মানুষ ফের আর্থিক প্রতিষ্ঠানমুখী হওয়ায় বাড়ছে আমানত
প্রকাশিত হয়েছে : ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫, ৭:৫২:২৩ অপরাহ্ন

জালালাবাদ ডেস্ক: দীর্ঘদিনের আস্থাহীনতা কাটিয়ে ফের নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) খাতে ঝুঁকছে মানুষ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) এসব প্রতিষ্ঠানে নতুন হিসাব খুলেছে ৬০ হাজারের অধিক ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারী। একই সময়ে আমানত বেড়েছে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা। মূলত উচ্চ সুদের হার, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি ও সংস্কার উদ্যোগের প্রভাবে আমানতকারীদের আগ্রহ বাড়ছে এই খাতে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমানত বৃদ্ধির এই ধারা ইতিবাচক হলেও এখনও পুরোপুরি স্বস্তির জায়গায় পৌঁছায়নি এনবিএফআইগুলো। কারণ, অনেক প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের চাপ এখনও বেশি। তাই আমানত বাড়লেও তা টেকসই করতে হলে ঋণ আদায়ে শৃঙ্খলা ফেরানো জরুরি। সেই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং আমানতকারীদের স্বার্থ অগ্রাধিকার দিতে হবে। নইলে নতুন করে আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়াতে নিয়মিত নীতিগত সংস্কার চলছে। ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগে সীমা নির্ধারণ, পরিচালনা পর্ষদের জবাবদিহি এবং আমানতকারীদের সুরক্ষায় নীতিমালা কঠোর করা হয়েছে। এতে বাজারে ইতিবাচক বার্তা গেছে, যার প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরেই দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এক ধরনের সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পিপলস লিজিংসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ও কর্মকর্তাদের অনিয়ম, জালিয়াতি ও যোগসাজশে নামে-বেনামে ঋণ বের করে নেওয়ায় এ সংকট তৈরি হয়। এ ছাড়া রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকে মূল্যস্ফীতি চড়তে থাকায় ব্যক্তি আমানতকারীরা হিসাব গুটিয়ে ফেলছিলেন। তবে অন্তর্বর্তী সরকার আসার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর নজরদারি, নিয়মিত পরিদর্শন এবং ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো অবসায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় পরিস্থিতি কিছুটা উন্নত হয়েছে। ফলে ধীরে ধীরে ফিরছে আস্থা। এ ছাড়া আর্থিক প্রতিষ্ঠানে টাকা রাখলে অপেক্ষাকৃত বেশি সুদ পাওয়া যায়। সুদহার বাজারভিত্তিক করার পর এ খাতে সুদের হার আরও বেড়েছে। ফলে মধ্যবিত্ত ও অবসরপ্রাপ্ত অনেক মানুষ নিয়মিত আয়ের নিশ্চয়তা পেতে এই খাতের দিকে ঝুঁকছেন।
বাড়ছে আমানতকারী ও আমানত : অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে এ খাতে ধারাবাহিক আমানত হিসাব বাড়ছে। তবে ওঠানামা করছে আমানতের পরিমাণ। যদিও সর্বশেষ ছয় মাসে টানা বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন দেখা যায়, ২০২২ সালের অক্টোবর থেকে গত বছরের জুন পর্যন্ত এ খাতে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক মিলে আমানতকারী হিসাব কমেছিল প্রায় ১ লাখ ৬৫ হাজার ৬৬৮ জন। অর্থাৎ, এ খাতে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে আমানতকারীর সংখ্যা ৫ লাখ ৭০ হাজার ১৯৪ জন, যা কমতে কমতে গত বছরের জুনে দাঁড়ায় ৩ লাখ ৮৫ হাজার ৮৯১ জনে। এরপর থেকে টানা বাড়ছে আমানতকারী এবং চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে তা দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৪০ হাজার ৮২৫ জনে। এর মধ্যে চলতি বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর— তিন মাসেই বেড়েছে প্রায় ৬০ হাজার ৬৬২ জন। আর গত এক বছরের ব্যবধানে বেড়েছে ১ লাখ ৫৩ হাজার ২৩৭ জন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতে আমানতের পরিমাণ ছিল ৪৯ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা। এটি গত সেপ্টেম্বরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫০ হাজার ৭২২ কোটি টাকা। ফলে ছয় মাসের ব্যবধানে এ খাতে আমানত বেড়েছে প্রায় ১ হাজার ২৩৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর এই তিন মাসেই বেড়েছে প্রায় ৯৪৯ কোটি টাকা।
প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট আমানতের বেশির ভাগই ঢাকা বিভাগে। এর পরিমাণ প্রায় ৯২ দশমিক ৫৩ শতাংশ। এরপর চট্টগ্রাম বিভাগে ৪ দশমিক ৯৭ শতাংশ, রাজশাহীতে শূন্য দশমিক ৯২ শতাংশ, খুলনায় শূন্য দশমিক ৮৫ শতাংশ, সিলেটে শূন্য দশমিক ৪৯ শতাংশ, ময়মনসিংহে শূন্য দশমিক ২০ শতাংশ, রংপুরে শূন্য দশমিক ২০ শতাংশ এবং বরিশালে শূন্য দশমিক ১৬ শতাংশ রয়েছে।
সামান্য বেড়েছে ঋণ বিতরণ : এনবিএফআই খাতের একটি বড় শক্তি হলো ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন। ব্যাংক থেকে সহজে ঋণ না পাওয়া অনেক এসএমই উদ্যোক্তা এই প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল। সাম্প্রতিক সময়ে শিল্প ও ব্যবসায় কার্যক্রম কিছুটা চাঙ্গা হওয়ায় ঋণের চাহিদাও বেড়েছে। তবে সেই চাহিদা মোতাবেক ঋণ বিতরণ বাড়ছে না। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত জুন পর্যন্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণ বিতরণের পরিমাণ ছিল ৭৭ হাজার ১৪৫ কোটি টাকা, গত সেপ্টেম্বরে যা বেড়ে হয়েছে ৭৭ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকা। তিন মাসের ব্যবধানে এ খাতে ঋণ বেড়েছে ৫৮৯ কোটি টাকা।
খেলাপি ঋণও ঊর্ধ্বমুখী : চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন— এই ছয় মাসে আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা। গত জুন শেষে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর খেলাপি ঋণ বেড়ে হয় ২৭ হাজার ৫৪১ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ৩৫ দশমিক ৭২ শতাংশ। গত ডিসেম্বর শেষে এ খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২৫ হাজার ৭৯ কোটি টাকা বা ৩৩ দশমিক ২৫ শতাংশ। এদিকে উচ্চ খেলাপি ঋণ ও ভয়াবহ তারল্য সংকটে পড়া ৯টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে অবসায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এরই মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের এসব আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো— এফএএস ফিন্যান্স, বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফিন্যান্স কোম্পানি, প্রিমিয়ার লিজিং, ফারইস্ট ফিন্যান্স, জিএসপি ফিন্যান্স, প্রাইম ফিন্যান্স, আভিভা ফিন্যান্স, পিপলস লিজিং ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিং। আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় এগুলোকে বন্ধ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।





