চুঙ্গাপিঠা উৎসবে মেতেছেন জকিগঞ্জের লোকজন
প্রকাশিত হয়েছে : ০৩ ডিসেম্বর ২০২৫, ৭:৩০:৪২ অপরাহ্ন

এখলাছুর রহমান, জকিগঞ্জ: হেমন্তের শেষ প্রান্তে এসে সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার গ্রামগুলোতে চলছে ধান কাটার উৎসব। চারদিকে সোনালি ধানের সমারোহ, হালকা নরম রোদ, শীতের হালকা ছোঁয়া-সব মিলিয়ে পুরো উপজেলায় নেমে এসেছে এক উৎসবমুখর পরিবেশ। মাঠের একপাশে কাস্তের ঝনঝন শব্দ, অন্যপাশে ধান মাড়াইয়ের ব্যস্ততা। কর্মমুখর দিন শেষে সন্ধ্যা হলেই ঘরে ঘরে শুরু হয় চুঙ্গাপিঠা তৈরির মহোৎসব। এসময় নারী-পুরুষ ও শিশুরা মিলে এক অনাবিল আনন্দে মেতে ওঠে। ধান কাটার মৌসুম এবং চুঙ্গাপিঠা-দু’টিই এই অঞ্চলের গ্রামীণ সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।
বারঠাকুরী গ্রামের কৃষক মোফাজ্জল আলী বলেন, আল্লাহর রহমতে এবার ধানের ফলন খুব ভালো হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে ছিল। এখন শুধু কাটার আনন্দ। ব্যস্তদিন শেষে চুঙ্গাপিঠা খেলে সব ক্লান্তি দূর হয়ে যায়।
আমলশীদ গ্রামের কৃষক সাইফুল ইসলাম জানান, ধান কাটা আমাদের কাছে উৎসবের মতো। পরিবার, প্রতিবেশী সবাই মিলে কাজ করি। রাতে চুঙ্গাপিঠা বানাই। পুরো গ্রাম তখন অনাবিল আনন্দে মেতে ওঠে। আটগ্রামের তরুণ কৃষক ছাদিকুর রহমান বলেন, আধুনিক জাতের ধান করেছি বলে ফলন ভালো হয়েছে। কৃষি অফিসের সহযোগিতা ছিল সবসময়। ধান ভালো হওয়ায় চুঙ্গাপিঠার উৎসবটাও এবার ভালো জমেছে।
ধান কাটার ব্যস্ততার পাশাপাশি গ্রামজুড়ে চলছে চুঙ্গাপিঠা বানানোর ধুম। নতুন কাটা ধান ভেঙ্গে চাল তৈরি করা, বাঁশ বা ধানের নলের চোঙ্গা বানানো, চালের গুড়োতে নারকেল ও খেজুরের গুড় মিশিয়ে মণ্ড তৈরি করা-সব মিলিয়ে এটি এক বৈচিত্র্যময় প্রক্রিয়া।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল মোমিন জানান, এ বছর এলাকায় উচ্চফলনশীল ও আধুনিক জাতের ধানের চাষ বেড়েছে এবং ফলনও ভালো হয়েছে। তিনি বলেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকা এবং কৃষকদের সচেতনতা বৃদ্ধির কারণে উৎপাদন ভালো হয়েছে। আমরা মাঠ পর্যায়ে সার, সেচ ও রোগবালাই দমনসহ সব বিষয়ে নিয়মিত পরামর্শ দিয়েছি। ধান কাটার সঙ্গে চুঙ্গাপিঠা নিয়ে যে সাংস্কৃতিক উৎসব হয়, সেটি এই অঞ্চলের গ্রামীণ ঐতিহ্যকে আরও প্রাণবন্ত করে।
মাঠে ধান কাটার শব্দ, ধান মাড়াইর মেশিনের শব্দের তালে কৃষকের গান, শিশুদের হাসি, সন্ধ্যার পর চোঙ্গাপিঠার ধোঁয়া-সবকিছু মিলিয়ে জকিগঞ্জের গ্রামগুলো এখন এক অনন্য উৎসবের রূপ নিয়েছে। দিনের ক্লান্তি ভুলে কৃষকেরা রাতে পিঠা খেতে খেতে গল্প করেন, আগামী দিনের কাজের পরিকল্পনা করেন। ধান কাটার আনন্দ আর চুঙ্গাপিঠার ঘ্রাণ যেন হেমন্তের সোনালি সময়টিকে আরও বেশি বর্ণিল করে তুলেছে।
জকিগঞ্জের প্রবীণ ব্যক্তি কবি কালাম আজাদ বলেন, যান্ত্রিক সভ্যতার আবির্ভাবে এখন হেমন্তের সেই আনন্দ হারিয়ে গেছে। কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষকের শ্রম ও সময়ের অপচয় রোধ করা গেলেও অনেককিছুই হারাতে হয়েছে আমাদেরকে। ঢেঁকিছাটা চাল, গরুর নির্ভেজাল দুধ-এগুলো ছিল আমাদের ঐতিহ্য। এছাড়া অধিক কায়িকশ্রমের কারণে ডায়াবেটিসসহ অনেক রোগবালাই থেকেও আমরা মুক্ত ছিলাম। আমাদের সময়ে রাসায়নিক সারের অস্তিত্ব ছিল না। শুধু জৈবসারের পরিমিত ব্যবহারেই ধানের বাম্পার ফলন হতো। অথচ এখন সম্পূর্ণ বিপরীত দৃশ্য! তব্ওু ভালো যে, জকিগঞ্জের মানুষ আজো চুঙ্গাপিঠার ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছে।





