সরকারি দপ্তরে ঘুষ-দুর্নীতির শিকার এক-তৃতীয়াংশ সেবাগ্রহীতা
প্রকাশিত হয়েছে : ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫, ৯:২২:৩৮ অপরাহ্ন
নোয়াখালীতে সর্বোচ্চ ৫৭.১৭, সিলেটে ১৫.৬১ শতাংশ
জালালাবাদ রিপোর্ট : ২০২৪ সালে সরকারি সেবা নিতে দেশের এক-তৃতীয়াংশ সেবাগ্রহীতা ঘুষ-দুর্নীতির শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। বিবিএসের ২০২৫ সালের সিটিজেন পারসেপশন সার্ভেতে এ তথ্য উঠে এসেছে। সার্ভেতে দেখা যায়, ঘুষ দেওয়ার হার সর্বোচ্চ নোয়াখালীতে ৫৭.১৭ শতাংশ। আর সিলেটে ঘুষ দেওয়ার হার ১৫.৬১ শতাংশ।
এতে জানা যায়, দেশে সরকারি সেবাগ্রহণের ক্ষেত্রে ঘুষ এখনও একটি প্রধান উদ্বেগের বিষয়। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে পরিচালিত এই জরিপে ৬৪ জেলার ৪৫ হাজার ৮৮৮টি খানার ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী ৮৪ হাজার ৮০৭ জন অংশ নেন।
জরিপে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, ন্যায়বিচারের সুযোগ, দুর্নীতি এবং সরকারি পরিষেবার মান সম্পর্কিত নাগরিকদের অভিজ্ঞতা এবং ধারণা মূল্যায়ন করে এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ১৬-এর অগ্রগতি পর্যবেক্ষণেও অবদান রাখে।
জরিপ অনুসারে, প্রায় ৩১.৬৭% নাগরিককে গত ১২ মাসে সরকারি পরিষেবা গ্রহণের সময় ঘুষ দিতে হয়েছে। নারীদের তুলনায় পুরুষরা বেশি বার ঘুষের সম্মুখীন হয়েছেন। জরিপে অংশ নেওয়া ২২.৭১% নারী ঘুষের অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন, অন্যদিকে ৩৮.৬২% পুরুষ এই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। জরিপের তথ্যানুসারে, সবচেয়ে বেশি ঘুষ-দুর্নীতি হয় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) কার্যালয়ে।
জরিপে অংশগ্রহণকারীরা জানিয়েছেন, গত এক বছরে বিআরটিএতে সেবা নিতে যাওয়া নাগরিকদের ৬৩ দশমিক ২৯ শতাংশ ঘুষ-দুর্নীতির শিকার হন। এরপর রয়েছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ৫৭.৯৬% এবং পাসপোর্ট অফিসে ৫৭.৪৫%।জরিপে আরও দেখা গেছে, জনসংখ্যার একটি বড় অংশ এখনও সরকারি পরিষেবার উপর নির্ভরশীল।গত বছর জরিপে অংশ নেওয়া ৪৭.১২% নাগরিক সরকারি স্বাস্থ্যসেবা পেয়েছেন এবং ৪০.৯৩% জানিয়েছেন যে তাদের কমপক্ষে একটি শিশু সরকারি স্কুলে ভর্তি হয়েছে।
এছাড়াও, ৭৩.৭৭% নাগরিক জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্ম নিবন্ধন বা অনুরূপ সেবাসহ অন্যান্য সরকারি পরিষেবা নেওয়ার চেষ্টা করেছেন।ঘুষ নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগ থাকা সত্ত্বেও, সরকারি সেবাগ্রহীতাদের মধ্যে সন্তুষ্টির মাত্রা তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল।সেবাগ্রহীতাদের মধ্যে মধ্যে ৭২.৬৯% জন সরকারি স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন এবং ৮১.৫৬% প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে এবং ৭৮.২০% মাধ্যমিক শিক্ষা নিয়ে সন্তুষ্ট ছিল । তবে অন্যান্য সরকারি পরিষেবার প্রতি সন্তুষ্টি তুলনামূলকভাবে কম ৬৬.৯১% ছিল।
জরিপে দেখা যায়, নোয়াখালীতে ঘুষ দেওয়ার হার সর্বোচ্চ ৫৭.১৭ শতাংশ, এরপরই রয়েছে কুমিল্লায় ৫৩.৪৭ শতাংশ, ফরিদপুরে ৫১.৭০ শতাংশ, ভোলা ৪৯.০১ শতাংশ এবং সিরাজগঞ্জে ৪৮.৩৭ শতাংশ। এসব জেলায় সরকারি সেবা পেতে যোগাযোগকারীদের প্রায় অর্ধেক বা তার বেশি নাগরিক ঘুষ দেওয়ার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন।
এসব জেলায় সরকারি সেবা পেতে যোগাযোগকারীদের অর্ধেকেরও বেশি কোনো না কোনোভাবে ঘুষের মুখোমুখি হয়েছেন। বিশেষ করে ভূমি, পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন সংশ্লিষ্ট সেবায় ঘুষের অভিযোগ বেশি এসেছে। অন্যদিকে, কিছু জেলায় ঘুষের প্রবণতা তুলনামূলকভাবে অনেক কম।
জরিপ অনুযায়ী, চাপাইনওয়াবগঞ্জে ঘুষ দেওয়ার হার মাত্র ১০.৪৯ শতাংশ, মাগুরায় ১৩.৯৮ শতাংশ, লালমনিরহাটে ১৪.৫০ শতাংশ, গাজীপুরে ১৫.২৪ শতাংশ এবং সিলেটে ১৫.৬১ শতাংশ।
শীর্ষ ও তলানির জেলার মধ্যে পার্থক্য প্রায় ৪৭ শতাংশ পয়েন্ট, যা জেলা পর্যায়ে দুর্নীতির মাত্রায় গভীর বৈষম্য তুলে ধরে এবং লক্ষ্যভিত্তিক সংস্কার ও নজরদারির প্রয়োজনীয়তার কথা জোরালোভাবে নির্দেশ করে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, জেলাভিত্তিক এই ব্যবধান প্রশাসনিক সক্ষমতা, সেবার ডিজিটালাইজেশন, স্থানীয় তদারকি এবং নাগরিক সচেতনতার তারতম্যের প্রতিফলন।তারা বলছেন, যেসব জেলায় ঘুষের হার বেশি, সেখানে লক্ষ্যভিত্তিক সংস্কার, সেবাদান প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং জেলা প্রশাসনের জবাবদিহি জোরদার করা জরুরি। জেলা পর্যায়ে এই তথ্য ব্যবহার করে নীতিনির্ধারকরা আলাদা আলাদা অ্যাকশন প্ল্যান নিলে ঘুষ ও দুর্নীতি কমানোর বাস্তব সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।





