণা এগুলো নাশকতার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছিল।
এর আগে গত ২৬ নভেম্বর সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার কুড়ারবাজার এলাকা একটি কাঠ বাগানের ঝোপের ভেতর থেকে পরিত্যাক্ত অবস্থায় ৫৩৫টি গুলিসহ ১টি এয়ারগান উদ্ধার করা।এরও আগে গত ২৫ নভেম্বর রাত সাড়ে বারোটার পর সিলেটের দক্ষিণ সুরমার সিলেট-সুনামগঞ্জ বাইপাস সড়কের মোল্লাগাঁও খিদিরপুর এলাকার একটি পাকা ঘরের ভেতর থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় একটি সাউন্ড গ্রেনেড উদ্ধার কওে র্যাব-৯। গ্রেনেডটি গত বছর জুলাই বিপ্লব চলাকালে সিলেটের কোন থানা থেকে লুট হওয়া বলে র্যাব ধারণা করেছে।
গত ২৪ নভেম্বর দিবাগত রাত সোয়া ১টার দিকে বিয়ানীবাজারের আলীনগরনস্থ কাঠ বাগান থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় ১টি বিদেশি এয়ারগান এবং একইদিন ঐ উপজেলার ছোটদেশ এলাকায় আগর গাছ ও বাঁশ বাগান থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় ১২৫টি এয়ারগানের গুলিসহ দুটি বিদেশি এয়ারগান উদ্ধার করে র্যাব-৯।
গত ২৩ নভেম্বর দিবাগত রাত ১টার দিকে অভিযান পরিচালনা করে সিলেটের বিয়ানীবাজার থানার আলীনগরস্থ একটি বাগানের ভিতর থেকে পরিত্যাক্ত অবস্থায় একটি এয়ারগান উদ্ধার করে র্যাব-৯।
একইদিন (২৩ নভেম্বর) দুপুর পৌণে ১২টার দিকে র্যাব-৯ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল থানার নোয়াগাঁওয়ের একটি ব্রিজের পাশের ঝোপের ভেতর থেকে ৪০৫ রাউণ্ড তাজা গুলি এবং দুটি এয়ারগান উদ্ধার করা হয়। এয়ারগান দুটি সচল ও গুলিগুলো তাজা রয়েছে বলে র্যাব জানিয়েছে।
এর আগের দিন ২২ নভেম্বর রাত দেড়টার দিকে সিলেটের গোলাপগঞ্জের রনকেলি নুরুপাড়ার একটি ঝোপঝাড়ের ভেতর থেকে পরিত্যাক্ত অবস্থায় ২টি এয়ারগান উদ্ধার করে র্যাব-৯। এসময় ৬০ রাউন্ড তাজা গুলিও উদ্ধার করা হয়।
গত ২০ নভেম্বর দিবাগত রাত আনুমানিক ৩টার দিকে র্যাব-৯ সিলেটের বিয়ানীবাজার থানাধীন লাউতা ইউনিয়নের জলডোপ কালিবহর এলাকায় বাঁশ ঝাড়ের ভিতর থেকে পরিত্যাক্ত অবস্থায় ১ টি শটগান উদ্ধার করে। প্রাথমিক পর্যালোচনায় জানা যায় এটি একটি দেশীয় ১২ বোর শটগান। সহজে বহন এবং নাশকতার কাজে ব্যবহারের জন্য এটিকে এয়ারগান থেকে ১২ বোর কার্টিজ ফায়ারের উপযুক্ত করা হয়। বর্তমানেও এটি সচল রয়েছে।
এর আগে গত ২ নভেম্বর সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক উপজেলার ছনবাড়ী সীমান্তে উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন ২৫০ গ্রাম বিস্ফোরক, দুটি ডেটোনেটর ও একটি বিদেশি রিভলভার উদ্ধার করে সিলেট ব্যাটালিয়ন ৪৮ বিজিবি।
এ ব্যাপারে র্যাব-৯ সিলেটের মিডিয়া অফিসার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কে.এম শহিদুল ইসলাম সোহাগ দৈনিক জালালাবাদকে বলেন, মাদক ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে র্যাব জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। আমাদের নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে বিভিন্ন থানা, ফাঁড়ি ও পুলিশ সদস্যদের কাছ থেকে লুণ্ঠিত অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে র্যাবের গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধি করা হয়েছে।
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া কর্মকর্তা অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম ইসলাম দৈনিক জালালাবাদকে বলেন, গণঅভ্যুত্থানের সময় এসএমপির বিভিন্ন থানা থেকে খুয়া যাওয়া অস্ত্র উদ্ধারে আমাদের তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। এছাড়া ২০২৪ এর জুলাই-আগস্টে প্রদর্শিত অস্ত্রধারিদের চিহ্নিত করা হলেও তারা দেশের বাইরে অবস্থান করছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানতে পেরেছি। নির্বাচনকে সামনে রেখে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে পুলিশ কঠোর অবস্থানে রয়েছে।
সিলেটের নবাগত পুলিশ সুপার কাজী আখতার উল আলম দৈনিক জালালাবাদকে বলেন, আমি নতুন যোগদান করেছি। প্রতিদিনই বিভিন্ন থানার খোঁজ খবর নিচ্ছি। সীমান্তের থানাগুলোতে শুধু অস্ত্র নয়, কোন ধরণের চোরাই পণ্য আসতে দেয়া হবেনা। এজন্য সীমান্তবর্তী থানাগুলোর জন্য বাড়তি সতর্কতার ব্যবস্থা করছি। কোন অবস্থাতেই অবৈধ অস্ত্র সিলেট সীমান্ত দিয়ে দেশে প্রবেশ করতে দেয়া হবেনা।





