তারেক রহমানের স্মরণীয় প্রত্যাবর্তন, নিরাপদ বাংলাদেশের বার্তা
প্রকাশিত হয়েছে : ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫, ৯:২০:৫৮ অপরাহ্ন
ভালোবাসায় বরণ লাখো নেতা-কর্মীর, হাসপাতালে দেখা করলেন মায়ের সাথে

জালালাবাদ রিপোর্ট : বৃহস্পতিবার সকাল সোয়া ১০টা। হঠাৎ ফেসবুকে তারেক রহমানের স্ট্যাটাস। ‘অবশেষে সিলেটে, বাংলাদেশের মাটিতে!’ হ্যা অবশেষে দীর্ঘ ১৭ বছরের অপেক্ষার অবসান। অগণিত নেতা-কর্মীর রুদ্ধশ্বাস প্রতীক্ষা শেষে লন্ডন থেকে ফিরলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। শুধু ফিরলেন-ই না। তাঁর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে স্মরণীয় করে রাখলেন লাখো নেতা-কর্মী। উষ্ণ ভালোবাসায় বরণ করলেন তাদের প্রিয় নেতাকে।
তারেক রহমানের সঙ্গে এসেছেন স্ত্রী জুবাইদা রহমান ও মেয়ে জাইমা রহমান। বিএনপির এ কান্ডারির প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে দলের সর্বত্রই এখন বইছে আনন্দের জোয়ার। উজ্জীবিত সব নেতাকর্মী ও সমর্থক। তৃণমূল থেকে কেন্দ্র- সব পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে বিরাজ করছে প্রাণচাঞ্চল্য।
বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা ৫৬ মিনিটে তারেক রহমানকে বহনকারী বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইটটি সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছে। তবে তিনি সিলেটে নামেন নি বিমান থেকে। বেলা ১১টা ৫০ মিনিটে ঢাকায় অবতরণ করে।
বিমানবন্দরে তারেক রহমানকে স্বাগত জানান বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, মির্জা আব্বাস, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী প্রমুখ। পরে বিমানবন্দরেই ফুলের মালা দিয়ে বরণ করেন শাশুড়ি।
দুপুর ১২টা ৩৫ মিনিটে ভিআইপি গেট দিয়ে বের হন তিনি। বাসের সামনে থেকে তারেক রহমান নেতা কর্মীদের উদ্দেশে হাত নাড়েন। তাঁদের সালাম দেন। এর আগে বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে এসে লাগোয়া বাগানে খালি পায়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকেন তারেক রহমান। এ সময় তিনি একমুঠো মাটি হাতে তুলে নেন।
এরপর বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে রাজধানীর পূর্বাচলে ৩০০ ফুট এলাকায় গণসংবর্ধনাস্থলের দিকে রওনা হন তারেক রহমান। তাঁর জন্য আগে থেকেই লাল-সবুজ রঙের বুলেটপ্রুফ একটি বাস সাজিয়ে রাখা হয়েছিল। সেই বাসে করে তিনি পূর্বাচলে যাত্রা করেন। ভিডিওতে দেখা যায়, তারেক রহমান বাসের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি রাস্তার দু-পাশে হাজার হাজার জনতা ও নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে হাত নাড়ছেন। বিকেল ৩টা ৫০ মিনিটে রাজধানীর ৩০০ ফিট সড়কের সমাবেশস্থলে পৌঁছান তারেক রহমান। তাঁর আগে এলাকা ও আশপাশ এলাকা জনস্রোতে পরিণত হয়।
লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতিতে গণসংবর্ধনা মঞ্চে বক্তব্য দিতে দাঁড়িয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রথমেই বললেন, প্রিয় বাংলাদেশ। তিনি বলেন, সবাই মিলে একটি নিরাপদ দেশ গড়ার সময় এসেছে।
বক্তব্যে তারেক রহমান বলেন, উপস্থিত প্রিয় মুরুব্বিবর্গ, জাতীয় নেতৃবৃন্দ, প্রিয় ভাই ও বোনেরা এবং মিডিয়ার মাধ্যমে সমগ্র বাংলাদেশ থেকে যাঁরা দেখছেন এই অনুষ্ঠান, প্রিয় ভাই-বোনেরা, প্রিয় মা-বোনেরা, আসসালামু আলাইকুম। প্রিয় ভাই-বোনেরা প্রথমেই আমি রাব্বুল আলামিনের দরবারে হাজারো লক্ষ কোটি শুকরিয়া জানাতে চাই। রাব্বুল আলামিনের অশেষ রহমতে আমি আমার প্রিয় মাতৃভূমিতে ফিরে আসতে পেরেছি আপনাদের দোয়ায়, আপনাদের মাঝে।
সবাই মিলে দেশ গড়ার সময় এসেছে উল্লেখ করে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, এই দেশে যেমন পাহাড়ের মানুষ আছে, এই দেশে একইভাবে সমতলের মানুষ আছে, এই দেশে মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান-হিন্দুসহ বিভিন্ন ধর্মের মানুষ বসবাস করে। আমরা চাই সকলে মিলে এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলব, আমরা যেই বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছি, একজন মা দেখেন, অর্থাৎ একটি নিরাপদ বাংলাদেশ আমরা গড়ে তুলতে চাই।
তারেক রহমান বলেন, এই প্রিয় মাতৃভূমি ১৯৭১ সালে লাখো শহীদের রক্তের বিনিময় অর্জিত হয়েছিল। ঠিক একইভাবে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর আধিপত্যবাদীদের হাত থেকে রক্ষার জন্য সেদিন সিপাহি-জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে আধিপত্যবাদের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করা হয়েছিল। একইভাবে পরবর্তীতে ১৯৯০-এ স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে এ দেশের জনগণ, এ দেশের খেটে খাওয়া মানুষ তাদের গণতান্ত্রিক অধিকারকে ছিনিয়ে এনেছিল। কিন্তু তারপরেও ষড়যন্ত্রকারীদের ষড়যন্ত্র থেমে থাকেনি। আমরা তারপর দেখেছি ১৯৭১ সালে এ দেশের মানুষ যেমন স্বাধীনতা অর্জন করেছিল, ২০২৪ সালে ৫ আগস্ট এ দেশের ছাত্র-জনতাসহ সর্বস্তরের মানুষ কৃষক, শ্রমিক, গৃহবধূ, নারী, পুরুষ, মাদ্রাসার ছাত্রসহ দলমত-নির্বিশেষে সব শ্রেণি-পেশানির্বিশেষে সকল মানুষ সেদিন এই দেশের স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করেছিল।
প্রায় দেড় যুগের নির্বাসিত জীবন থেকে দেশে ফিরে যেকোনো মূল্যে শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার প্রত্যয় জানিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। একই সঙ্গে যেকোনো উসকানির মুখে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দেড় বছরের মাথায় ‘মব’ আক্রমণসহ অপরাধমূলক নানা কর্মকাণ্ডে দেশের মানুষের মধ্যে যখন অনিশ্চয়তা, উদ্বেগ দেখা দিয়েছে এমন সময় দেশে ফিরে এই প্রত্যয় জানালেন তারেক রহমান। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হলে তাঁকে প্রধানমন্ত্রী করা হবে বলে দলটির নেতাদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে।
তিনি বলেন, আধিপত্যবাদী শক্তির গুপ্তচরেরা বিভিন্নভাবে ষড়যন্ত্রে এখন লিপ্ত রয়েছে। আমাদের ধৈর্যশীল হতে হবে। আমাদের ধৈর্য ধারণ করতে হবে। তরুণ প্রজন্ম আগামী দিনে দেশের নেতৃত্ব দেবে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, তরুণ প্রজন্মের যে সদস্যরা আছেন, আপনারাই আগামী দিনে দেশকে নেতৃত্ব দেবেন, দেশকে গড়ে তুলবেন। এই দায়িত্ব তরুণ প্রজন্মের সদস্যদের আজ গ্রহণ করতে হবে, যাতে করে এই দেশকে আমরা সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে পারি। শক্ত গণতান্ত্রিক ভিত্তি, শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপরে যাতে এই দেশকে আমরা গড়ে তুলতে পারি।
জনগণের প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার জন্য সব নেতাদের প্রতি আহ্বান জানান তারেক রহমান। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘যেকোনো মূল্যে আমাদের এই দেশের শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা করতে হবে। যেকোনো উসকানির মুখে আমাদের ধীর শান্ত থাকতে হবে।
জুলাই ৩৬ এক্সপ্রেসওয়েতে (৩০০ফিট) গণসংবর্ধনাস্থলে ১৬ মিনিট বক্তৃতা শেষে তারেক রহমান এভারকেয়ার হাসপাতালের উদ্দেশে রওনা দেন। তবে নেতাকর্মীদের ভিড়ের কারণে তাঁকে বহনকারী গাড়ি হাসপাতালে পৌঁছতে দেরি হয়। পথে সড়কের দুই পাশে ছিল হাজারো নেতাকর্মী। প্রিয় নেতাকে একনজর দেখার জন্য সড়কে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করছিলেন তাঁরা। তারেক রহমানও নেতাকর্মীদের প্রতি হাত নেড়ে এই ভালোবাসার জবাব দেন।
সন্ধ্যা ৫ টা ৫৪ মিনিটের দিকে তারেক রহমান হাসপাতালে প্রবেশ করেন। সন্ধ্যা ৫ টা ৫০ মিনিটের দিকে তারেক রহমানকে বহন করা লাল সবুজ বাসটি এভারকেয়ার হাসপাতালের গেটে এসে থামে।
এরপর অসুস্থ মায়ের পাশে সময় কাটান তিনি। এসময় সেখানে এক আবেগঘন পরিবেশ সৃষ্টি হয়। রাত ৮টার দিকে চলে যান গুলশানের বাসভবনে। আর এভাবেই তার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের প্রথম দিনটি অতিবাহিত হয়।





