জব্দ করা সাদাপাথর চুরি : নজরদারি নাই প্রশাসনের
প্রকাশিত হয়েছে : ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫, ৭:৫৭:৫২ অপরাহ্ন

oplus_0
আব্দুল জলিল, কোম্পানীগঞ্জ প্রতিনিধি:
দেশের জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র সাদাপাথর থেকে গত আগস্ট মাসে পাথর লুটপাটের ঘটনায় দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে জব্দ করে ভোলাগঞ্জ দশনম্বর এলাকা নিয়ে রাখা হয় লুণ্ঠিত সাদাপাথর। এবার এই পাথর চুরি করতে শুরু করেছে দুষ্কৃতকারীরা। তারা দশনম্বর নদীর তীর থেকে দয়ার বাজার এলাকা দিয়ে পাথর নিয়ে কালিবাড়ি ও কলাবাড়ি গ্রামে ক্রাশিং ও মজুদ করছে। আর এটি হচ্ছে প্রশাসনের নজরদারির অভাবে। উপজেলা প্রশাসনের পাথর লুটপাট নিয়ে থানায় মামলা দায়েরে অনিহা, অন্য দিকে পুলিশ মামলা দিলেও প্রকৃত অপরাধীদের আনতে পারছে না আইনের আওতায়।
গত আগস্ট মাসে সাদাপাথর লুটপাটের পর নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। সাদাপাথর ভিজিট করেন সচিব থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের প্রশাসনিক ও গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধিরা। জড়িতদের বের করতে দৌড়ঝাঁপ করতে থাকেন নানান পর্যায়ের তদন্ত কমিটি। ঢালাওভাবে পাথর লুটপাটের অভিযোগ উঠে এলাকার অনেকের উপর। এরই মধ্যে বেশ কিছু মানুষকে সাদাপাথর লুটপাটের মামলায় জেল হাজতে যেতে হয়েছে।
প্রশাসনের তৎপরতায় দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে জব্দ করা হয় লুণ্ঠিত সাদাপাথর। সেচ্ছায় পাথর ফিরিয়ে দিলে অপরাধ ক্ষমার ঘোষণায় আসতে থাকে লাখ লাখ ঘনফুট পাথর। উপজেলাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষ নিজ খরচে তাদের ক্রয়কৃত সাদাপাথর ভোলাগঞ্জ দশনম্বরের নদীর তীরে ফেরত পাঠান। প্রায় ১ মাস পর্যন্ত চলে এই পাথর ফেরত দেওয়ার কার্যক্রম। ইতোমধ্যে এর অর্ধেক পাথর পর্যটন কেন্দ্র সাদাপাথরে প্রতিস্থাপন করেছে জেলে ও উপজেলা প্রশাসন। আর বাকি অর্ধেক পাথর এখনো পড়ে আছে ভোলাগঞ্জ দশনম্বর এলাকার নদীর তীরে। তাছাড়া নদীর দু’পাড় তথা ভোলাগঞ্জ গুচ্ছগ্রাম, কলিবাড়ি, দয়ারবাজার ও কালাইরাগ এলাকার নদীর তীরে জব্দকৃত পাথর তো আছেই। জব্দ করে রাখা এই সাদাপাথর আবারও চুরি করতে শুরু করেছে দুষ্কৃতকারীরা। সেচ্ছায় ফেরত দেওয়া ও নদীর তীরে ফেলে রাখা জব্দকৃত এই পাথরে প্রশাসনের নজরদারি না থাকায় মূলত চুরির ঘটনা ঘটছে। কালিবাড়ি ও কলাবাড়ি এলাকায় এই সাদাপাথর নিয়ে ক্রাশিং করা হলেও এখানে নেই কোনো অভিযান। গত ৩ মাস আগে যেই পাথর ধরতে কেউ সাহস করতেন না, প্রশাসনের নমনীয়তায় এই পাথর এখন ক্রাশিং করে বিক্রি করা হচ্ছে। আর এসব ভাঙ্গা পাথর ট্রাকের মাধ্যমে উপজেলা পরিষদের সামনে বসানো চেকপোস্ট দিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নিরাপদে চলে যাচ্ছে।
সাদাপাথর লুটপাটের ঘটনায় ওএসডি করা হয় সিলেটের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শের মাহবুব মুরাদকে। আর বদলি করা হয় কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আজিজুন্নাহার ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা উজায়ের আল মাহমুদ আদনানকে। নতুন জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব দেওয়া হয় মো. সারোয়ার আলম এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে মোহাম্মদ রবিন মিয়াকে। তখন রাতদিন ২৪ ঘন্টার বেশিরভাগ সময়ই মোবাইল কোর্টের অভিযান দিয়ে সাদাপাথর উদ্ধার ও জব্দ করেন ইউএনও। এছাড়া দেশের বিভিন্ন জেলা থেকেও উদ্ধার করা হয় সাদাপাথর। রাস্তায় বসানো হয়েছিল সেনাবাহিনীর তল্লাশী চৌকি। পরিষদের সামনের মেইন রোডে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে লাগানো হয় সিসি ক্যামেরা বসানো হয় পুলিশের চেকপোস্টে। সাদাপাথর লুটপাটের ঘটনায় ২ হাজার জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে মামলা দায়ের করে বাংলাদেশ খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ব্যুরো (বিএমডি)। ঐ সময় প্রায় প্রতিদিন সাদাপাথর ও অবৈধভাবে বালু লুটপাটের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেছে উপজেলা ও পুলিশ প্রশাসন। সে সময় এক মাসে ২৭ দিন অভিযান দেওয়া হয়। প্রশাসনের কঠোর অবস্থানে বন্ধ হয় বালুপাথর লুটপাট। এর পর আস্তে আস্তে শিথিল হতে থাকে পরিস্থিতি, উঠিয়ে নেওয়া হয় সেনাবাহিনীর তল্লাশী চৌকি।
তবে এখনো রয়েছে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা পরিষদের সামনে পুলিশের চেকপোস্টে ও সিসি ক্যামেরা। কিন্তু এগুলো আগের মতো কাজ করছে না। চেকপোস্টে পুলিশের কমিশন আর সিসি ক্যামেরার তদারকির অভাবে বিনা বাঁধায় কোম্পানীগঞ্জ থেকে পরিবহন হচ্ছে অবৈধ বালু-পাথর।
স্থানীয় সুত্রে জানা যায়, ভোলাগঞ্জ দশনম্বর ও দয়ারবাজার এলাকার নদীর দু’পাশে কয়েক লক্ষ ঘনফুট পাথর জব্দ করা হয়েছিল। প্রায় ৪ মাস থেকে জব্দ থাকা এই পাথর নিয়ে প্রশাসনের কোনো পদক্ষেপ নাই। গত প্রায় ১ মাস থেকে জব্দ করা এসব পাথর নৌকা দিয়ে আবারও চুরি শুরু হয়েছে। দশনম্বর ও গুচ্ছগ্রাম থেকে পাথর নৌকা দিয়ে নিয়ে কালিবাড়ি ও কলাবাড়ি এলাকার নদীর তীরে বিক্রি করা হয়। এছাড়া রোপওয়ে বাংকার এবং কালাইরাগ এলাকার নদীর তীরে জব্দ করা পাথরও নৌকা দিয়ে চুরি করে দয়ারবাজার ঘাটে এনে বিক্রি করা হচ্ছে। স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট করে নদীর তীর থেকে ট্রাক্টর দিয়ে পাথর পরিবহন করে কালিবাড়ি ও কলাবাড়ি এলাকার ক্রাশার মিলে বিক্রি করেন। সেখানে এই সাদাপাথর ক্রাশিং করে বিক্রি করা হয়। পরে ট্রাকে করে এই ভাঙ্গা পাথর উপজেলা পরিষদের সামনের চেকপোস্ট হয়ে দেশের বিভিন্ন জায়গায় পাঠানো হয়। এই সিন্ডিকেটের মাঝে রয়েছে নৌকার লেবার, ট্রাক্টর ও পেলুডারের মালিক, নদীর তীরের সাইট ব্যবসায়ী, ক্রাশার মিলের মালিক ও ভাঙ্গা পাথরের রানিং ব্যবসায়ী।
একটি সুত্র জানিয়েছে উপজেলা পরিষদের সামনের চেকপোস্টে ১ হাজার টাকা দিলে ভাঙ্গা পাথরের গাড়ি যেতে পারে। আর বালু বোঝাই ট্রাক যেতে দিতে হয় ৫শ টাকা। সেখানে দায়িত্বে থাকা একজন পুলিশ সদস্য জানান বেশিরভাগ গাড়ি নেতা-লিডার ২/৩ জন নামধারী সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে নিয়ে যান। তবে উপজেলা প্রশাসন সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে সবকিছু দেখলেও এর কোন পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি।
সিলেট জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) পিংকি সাহা বলেন, বিষয়টি আমাদের জানা নেই। খোঁজ নিয়ে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।





