ফুট ওভারব্রিজের ভবিষ্যৎ কী?
প্রকাশিত হয়েছে : ১০ ডিসেম্বর ২০২৫, ১:০০:৫৭ অপরাহ্ন
স্টাফ রিপোর্টার: কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে বানানো সিলেট নগরীর ফুট ওভারব্রিজগুলো মূলত অকার্যকর এবং অভিভাবকহীন হয়ে পড়ে আছে। পথচারীদের পারাপারের সুবিধায় সাধারণত এসব ব্রিজ বানানো হয়ে থাকলেও সিলেটের এই ব্রিজগুলো শুরু থেকেই পথচারীদের কোনো কাজে আসেনি। লোকজন ব্রিজ রেখে নিচের রাস্তা দিয়েই মূলত চলাচল করেন। ব্রিজগুলো এখন দৃশ্যমান ব্যবহার হয় দিনে সৌখিন লোকজনের ফটোশুট আর রাতে মাদকসেবীদের আড্ডার স্থলে। ফলে অনেকটা অকার্যকর হয়ে আছে সিলেট নগরীর ফুট ওভারব্রিজগুলো।
অপরিকল্পিত ফুট ওভার ব্রিজ ব্যবহারে একদিকে যেমন অনিহা পথচারীর, অন্যদিকে নিয়ম মানাতে ব্যর্থ সংশ্লিষ্টরাও। ট্রাফিক বিভাগ, সিটি করপোরেশনও নির্বিকার। সিলেটের করিৎকর্মা জেলা প্রশাসক হকার উচ্ছেদসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উদ্যোগ নিয়ে সফল হলেও এগুলোর ব্যাপারে এখনো তার উদ্যোগ চোখে পড়েনি।
সরেজমিন দেখা গেছে, মানুষের চলাচল নেই, ময়লা আবর্জনা আর দুর্গন্ধে বিশ্রী অবস্থা বিরাজ করে ব্রিজের সিঁড়ি ও পটাতনে। অবাঞ্চিত ও মাদকসেবীরা নির্বিঘ্নে বসে অপরাধ কার্যক্রম চালাচ্ছে। নগরীর নাভির মধ্যে থাকা বন্দরবাজার পয়েন্ট, টিলাগড়, শাবিপ্রবি এবং হুমায়ুন রশিদ চত্ত্বর সবগুলো ওভারব্রিজেরই একই চিত্র। এতে বছরের পর বছর এভাবে পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে কোটি কোটি টাকার এই সম্পদ।
নগরবাসীর অনেকেই বলছেন, নগরের সড়কগুলো সরু হওয়ায় রাস্তা পারাপার সহজ, তাই ফুটওভার ব্রিজের কোনো প্রয়োজন নেই। সমীক্ষা ছাড়াই এগুলো নির্মাণ করে জনগণের টাকা অপচয় করা হয়েছে। তারা বলছেন, সিটি কর্পোরেশনের উচিত, যেহেতু এই সেতুগুলো মানুষ ব্যবহার করছে না, তাই প্রয়োজনীয় কোনো স্থানে স্থানান্তর করে পুন:নির্মাণ করা, যেখানে নির্মাণ করা হলে মানুষের কাজে আসবে।
নগরবিদরা বলছেন, সিলেট নগরের সড়কগুলো অপ্রশ্বস্থ। অন্য বড় শহরের মতো এখানে যানবাহনের গতিও কম। তাই সিলেটে ফুটওভার ব্রিজের তেমন প্রয়োজনীয়তা নেই। তবুও পরিকল্পনা করে নির্মাণ করা হলে হয়ত সেতুগুলো কাজে আসত।
তবে সিলেট সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষ বলছে, বিভিন্ন সময়ে জনগণের দাবির প্রেক্ষিতেই ফুটওভার ব্রিজগুলো নির্মিত হয়েছে। শাবিপ্রবি কর্তৃপক্ষের দাবির প্রেক্ষিতে সেখানে তা নির্মাণ করা হয়েছে। টিলাগড় ও হুমায়ুন রশীদ চত্বরেও দাবির প্রেক্ষিতে নির্মাণ করা হয়েছে। আর বন্দরবাজারে সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল মুহিতের ইচ্ছায় নির্মাণ করা হয়েছে। সিটি কর্পোরেশনের স্ব-উদ্যোগে এগুলো নির্মাণ করা হয়নি। জনগণের দাবির প্রেক্ষিতে জনগণের জন্য নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু এখন সেগুলো কেউ ব্যবহার করছেন না।
সিসিক সূত্রে জানা গেছে, সিলেট নগরের বন্দরবাজার, হুমায়ুন রশীদ চত্বর, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় গেটের সামনে ও টিলাগড় পয়েন্টে নির্মিত চারটি ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৯ কোটি ৬০ লাখ ২৮ হাজার ৫৮৯ টাকা।
এর মধ্যে ২০১৬ সালে ১ কোটি ৬৩ লাখ টাকা ব্যয়ে সিলেট নগরের বন্দরবাজার এলাকার কোর্ট পয়েন্টে নির্মাণ করা হয় সিলেটের প্রথম ফুটওভার ব্রিজ। এটি সিলেটের প্রথম ফুটওভার ব্রিজ হওয়ায় প্রথম দিকে ছবি তোলার জন্যই এখানে আসত নগরবাসী। কিন্তু কিছুদিন পরই সেতুটি হয়ে যায় ভাসমান মানুষের বসবাস। এরপর থেকে প্রায় পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে সেতুটি। কোনো পদচারীর পা পড়ে না এই সেতুতে।
পরবর্তীতে ২০২১ সালে ২ কোটি ৪ লাখ ৬২ হাজার ৩শ ৮৮ টাকা ব্যয়ে সিলেটের টিলাগড়ে নির্মাণ করা হয় দ্বিতীয় ফুটওভার ব্রিজ। নির্মাণের পর থেকেই অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে এই সেতুও। সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সেতু দিয়ে কোনো পদচারী পারাপার করছেন না।
নগরের তৃতীয় ফুটওভার ব্রিজ ২০২২ সালে সিলেটের কদমতলীর হুমায়ুন রশীদ চত্বরের পাশে ২ কোটি ৭৫ লাখ ৩১ হাজার ৭৪ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়। সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হুমায়ুন রশীদ চত্বর বেশ ব্যস্ত সড়ক হলেও ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার না করে ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা দিয়ে প্রতিনিয়ত পারাপার হচ্ছেন লোকজন। কাউকেই দেখা যায়নি সেতুটি ব্যবহার করে পারাপার হতে।
২০২৩ সালে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তা-শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে গেটের সামনে ৩ কোটি ১৭ লাখ ৩৫ হাজার ১শ ২৭ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয় চতুর্থ ফুটওভার ব্রিজ। সেটিও অনেকটা অকেজো অবস্থায় রয়েছে। সেই সেতু দিয়ে কোনো শিক্ষার্থী কিংবা পদচারী মানুষকে পারাপার হতে দেখা যায়নি।
সিসিকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, টিলাগড় এলাকায় রয়েছে এমসি কলেজ ও সরকারি কলেজের মতো বড়ো দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। আর আখালিয়ায় শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা ভেবেই সেতুগুলো নির্মাণ করা হয়েছে। সিলেটে আসা দূরপাল্লার সব বাস হুমায়ুন রশীদ চত্বরে থামে। বাসে আসা যাত্রীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করেই সেখানে সেতু নির্মাণ করা হয়।





