ভয়ংকর মাদক ‘এডিএমবি’র ছোবলে দেশ
প্রকাশিত হয়েছে : ১২ ডিসেম্বর ২০২৫, ৮:৫৫:২৮ অপরাহ্ন

জালালাবাদ ডেস্ক: প্রাণশক্তি ধ্বংস করা মাদক ইয়াবা, আইস আর এলএসডির পর দেশে প্রবেশ করেছে ভয়ংকর নতুন মাদক এমডিএমবি। এর বৈশিষ্ট হলো খুব দ্রুত এটি স্নায়ুতন্ত্রে প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। এমডিএমডির বিষক্রিয়ায় স্নায়ুতন্ত্রে তৈরি হয় স্থায়ী ক্ষত, যা মানুষের বোধ-বিবেচনা লোপ করে। এটি নিয়মিত ব্যবহারের শেষ পরিণতি ধুকে ধুকে মৃত্যু।গোপন সংবাদের ভিত্তিতে এমডিএমবির একটি বড় চালান জব্দ করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। মালয়েশিয়া থেকে দেশে এই মাদক আনার সঙ্গে জড়িত চক্রের চার সদস্য গ্রেপ্তার হয়েছেন।
শুক্রবার সকালে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ।
তিনি জানান, ই-সিগারেটের লিকুইড হিসেবে মাদক এমডিএমবি প্রবেশ করছে দেশে। তরুণদের মধ্যে ই-সিগারেট ও ভেপের ব্যবহার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। এসব ডিভাইসে সাধারণত নিকোটিন বা তামাকজাতীয় পদার্থ ব্যবহৃত হয়। সম্প্রতি তাতে নতুন ধরনের সাইকোঅ্যাকটিভ পদার্থ (এনপিএস) এবং ওপিয়য়েডসসহ বিপজ্জনক মাদক, যেমন এমডিএমবি মিশিয়ে ব্যবহার করার ঘটনা বেড়েছে। খ’ শ্রেণিভুক্ত মাদক এমডিএমবি। যা সিনথেটিক ড্রাগ হিসেবে বিবেচিত। অভিনব কায়দায় ক্রেতার কাছে পৌঁছে দেয়া হতো ই-সিগারেটের লিকুইড বোতলের মাধ্যমে। এমডিএমবি দ্রুত নেশা ধরায়, আক্রামণাত্মক আচরণ থেকে হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিকভাবে হওয়ার মতো স্বাস্থ্য ঝুঁকিও তৈরি করে। মালয়েশিয়া থেকে দেশের বাজারে প্রবেশ করছে ভয়াবহ এই মাদক। এই মাদক শয়তানের নিঃশ্বাসের মতোই ভয়ংকর।
ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, মূলত হোয়াটসঅ্যাপ ও ফেইসবুকের সিক্রেট গ্রুপের মাধ্যমে বাজারে এলিট শ্রেণির কাছে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে এই মাদক। এসব তথ্যের ভিত্তিতে অভিযানে নামে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর। চার মাদককারবারীসহ জব্দ করা হয় এমডিএমবির বিশাল এক চালান।
গ্রেপ্তাররা হলেন— বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী খন্দকার তৌকিরুল কবির তামিম (২৬), মেহেদী হাসান রাকিব (২৬), বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সেলস এবং মার্কেটিং কর্মকর্তা মাসুম মাসফিকুর রহমান ওরফে সাহস (২৭) এবং ভারতে পড়াশোনা করে সম্প্রতি বাংলাদেশে ব্যবসা শুরু করা আশরাফুল ইসলাম (২৫)।
গত ১০ ডিসেম্বর ঢাকার মিরপুর পল্লবীতে ২০ মিলি এমডিএমবিসহ তামিমকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ ও ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে মেহেদী হাসান রাকিবের অবস্থান শনাক্ত করে মিরপুর থেকে ১০ মিলি এমডিএমবিসহ তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের স্বীকারোক্তি ও প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণে দেশজুড়ে এমডিএমবি সরবরাহকারী নেটওয়ার্কের হদিস পাওয়া যায়। হোতাদের মধ্যে আশরাফ ও সাহসকে শনাক্ত করা হয়েছে। পরে তাদের বাড়ি থেকে ৩১০ মিলিলিটার এমডিএমবি-পিনাকা, সিবিডি মিশ্রিত গাঁজার চকলেট, পাঁচটি ভেপ ডিভাইস, ই-লিকুইড এবং বিক্রয়ের জন্য প্রস্তুত খালি ক্যানিস্টার উদ্ধার করা হয়।
মিরপুরের আশরাফ দীর্ঘদিন ধরে সমাজের উচ্চবিত্ত শ্রেণির মধ্যে এই মাদক সরবরাহ করতেন। তিনি মূলত ভেপ ব্যবহারকারীদের লক্ষ্য করে সহযোগী সাহসের সঙ্গে এমডিএমবি মার্কেট গড়ার চেষ্টা করছিলেন। জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, মালয়েশিয়ায় যাতায়াত করে সেখান থেকে মাদক সংগ্রহ করে দেশে নিয়ে আসতেন।
এমডিএমবি হলো একটি ভয়ংকর তরল সিনথেটিক মাদক যা মাত্র কয়েক ফোঁটা স্নায়ুতন্ত্রকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তরুণদের মধ্যে জনপ্রিয় ভেপ ডিভাইসকে আড়ালে ব্যবহার করে এই মাদক দ্রুত নেশার আসক্তি সৃষ্টি করে, যা হ্যালুসিনেশন, আক্রমণাত্মক আচরণ এবং হৃৎস্পন্দনের অস্বাভাবিকতা ঘটায়। সাধারণ ফ্লেভারড লিকুইডের মতো দেখতে হওয়ায় এটি শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব, ফলে ব্যবহারকারীরা বুঝতেই পারে না তারা প্রাণঘাতী ‘নেক্সট জেনারেশন সিনথেটিক ড্রাগ’ সেবন করছেন। প্রচলিত নিকোটিনযুক্ত লিকুইডের সঙ্গে মাত্র অল্প পরিমাণ এমডিএমবি মিশিয়ে এটি ব্যবহার করা হয়।
চক্রটি অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে ফেইসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপকে ‘অদৃশ্য বাজার’ হিসেবে ব্যবহার করত। ফেসবুকের ক্লোজড গ্রুপ, রিভিউ পেজ ও ভুয়া অ্যাকাউন্টে সংকেতপূর্ণ পোস্ট দিয়ে মাদকের কারবার চালাত। আগ্রহী ক্রেতারা ইনবক্সে মেসেজ করলে অ্যান্ড-টু- অ্যান্ড এনক্রিপ্টেড হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাটে দাম নির্ধারণ ও সরবরাহ নিশ্চিত হতো। লোকেশন শেয়ার, লাইভ ট্র্যাকিং ও বিশেষ ইমোজি ব্যবহার করে লেনদেন সম্পন্ন হতো, যা দেখে সাধারণ ব্যবহারকারী বুঝতেনই না এটি মাদক।
গ্রেপ্তার আসামির জিজ্ঞাসাবাদে আরও অনেক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাম পাওয়া গেছে, যাদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। গ্রেপ্তারদের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ অনুসারে মামলা দায়ের করা হয়েছে।





