ভারতের অনাগ্রহে স্রোতস্বিনী ‘রহিমপুরী খাল’ এখন সমতলভূমি!
প্রকাশিত হয়েছে : ১১ ডিসেম্বর ২০২৫, ৬:৫৮:৫১ অপরাহ্ন

এখলাছুর রহমান, জকিগঞ্জ: জকিগঞ্জ উপজেলার সুলতানপুর ইউনিয়নের শরীফগঞ্জ বাজারের পাশে অবস্থিত রহিমপুরী খাল একসময়ের স্রোতস্বিনী জলধারা হিসেবে পরিচিত ছিল। কৃষিজমিতে সেচ, নৌপরিবহন, পরিবেশগত ভারসাম্য—সব কিছুতেই খালটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। কিন্তু বর্তমানে নাব্যতা হারিয়ে খালটি মৃতপ্রায় অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। খালের বুকজুড়ে পলি জমে পানি প্রবাহ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে, যা স্থানীয় কৃষি উৎপাদনেও মারাত্মক প্রভাব পড়ছে।
যতদূর জানা যায়, রহিমপুরী খালটি জকিগঞ্জ উপজেলার শরীফগঞ্জস্থ কুশিয়ারা নদী থেকে উৎপন্ন হয়ে প্রায় ৫৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বিয়ানীবাজার উপজেলার করতি খালের সাথে মিলিত হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, এই সংকটের সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে আছে জকিগঞ্জের বহুল আলোচিত রহিমপুর পাম্প হাউস। প্রায় ১৫ বছর আগে নির্মিত হলেও কুশিয়ারা নদী থেকে পানি উঠাতে না পারায় তা এখনো চালু হয়নি। ‘আপার সুরমা-কুশিয়ারা প্রকল্পের’ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই স্থাপনাটি চালু করতে গিয়ে নানা জটিলতার মধ্যে ভারতীয় বাধা দীর্ঘসূত্রতা সৃষ্টি করেছে। শুরুতে বাংলাদেশ যখন কুশিয়ারা থেকে পানি উত্তোলনের প্রস্তুতি নেয়, তখন ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) আপত্তি তোলে। তারা দাবি করে, সীমান্তের কাছাকাছি বড় মাপের পানি উত্তোলন নদীর পানিপ্রবাহে প্রভাব ফেলতে পারে। এ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন টানাপোড়েন চলে। যদিও ২০২২ সালে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে বাংলাদেশকে ১৫৩ কিউসেক পানি উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া হয়, তবুও বাস্তবে ভারতের পক্ষ থেকে কার্যকর সহযোগিতা না পাওয়ায় এখনো পানি উত্তোলন শুরু করা যায়নি। এদিকে, ভারতের তীরবর্তী এলাকায় কমপক্ষে ৪২টি পাম্প বসিয়ে ভারত নিজে পানি তুললেও বাংলাদেশ তাদের বৈধভাবে বরাদ্দকৃত পানি তুলতে পারছে না—যা দুই দেশের অমিল ও বাস্তব সহযোগিতার ঘাটতিকে আরও স্পষ্ট করে।
জকিগঞ্জের আইনজীবী কাওছার রশীদ বাহার এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, রহিমপুরী খাল শুধু পানিপথ নয়-এটি আমাদের কৃষির প্রাণভোমরা। পাম্প হাউস চালু হলে খালের প্রাণ ফিরে আসত। কিন্তু ভারতীয় আপত্তির কারণে বছরের পর বছর দেরি হচ্ছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা নিজেদের সম্পদও ব্যবহার করতে পারছি না।
এলাকার বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল জলিল স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, একসময় রহিমপুরী খাল ছিল জনজীবনের কেন্দ্রবিন্দু। খালের তীব্র স্রোতে মাছ পাওয়া যেত, সেচ মিলত, বাচ্চারা খেলত। এখন খাল দেখে মন খারাপ হয়। পাম্প হাউস চালু না হওয়ায় খাল মরতে বসেছে-এটা আমাদের জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক। ভারতীয় বাধা না থাকলে বহু আগেই খালটি বাঁচানো যেতো।
এ বিষয়ে সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রশাসনিক কর্মকর্তা (এসও) মাহফুজ হোসেন জানান, ভারতের সঙ্গে পানি উত্তোলন বিষয়ে এখন নতুন করে সমন্বয় চলছে। কিছু কারিগরি আপত্তি ভারত এখনও তুলছে, তবে বিষয়টি সমাধানে সরকার কাজ করছে। আমরা আশা করছি খুব শিগগিরই পাম্প হাউস চালুর কাজ শুরু হবে। তিনি আরও বলেন যে, ‘আপাতত রহিমপুরী খাল খননের বিষয়টি পানি উন্নয়ন বোর্ডের পরিকল্পনাধীন আছে। প্রকল্পটি কার্যকর হলে সিলেটের পাঁচ উপজেলার কৃষিতে ব্যাপক অগ্রগতি আসবে।
স্থানীয়দের মতে, পাম্প হাউস চালু না হওয়ায় রহিমপুরী খাল শুকিয়ে যাচ্ছে, সেচব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে এবং কৃষকদের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। খাল পুনরুজ্জীবনে পাম্প হাউসই একমাত্র আশা, আর তাই সরকারের দ্রুত উদ্যোগ এখন সময়ের দাবী।
রহিমপুরী খাল ও রহিমপুর পাম্প হাউস-এই দুইটির ভবিষ্যৎ একসূত্রে গাঁথা। পাম্প হাউস চালু হলে খাল আবার প্রাণ ফিরে পাবে, আর খাল বাঁচলে জকিগঞ্জসহ সিলেট অঞ্চলের কৃষিও দাঁড়াবে শক্ত ভিত্তিতে। জকিগঞ্জবাসীর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে কি না—এখন তা নির্ভর করছে দ্রুত সিদ্ধান্ত ও কার্যকর কূটনৈতিক সমাধানের ওপর।





