বাংলাদেশ-ভারতের রাজনৈতিক টানাপোড়েনের ছায়া ক্রিকেটে
প্রকাশিত হয়েছে : ০৫ জানুয়ারি ২০২৬, ৯:০৯:২৪ অপরাহ্ন

স্পোর্টস ডেস্ক : ভারতের ক্রিকেটের দর্শক-সমর্থক ও কর্মকর্তাদের সোশ্যাল মিডিয়ায় কাঁদা ছোড়াছুড়ি বা অপরপক্ষকে হেয় করে ট্রল করার সংস্কৃতি চলে আসছে বহু বছর ধরেই। কিন্তু দু’দিন আগে মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএলের দল থেকে বাদ দেওয়া ও তার প্রতিবাদে বাংলাদেশ ভারতে বিশ্বকাপ খেলতে অস্বীকৃতি জানানোর পর ক্রিকেটে দুই দেশের মধ্যকার বৈরিতা যেন আনুষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে।
গত দেড় বছরে ক্ষমতার পালাবদল ও দূতাবাসের নিরাপত্তার মত নানা ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কেও যথেষ্ট অবনতি হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ই কয়েক দফায় অন্য দেশের রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছে কোনো বিষয়ে নিন্দা জানাতে বা চলমান কোনো ইস্যুতে প্রতিবাদ জানাতে। দুই দেশের অনেক রাজনীতিবিদও বিভিন্ন সময়ে মাঠ গরম রাখতে অন্য দেশকে হেয় করে বক্তব্য দিয়েছেন।
সম্পর্কের এই তিক্ততাটা এতোদিন সোশ্যাল মিডিয়ার ‘টাগ অব ওয়ার’ বা কূটনৈতিক বিবৃতি প্রদানের মধ্যে ঘুরপাক খেলেও এবার সেই রেষারেষিটা সরাসরি ক্রিকেটের ওপর পড়লো। আর ক্রিকেট ঘিরে দুই দেশের এই দফার বিরোধটা যে বাংলাদেশ অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুতরভাবে নিচ্ছে, তা বোঝা যায় বাংলাদেশের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত থেকে। বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলে আইপিএল’এর ম্যাচ দেখানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা জানিয়ে সোমবার নির্দেশনা জারি করেছে।
সম্পর্কের তিক্ততার জের ধরে ক্রিকেটীয় কূটনীতি আর সম্পর্কে প্রভাব পড়ার নজির এতোদিন ছিল ভারত আর পাকিস্তানের মধ্যে। মোস্তাফিজুর রহমানকে ঘিরে হওয়া সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে ভারত আর বাংলাদেশের ক্রিকেটীয় সম্পর্কও এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছালো, যা আবার কবে স্বাভাবিক হবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
এ অবস্থায় পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লীগের (আইপিএল) সম্প্রচার বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়। হিন্দুত্ববাদী কিছু সংগঠনের দাবির মুখে কলকাতা নাইট রাইডার্সের (কেকেআর) দল থেকে ক্রিকেটার মোস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়ার ঘোষণার প্রতিক্রিয়ায় এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো।
এর আগে, মোস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়ার ঘটনায় নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে আসন্ন আইপিএল খেলার সকল সম্প্রচার বন্ধ করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টাকে অনুরোধ জানিয়েছিলেন ক্রীড়া উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল।
সেইসঙ্গে, আগামী টি-টুয়েন্টি ক্রিকেট বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ম্যাচগুলো ভারতের পরিবর্তে শ্রীলঙ্কায় সরিয়ে নেওয়ার জন্য আইসিসিকে চিঠি দিতে বাংলাদেশের ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) প্রতি নির্দেশ দেন তিনি।
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের ক্রীড়া উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেইজ থেকে দেওয়া স্ট্যাটাসে লিখেছেন যে ‘বাংলাদেশের বিশ্বকাপ খেলাগুলো শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত করার অনুরোধ জানানোর নির্দেশনা আমি দিয়েছি। তিনি ঐ স্ট্যাটাসের শেষ লাইনে লিখেছেন ‘গোলামির দিন শেষ।’ কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ইস্যুতে দুই দেশের নেওয়া পদক্ষেপেই ক্রিকেটীয় কূটনীতিকে প্রাধান্য না দিয়ে রাজনৈতিক বিবেচনাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
মোস্তাফিজুর রহমানকে কেকেআর থেকে বাদ দেওয়ার নির্দেশনার সমালোচনা করেছেন ভারতের সাংসদসহ ক্রিকেট সংশ্লিষ্ট অনেকেই।কংগ্রেস এমপি শশী ঠারুর মোস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়ার কড়া সমালোচনা করে ঐ সিদ্ধান্তকে ‘অপরিণামদর্শী’ হিসেবে মন্তব্য করেছেন সংবাদ সংস্থা এএনআইকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে। সোশ্যাল মিডিয়ার আক্রোশের’ ভিত্তিতে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া ‘উদ্বেগজনক’ বলে মন্তব্য করেন ঠারুর।
ভারতের ক্রিকেট বোর্ডের সাবেক প্রশাসক ও লেখক রামাচন্দ্র গুহাও এক্সে এক পোস্টে লিখেছেন যে এটি ‘মারাত্মক অবিবেচক’ সিদ্ধান্ত। ভারতের ‘জাতীয় স্বার্থেই বাংলাদেশের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা উচিৎ’ বলে পোস্টে মন্তব্য করেছেন তিনি।
একইভাবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও ভারতে বিশ্বকাপ খেলতে না যাওয়ার মত সিদ্ধান্ত অনেকটাই ‘অতিরিক্ত হার্ডলাইন অ্যাপ্রোচ’ হয়েছে বলে মনে করেন ক্রিকেটের সাথে জড়িত অনেকে।আইসিসি থেকে পাওয়া অর্থের পাশাপাশি বিসিবি’র আয়ের একটা বড় অংশ আসে দ্বিপাক্ষিক সিরিজগুলোর সম্প্রচার স্বত্ব থেকে। এমন পরিস্থিতিতে এ বছরের অগাস্টে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ভারতের সাথে বাংলাদেশের সিরিজ অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে এবং তার জন্য বিপুল পরিমাণ জরিমানা গুণতে হতে পারে বিসিবির।
তবে মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএলে রাখা ও পরবর্তীতে দল থেকে বাদ দেওয়ার নির্দেশনাকে কেন্দ্র করে বিসিসিআই কেন এমন হঠকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা নিয়ে ভারতীয় সমালোচকদের মতো বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞরাও ধোঁয়াশাতেই রয়েছেন।
গত দেড় বছরের মধ্যে ভারত আর বাংলাদেশের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্কে অবনতি হলেও দুই দেশের ক্রিকেটীয় সম্পর্কে এতোদিন তার সরাসরি প্রভাব পড়েনি।যদিও ২০১৫ বিশ্বকাপের ভারত-বাংলাদেশ ম্যাচের পর থেকেই দুই দেশের ভক্ত-সমর্থকদের মধ্যে মাঠের বাইরের লড়াইয়ের তীব্রতাটা দিন দিন শুধু বেড়েছেই। সেই লড়াই যে শুধু সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রল বা মিমের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, তা নয়।
অনেক সময়ই মূলধারার গণমাধ্যম অন্য দেশের ক্রিকেট টিমকে হেয় করে বানিয়েছে ‘মওকা মওকা’ জাতীয় টিভি বিজ্ঞাপণ বা পত্রিকায় ছাপিয়েছে ‘মুস্তাফিজ কাটার’ এর মতো আপত্তিকর গ্রাফিক্স।তবে এতোদিন কিছুটা ইঙ্গিতপূর্ণভাবে অন্য দেশের ক্রিকেটের সমালোচনা হলেও দুই বোর্ডের এবারের সিদ্ধান্তের পর হয়তো ক্রিকেটীয় বিবেচনাকে পুরোপুরি সরিয়ে দিয়ে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকেই প্রাধান্য দেবেন ভক্ত সমর্থকরা।





