৫ বছরে সড়ক দুর্ঘটনা ৬০ শতাংশ, মৃত্যু বেড়েছে ৩৬ শতাংশ
প্রকাশিত হয়েছে : ১০ জানুয়ারি ২০২৬, ৯:১৬:৩১ অপরাহ্ন
আঞ্চলিক ও গ্রামীণ সড়কে মৃত্যুর হার বেশি

জালালাবাদ রিপোর্ট : গত পাঁচ বছরে দেশে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা প্রায় ৬০ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৩৬ শতাংশ, আর সবচেয়ে ভয়াবহভাবে আহত বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি অর্থাৎ ১২৩ শতাংশ।শনিবার ঢাকায় ‘২০২৫ সালের সড়ক দুর্ঘটনার বার্ষিক প্রতিবেদন, এর পর্যালোচনা এবং সংস্কার সুপারিশ’ শীর্ষক এসব তথ্য প্রকাশ করে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন।
সংস্থাটির প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে সড়ক দুর্ঘটনার জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী মোটরসাইকেল। ২০২৫ সালে ৩ হাজার ২৯টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মোট ২ হাজার ৬৭১ জন নিহত হয়েছেন, যা মোট নিহতের ৩৬.২৯ শতাংশ।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২০ সালে ৪ হাজার ৭৩৫ দুর্ঘটনায় নিহত হন ৫ হাজার ৪৩১ জন, আহত হন ৭ হাজার ৩৭৯ জন। ২০২৫ সালে দুর্ঘটনার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৭ হাজার ৫৮৪টিতে, নিহত হন ৭ হাজার ৩৫৯ জন এবং আহত হন ১৬ হাজার ৪৭৬ জন।
নিহত মোটরসাইকেল আরোহীদের বড় অংশ ১৪ থেকে ৪৫ বছর বয়সী যুবক। প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে মোট মোটরযানের ৭১ শতাংশই মোটরসাইকেল, কিন্তু নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত দুর্বল।২০২৫ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় ১,৫৬৪ জন পথচারী নিহত হয়েছেন, যা মোট নিহতের ২১.২৫ শতাংশ। এছাড়া ১ হাজার ৮ শিশু নিহত হয়েছে, যাদের প্রায় অর্ধেকই পথচারী হিসেবে প্রাণ হারিয়েছে।
বিশেষ করে আঞ্চলিক ও গ্রামীণ সড়কে শিশু ও পথচারী মৃত্যুর হার বেশি। সড়ক শিশুবান্ধব না হওয়া, ফুটওভার ব্রিজের অপ্রতুলতা এবং আইন প্রয়োগের দুর্বলতাকে এর কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বিভাগভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঢাকা বিভাগে ২ হাজার ১৩৯টি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২ হাজার ১৮ জন-যা দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ।রাজধানীতে সড়ক দুর্ঘটনার বড় অংশ ঘটেছে রাতে (৪১.৫৬ শতাংশ), যেখানে ভারী যানবাহনের বেপরোয়া চলাচল একটি বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাবে, ২০২৫ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় মানব সম্পদের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২৫ হাজার ৫৫০ কোটি ৮ লাখ ৫২ হাজার টাকা। অপ্রকাশিত তথ্য যোগ করলে এই ক্ষতি জিডিপির ১.৫ শতাংশের বেশি হতে পারে বলে সংস্থাটি জানিয়েছে।
সংস্থাটির পক্ষ থেকে সুপারিশে বলা হয়েছে, জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল পুনর্গঠন করতে হবে এবং বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি, বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট করপোরেশন ও ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের কার্যকারিতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। প্রশাসন ক্যাডারের পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে দক্ষ ও অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞদের নিয়োগ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।সুপারিশে আরও বলা হয়, মোটরসাইকেল নিরাপত্তা জোরদারে ‘ইন্টারনেট অব থিংস’ প্রযুক্তি ব্যবহার এবং মানসম্মত হেলমেট বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। পাশাপাশি একটি পৃথক সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন, মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্যবাহী যানবাহন দ্রুত প্রত্যাহার এবং দক্ষ চালক তৈরিতে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ জোরদার করার কথা বলা হয়েছে।
চালকদের বেতন, কর্মঘণ্টা, স্বাস্থ্যসেবা ও পেশাগত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা, ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা উন্নয়ন এবং চালকদের জন্য প্রেরণামূলক প্রশিক্ষণ প্রদানের সুপারিশ করা হয়। একই সঙ্গে সার্ভিস রোড নির্মাণ করে স্বল্পগতির ছোট যানবাহনের জন্য নিরাপদ সড়ক নকশা নিশ্চিত করা এবং নিয়মিত সড়ক নিরাপত্তা অডিট পরিচালনার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
রাজধানীতে রুট পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে আধুনিক বাস সার্ভিস চালু করা, স্কুল ও কলেজ শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিজস্ব বাস সার্ভিস বাধ্যতামূলক করা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ঋণ সুবিধা দিয়ে বাস ক্রয় নিশ্চিত করার কথাও সুপারিশে উল্লেখ করা হয়।
এ ছাড়া প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে দক্ষতা বৃদ্ধি, সড়ক ব্যবহারকারীদের সচেতনতা ও দক্ষতা উন্নয়নে বাজেটে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ, সব রেল ক্রসিংয়ে গেটকিপার নিয়োগ এবং মহাসড়কের পাশে ট্রমা কেয়ার সেন্টার স্থাপনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
সুপারিশে আরও বলা হয়, সড়ক, রেল ও নৌপরিবহন খাত একত্রিত করে একটি অভিন্ন যোগাযোগ মন্ত্রণালয় গঠন করা, দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ট্রাস্ট ফান্ডে অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করা এবং গণপরিবহনে চাঁদাবাজি বন্ধ করতে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।





