ধুঁকে মরছে ছাতক সিমেন্ট কারখানা
প্রকাশিত হয়েছে : ১২ জানুয়ারি ২০২৬, ৭:২৩:১২ অপরাহ্ন

আমিনুল ইসলাম হিরণ, ছাতক : হাজার কোটি টাকার আধুনিক প্রযুক্তির বিশাল কারখানার কাজ শেষ দেড় বছর আগেই। যন্ত্রপাতি বসানো হয়েছে, ট্রায়াল রানও চলছে নিয়মিত। অথচ উৎপাদন শুরু হচ্ছে না একদিনের জন্যও। কারণ, গ্যাস নেই, চুনাপাথর নেই। ফলে ধীরে ধীরে জং ধরছে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন দেশের সবচেয়ে পুরোনো এবং ঐতিহ্যবাহী ছাতক সিমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের নতুন প্ল্যান্টে। ফলে অনেকটা ধুকে ধুকে মরতে বসেছে এই কারখানা।
প্রকল্পের ব্যয় ১ হাজার ৪শ ১৭ কোটি, বাস্তব অগ্রগতি ৯০ ভাগ। তবু থেমে আছে উৎপাদন। ২০১৬ সালে ‘ছাতক সিমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের উৎপাদন পদ্ধতি ওয়েট প্রসেস থেকে ড্রাই প্রসেসে রূপান্তর (২য় সংশোধিত)’ শীর্ষক প্রকল্প হাতে নেয় বিসিআইসি।
প্রথমে ব্যয় ধরা হয় ৬৬৭ কোটি টাকা। পরে সেটা বেড়ে দাঁড়ায় ৮৯০ কোটি। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ৯ মে ব্যয় দাঁড়ায় ১ হাজার ৪শ ১৭ কোটি টাকা। প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি ৯০.৭০ শতাংশ। কিন্তু আর্থিক অগ্রগতি মাত্র ৫৮.৬৭ শতাংশ। কারণ রোপওয়ে ও গ্যাসলাইন-দুই প্রধান কাঁচামাল সরবরাহ ব্যবস্থার কাজই বন্ধ।
১৯৩৭ সালে প্রতিষ্ঠিত ছাতক সিমেন্ট কারখানা বহু বছর ধরে ভারতের মেঘালয়ের কোমোরাহ লাইমস্টোন মাইনিং কোম্পানি (কেএলএমসি) থেকে রোপওয়ের মাধ্যমে চুনাপাথর আনত। ১৭ কিলোমিটারের এই রোপওয়ের মধ্যে ১১ কিলোমিটার বাংলাদেশে এবং ৪.৬ কিলোমিটার ভারতে। বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশ অংশের রোপওয়ে ভেঙে বিক্রি করে দেওয়া হয়। নতুন করে রোপওয়ে নির্মাণ প্রকল্পে থাকলেও ভারতের অনুমতি না পাওয়ায় পাঁচ বছরেও কাজ শুরু হয়নি।
কেএলএমসি বলছে, তারা চীনা কোম্পানির সঙ্গে কাজ করতে রাজি নয়। ভারতও আনুষ্ঠানিকভাবে চীনের সংশ্লিষ্টতা চায় না। ফলে চুক্তি সংশোধন, অনুমতি, কূটনৈতিক জট-সব মিলিয়ে নতুন রোপওয়ে কাজ ক্রমেই অনিশ্চয়তায়। কেএলএমসি আবার বলছে, সাধারণ ঠিকাদারের অর্থ থেকে তাদের অনুকূলে এলসি খুলে দিলেই তারা কাজ শুরু করবে। এর জন্য প্রয়োজন নতুন চুক্তি, আর তাতে লাগবে অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের সবুজ সংকেত। ফলে কবে রোপওয়ে হবে তা কেউ জানে না।
গ্যাসলাইনেও জটিলতা: ৪৩ কিলোমিটার পাইপলাইন স্থাপনের অনুমতি মেলেনি এখনো। ড্রাই প্রসেস প্ল্যান্ট চালু করতে আগের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি গ্যাস প্রয়োজন। বিদ্যমান লাইন এ চাহিদা পূরণ করতে পারে না। তাই ৪৩ কিলোমিটার নতুন গ্যাস সঞ্চালন লাইন প্রয়োজন। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩০০ কোটি টাকা। কিন্তু এখনো পেট্রোবাংলার অনুমোদন মিলেনি। জালালাবাদ গ্যাস কর্তৃপক্ষ বলছে, গ্যাসের নিশ্চয়তা না পেলে সংযোগলাইন স্থাপন সম্ভব নয়। বিসিআইসির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী গাজী কামরুল হোসেন বলেন, টাকা পেয়েছি, লাইন টানার প্রস্তুতিও আছে। কিন্তু গ্যাস সংযোগের অনুমতি মিলছে না। ফলে পুরো প্রকল্পই ঝুলে আছে।
বিশেষজ্ঞদের দাবি—বাংলাদেশে সিলেটের জালালাবাদ এলাকায় বড় আকারের চুনাপাথর খনি রয়েছে। ৬৭৫ একর জমিতে উত্তোলন সম্ভব। কিন্তু সরকার তথ্য গোপন রেখে অতীতে ভারতের ওপর নির্ভর করেছে। ফলে দেশি সম্পদ অক্ষত থাকা অবস্থায় বিদেশি আমদানিনির্ভর কাঠামোতে ছাতক সিমেন্ট বহু বছর চলে গেছে। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে দেশে খনি থাকা সত্ত্বেও কেন এত বছর বিদেশের ওপর নির্ভরতা? দেশীয় সম্পদ ব্যবহার করলে চাকরি, রাজস্ব, উন্নয়ন-সবই বাড়ত। নতুন কারখানার উৎপাদন ক্ষমতা তিনগুণ ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ নষ্ট হচ্ছে ড্রাই প্রসেস প্ল্যান্টের উৎপাদন ক্ষমতা দৈনিক দেড় হাজার মেট্রিক টন, যা আগের তুলনায় তিনগুণ। কিন্তু উৎপাদন শুরু হতে দেরি হওয়ায় যন্ত্রাংশে জং ধরার ঝুঁকি, দক্ষ জনবল হারানোর আশঙ্কা, প্রকল্প ব্যয় আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।ভারতীয় অনুমতি ও কূটনৈতিক সম্পর্ক—মূল বাধা: ৫ আগস্টের পর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের অবনতি হয়েছে উল্লেখ করে প্রকল্পের কর্মকর্তারা বলেন, ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন বাড়ার পর রোপওয়ে অনুমতিও ঝুলে গেছে। চীনা কোম্পানির সংশ্লিষ্টতাও ভারতের অনাগ্রহের কারণ। ফলে রোপওয়ে না হলে চুনাপাথর আসবে না, চুনাপাথর না এলে উৎপাদনও অসম্ভব। ২০২০ সালে বন্ধ হয়ে যায় কারখানা। করোনা মহামারির সময় ভারত চুনাপাথর রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দিলে ছাতক সিমেন্ট কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলেও কেএলএমসির নিবন্ধন নবায়ন হয়নি। অথচ ২০৩৩ সাল পর্যন্ত চুক্তি ছিল।
গত শুক্রবার দুপুরে শিল্প মন্ত্রণালয়, গৃহায়ণ মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেন। বিসিআইসি চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান জানান, গ্যাস ও চুনাপাথরের জটিলতা দ্রুত সমাধান করে কারখানা চালু করার চেষ্টা চলছে। কিন্তু ‘দ্রুত’ বলতে কতদিন-সেটার কোনো সীমা কেউই দিতে পারেননি।
ছাতক সিমেন্ট কোম্পানীর আধুনিকায়ন শুধু একটি শিল্প প্রকল্প নয়—এটি দেশের নির্মাণ খাত ও সীমান্ত এলাকার অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখার কথা ছিল। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জট, আন্তর্জাতিক অনিশ্চয়তা, প্রকৌশলগত ত্রুটি, নীতিমালা জট—সব মিলিয়ে প্রকল্পটি এখন অনিশ্চয়তার খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে।





