ট্রেনে কাটা পড়ে মৃত্যু বাড়ছে
প্রকাশিত হয়েছে : ০৩ ডিসেম্বর ২০২৫, ৮:৪৪:৫৩ অপরাহ্ন
প্রতিদিন গড়ে ৩ জন মারা যান

জালালাবাদ রিপোর্ট : অসতর্কতা ও অসচেতনভাবে রেললাইন ব্যবহারের কারণে দেশে ট্রেনে কাটা পড়ে মৃত্যু বাড়ছে। গত এক দশকে ট্রেনে কাটা পড়ে ৯ হাজার ২৫৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে গত ৩ বছরে মৃত্যু বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ১৪৫ জনে, অর্থাৎ এ সময়ে প্রতিদিন গড়ে ট্রেনে কাটা পড়ে ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। রেলওয়ে পুলিশের পরিসংখ্যানে এ তথ্য উঠে এসেছে।
রেলওয়ে পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, অসতর্কভাবে রেললাইনে অবস্থান করে ট্রেনে কাটা পড়ে মৃত্যুর একটি ঘটনার উদাহরণ এটি। রেললাইনে এমন মৃত্যু প্রতিনিয়তই ঘটছে। রেললাইনে কাটা পড়ে মারা যাওয়ার ঘটনায় কাউকে দায়ী করা হয় না।
রেলওয়ে আইন-১৮৯০ অনুযায়ী, অনুমতি ছাড়া রেললাইন ব্যবহার অবৈধ। এ কারণে রেললাইনে মৃত্যু হলে নিহত ব্যক্তিকেই দায়ী করা হয়। রেললাইন সরকারিভাবে সাধারণ চলাচলের জন্য নয় বলে সার্বক্ষণিক ১৪৪ ধারা জারি থাকে। আইন ভঙ্গ করে রেললাইনে প্রবেশে দুর্ঘটনা ঘটলে তা ‘অপমৃত্যু’ হিসেবে বিবেচিত হয়। এর দায়ভার কারও ওপর বর্তায় না।
রেললাইনে ট্রেনে কাটা পড়ে মৃত্যুর পেছনে মোটাদাগে ৪টি কারণের কথা বলছেন রেলওয়ে পুলিশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয় রেলক্রসিং দ্রুত পার হতে গিয়ে এবং রেললাইনের ওপর বসা বা চলাচলের কারণে। তারপর কানে হেডফোন লাগিয়ে রেললাইন পার হওয়া বা হাঁটার সময়। এছাড়া ট্রেনের ছাদ থেকে পড়ে যাওয়া ও রেললাইনকে ব্যবহার করে হত্যা ও আত্মহত্যা।
রেল পুলিশের তথ্য বলছে, শুধু রেলক্রসিং ঝুঁকিপূর্ণভাবে পারাপারের চেষ্টা এবং রেললাইনের ওপর বসা বা চলাচলের কারণে গত ১০ বছরে ট্রেনে কাটা পড়ে মারা গেছেন ৭ হাজার ৯৮ জন, অর্থাৎ মোট মৃত্যুর ৭৭ শতাংশই ঘটেছে এ দুই কারণে। পুলিশ সদর দপ্তরের অপরাধ পরিসংখ্যানের তথ্য বলছে, ২০১৯ থেকে ২০২৫ সালের মে মাস পর্যন্ত গত সাড়ে ছয় বছরে রেলওয়ে থানা এলাকায় হত্যা মামলা হয়েছে ৯২টি।
তথ্য বলছে, গত ২৬ নভেম্বর ২২ ঘণ্টার ব্যবধানে ঢাকা-সিলেট রেলপথের নরসিংদীতে ট্রেনের ধাক্কায় ও কাটা পড়ে ৩ জন নিহত হয়েছেন। বুধবার সকাল পৌনে ৮টায় নরসিংদী শহরের বাসাইল রেলগেট এলাকায় ট্রেনে কাটা পড়ে একজন, বিকেল সাড়ে ৪টায় রায়পুরার আমিরগঞ্জ রেলস্টেশনে ট্রেনের ধাক্কায় একজন এবং এর আগে ২৫ নভেম্বর মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সদর উপজেলার বাদুয়ারচর এলাকায় ট্রেনের ধাক্কায় একজন নিহত হন। নিহত তিনজন হলেন কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর উপজেলার গলাচিপা গ্রামের জোবায়ের হোসেন (১৯), নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার দুলালপুর ইউনিয়নের দরগাবন্ধ গ্রামের বাসিন্দা আবদুল্লাহ আল মামুন (৪৩) এবং রায়পুরা উপজেলার আদিয়াবাদ ইউনিয়নের আদিয়াবাদ গ্রামের বাসিন্দা কাঞ্চন মিয়া (৭০)।
রেলওয়ে পুলিশ জানিয়েছে, বাসাইল রেলগেট এলাকায় ট্রেনে কাটা পড়েন শ্রবণপ্রতিবন্ধী আবদুল্লাহ আল মামুন। রায়পুরা উপজেলার আমিরগঞ্জ রেলস্টেশনে রেললাইন পার হওয়ার সময় একটি মালবাহী ট্রেনের ধাক্কায় কাঞ্চন মিয়া নিহত হন। অন্যদিকে গতকাল সন্ধ্যায় ঢাকাগামী এগারোসিন্দুর এক্সপ্রেস ট্রেনের ধাক্কায় রেললাইনে ছিটকে পড়ে জোবায়ের হোসেন নিহত হন। সদ্য আলিম পাস করা জোবায়ের বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিংয়ের ক্লাস শেষে রেললাইনে ঘুরতে গিয়েছিলেন, অর্থাৎ রেললাইনের ওপর বসা বা চলাচলের কারণে তাদের মৃত্যু ঘটেছে।
রেলওয়ে পুলিশ বলছে, রাজধানীর বনানী থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার রেললাইন সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনাপ্রবণ। এর মধ্যে কুড়িল বিশ্বরোড এলাকায় রেললাইনের একটি বাঁক রয়েছে। এতে এক পাশ থেকে ট্রেন এলে অন্য পাশে দেখা যায় না। ওই বাঁক দিয়ে প্রতিদিন বহু মানুষ যাতায়াত করলেও কোনো পদচারী সেতু নেই। এছাড়া চট্টগ্রাম-ঢাকা, ঢাকা-জয়দেবপুর ও সিলেট-ঢাকা রেলপথে মৃত্যুর ঘটনা বেশি।
রেলওয়ে পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে মোট রেলক্রসিং আছে ৩ হাজার ১১১টি। এর মধ্যে অনুমোদন আছে ১ হাজার ৮৮৬টির। এ হিসাবে ১ হাজার ২২৫টির অনুমোদন নেই, অর্থাৎ দেশের মোট রেলক্রসিংয়ের প্রায় ৪০ শতাংশেরই অনুমোদন নেই। কোনো ধরনের অনুমোদন ছাড়া সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং স্থানীয় সরকার বিভাগ রেললাইনের ওপর দিয়ে সড়ক নির্মাণ করায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
নরসিংদী রেলওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক মো. নাজিম উদ্দীন বলেন, রেললাইন পার হওয়ার সময় তাঁদের আরও সতর্ক থাকা দরকার। রেললাইন দিয়ে চলাচল ও রেললাইনে বসা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। অনেকে রেললাইনে বসে গল্প করেন। কেউ আবার গরম লাগলে রেললাইনে বসে আরাম করেন। এমন সাধারণ কারণে মানুষ মারা যাচ্ছেন, এটা কল্পনা করা যায় ? মানুষ সচেতন না হলে এ ধরনের মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব নয়।
রেলওয়ে পুলিশের প্রধান জিল্লুর রহমান বলেন, রেললাইনে মানুষ মারা যাওয়ার মূল কারণ হচ্ছে অসতর্কতা। মানুষ সচেতন না হলে এ মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব নয়। তিনি বলেন, রেললাইন দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় ট্রেন এলে অনেক সময় শব্দ আসে না। এর মধ্যে কানে হেডফোন বা মুঠোফোন থাকলে হুইসেল বাজালেও শব্দ ঠিকভাবে শোনা যায় না। ট্রেনের চালক সেটি খেয়াল করলেও কিছু করার থাকে না। কারণ, ট্রেন এমন একটা যান, চাইলেই তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করা যায় না।





