ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে জমি অধিগ্রহণে দুর্নীতি : তদন্তের নির্দেশ হাইকোর্টের
প্রকাশিত হয়েছে : ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫, ৯:০০:০৫ অপরাহ্ন

জালালাবাদ রিপোর্ট : ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। বৃহস্পতিবার (১৮ ডিসেম্বর) বিচারপতি শিকদার মাহমুদ রাজী ও বিচারপতি রাজিউদ্দীন আহমেদের সমন্বয়ে গঠিত দ্বৈত বেঞ্চ রিট শুনানি শেষে এই আদেশ দেন।
একই সঙ্গে নরসিংদী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এলএ (ভূমি অধিগ্রহণ) শাখায় দীর্ঘদিন ধরে চলমান লাগামহীন দুর্নীতি তদন্তে সংশ্লিষ্টদের নিষ্ক্রিয়তা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না-তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন আদালত। এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) ৯০ দিনের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী শিশির মনির। তিনি জানান, নরসিংদীর বাসিন্দা মাহাবুবুর রহমান গত ১৯ অক্টোবর একটি দৈনিক প্রকাশিত ‘জমি অধিগ্রহণের ৮ কোটি টাকা পেতে ঘুষ ১ কোটি, ডিসি অফিসের ঘুষের ফাঁদে মারা যান সাহাবুদ্দিন’ শীর্ষক প্রতিবেদন সংযুক্ত করে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন। বৃহস্পতিবার সেই রিটের ওপর শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।
শুনানি শেষে শিশির মনির বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের উন্নয়ন কাজ চললেও টানা চার বছরেও জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন না হওয়ায় প্রকল্পটি কার্যত ঝুলে আছে। তিনি জমি অধিগ্রহণে দুর্নীতি নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করায় ঐ পত্রিকার সম্পাদক ও সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদকদের ধন্যবাদ জানান।
তিনি বলেন, এধরনের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হয়। আমরা চাই নতুন বাংলাদেশ হোক দুর্নীতিমুক্ত। দেশকে সবার জন্য বাসযোগ্য করতে হলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
রিটকারী মাহবুবুর রহমান বলেন, ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণে দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানে ভূমি মন্ত্রণালয় তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করলেও ওই কমিটির নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
তার দাবি, কমিটির প্রধান হিসেবে যাকে করা হয়েছে, তার বিরুদ্ধেই একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। ফলে এই কমিটির মাধ্যমে প্রকৃত তদন্তের আলোর মুখ দেখার সম্ভাবনা কম।তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, ঢাকার অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) মো. আফজাল হোসেনকে কমিটির আহ্বায়ক, ভূমি মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (অধিগ্রহণ-১) মুহাম্মদ আব্দুল লতিফকে সদস্যসচিব এবং একই মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব মো. সাইফুল ইসলামকে সদস্য করা হয়েছে। কমিটিকে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে সরেজমিন তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে বলা হলেও ইতোমধ্যে তারা দুই দফা সময় নিয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে সংশোধিত ডিপিপি অনুমোদনের পর ঢাকা-সিলেট অংশে ৭ জেলায় মোট ৮ একর ৩০ শতক জমি অধিগ্রহণের তালিকা চূড়ান্ত করা হয়। ৬৬টি এলএ কেসের মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র ১১টির দখল হস্তান্তর সম্পন্ন হয়েছে। চার বছরে প্রকল্পের অগ্রগতি দাঁড়িয়েছে মাত্র ১৫ শতাংশে।
নারায়ণগঞ্জে ২০২১ সালের অক্টোবর-নভেম্বরে দাখিল করা ৪টি এলএ কেসের মধ্যে ২টির দখল হস্তান্তর হয়েছে। নরসিংদীতে ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২২ সালের জুলাই পর্যন্ত পাঠানো ৯টি প্রস্তাবের মধ্যে ৩টি কেসের দখল হস্তান্তর হয়েছে, বাকি ৫টি ঝুলে আছে। কিশোরগঞ্জে ২০২২ সালের জানুয়ারিতে দাখিল করা একটি প্রস্তাবে এখনো কোনো অগ্রগতি নেই।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তিনটি প্রস্তাবের মধ্যে দুটি, মৌলভীবাজারে দুটি প্রস্তাবের দুটিই হস্তান্তর হয়েছে। হবিগঞ্জে ৩০টি এলএ প্রস্তাবের মধ্যে মাত্র দুটি কেসের দখল হস্তান্তর হয়েছে। আর সিলেটে ১৭টি এলএ প্রস্তাব দাখিল হলেও এখন পর্যন্ত কোনো জমির দখল হস্তান্তর হয়নি; এমনকি কোনো প্রাক্কলনও পাওয়া যায়নি।
এ অবস্থায় হাইকোর্টের নির্দেশে দুদকের তদন্তকে প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি ফেরানোর পাশাপাশি জমি অধিগ্রহণে দুর্নীতি-অনিয়ম উন্মোচনে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। বৃহস্পতিবার (১৮ ডিসেম্বর) সন্ধ্যায় দৈনিক জালালাবাদকে এর সত্যতা নিশ্চিত করে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী শিশির মনির বলেন, মাননীয় আদালত রিটটি আমলে নিয়ে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) ৯০ দিনের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে শুধু ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্পই নয়, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতি বন্ধ হবে।





