ঝুলে আছে ২৩ ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ভাঙার কাজ
প্রকাশিত হয়েছে : ১২ জানুয়ারি ২০২৬, ৮:৫৬:১৪ অপরাহ্ন
দেড় মাসেও নেই অগ্রগতি

স্টাফ রিপোর্টার : নরসিংদীতে ৫.৭ মাত্রার ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর সিলেট নগরীর ঝুঁকিপূর্ণ ভবন নিয়ে টনক নড়েছিল সিলেট সিটি কর্পোরেশনের (সিসিক)। ওই ভূমিকম্পের পর সিলেট নগরীর ঝুঁকিপূর্ণ ভবন নিয়ে হৈচৈ শুরু হলে গত ২৪ নভেম্বর অতিঝুঁকিপূর্ণ ২৩টি ভবন ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্তের কথা জানায় সিসিক। দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও অবহেলায় পড়ে থাকা এসব ভবন এক সপ্তাহ পর থেকেই ভাঙার কাজ শুরু হবে বলে জানিয়েছিলেন সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম। এক সপ্তাহের মধ্যে ভবনগুলো ভাঙার কাজ শুরু হবে বলে ঘোষণা দিলেও ১ মাস ২০ দিন পেরিয়ে গেলেও ভবন ভাঙার কাজে কোনো অগ্রগতি নেই।
যদিও সিসিকের ভবন ভাঙার এ উদ্যোগ নতুন কিছ ুনয়। ২০১৯ সালে একটি বড় ভূমিকম্পের পর ওই ভবনগুলো ভেঙে ফেলার তোড়জোড় শুরু করে তৎকালীন সিসিক কর্তৃপক্ষ। কিন্তু সেইবারও ঘোষণায় আটকে থাকে ভবন ভাঙার কাজ, কাজের কাজ কিছুই করেনি সিসিক। তাই এবারের উদ্যোগ বাস্তবায়ন নিয়েও শঙ্কা দেখছে নগরবাসী। ভবনগুলো ভেঙে ফেলা না হলে যেকোনো সময় বড় আকারের ভূমিকম্প হলে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির শিকার হবে সিলেট। ব্যাপক প্রাণহানিরও শঙ্কা বিশেষজ্ঞদের।
তবে সিসিক এখন বলছে, ভবনগুলো ভেঙে ফেলার কথা বলেনি সিসিক। তারা বলছে, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের বিষয়ে কমিটি করে দেওয়া হবে। ওই কমিটি সিদ্ধান্ত নেবে। কমিটি প্রতিবেদন দিয়েছে। মন্ত্রণালয় চাইলে সেই প্রতিবেদন পাঠানো হবে। কিন্তু প্রতিবেদনে কী সুপারিশ করেছে, সেটা প্রকাশ করা হবে কি না, সে বিষয়ে পরিস্কার করছে না কর্তৃপক্ষ।
জানা গেছে, গত বছরের ২১ নভেম্বর নরসিংদীর পলাশে ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে। রাজধানী ঢাকায় কয়েকজন মারাও যান ওই ভূমিকম্পে। এই ঘটনার পর ভূকম্পন প্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত সিলেটে আতঙ্ক দেখা দেয়। নাগরিক সমাজ সিলেটের ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ভেঙে ফেলার দাবি তুলে। সেই ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে সিলেটে হৈচৈ শুরু হলে গত ২৪ নভেম্বর নগর ভবনে এ বিষয়ে আলোচনা সভায় সিলেট নগরীর ২৩টি ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। গত ২৪ নভেম্বর বিকেল ৪টায় নগর ভবনে অনুষ্ঠিত ভূমিকম্পের পূর্বপ্রস্তুতি ও পরবর্তী করণীয় বিষয়ক মতবিনিময় সভায় এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় বলে জানানো হয় তখন। সভায় সভাপতিত্ব করেন সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনার খান মো. রেজা উন-নবী। উপস্থিত ছিলেন সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম, সিসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রেজাই রাফিন সরকারসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা।
ওই সভায় সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ এসব ভবনে এখনো অনেক মানুষ বসবাস ও ব্যবসা করছেন, যা বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি করছে। নাগরিকদের সুরক্ষার স্বার্থেই দ্রুত ভবনগুলো ভাঙার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি আরও জানান, নগরের সংকীর্ণ রাস্তাগুলো দুর্যোগের সময় উদ্ধারকাজ ব্যাহত করতে পারে, এ বিষয়ে বিশেষ সতর্কতার প্রয়োজন রয়েছে।
সূত্র জানায়, ২০১৯ সালের ভূমিকম্পের পর এসব ভবন ভেঙে ফেলার নির্দেশনা থাকলেও রহস্যজনক কারণে সিসিক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়নি। এমনকি সুরমা মার্কেট, সিটি সুপার মার্কেটসহ সাতটি শপিং সেন্টার ১০ দিন বন্ধ রেখে কেবল রঙের কাজ শেষে পুনরায় চালু করা হয়। ছয় বছর পার হলেও তালিকাভুক্ত বহু ভবন এখনও অতি ঝুঁকির তালিকায় রয়ে গেছে।
সিসিকের তালিকাভুক্ত অতি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো হলো কালেক্টরেট ভবন-৩, সমবায় ব্যাংক ভবন মার্কেট, মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার সাবেক কার্যালয়, সুরমা মার্কেট, সিটি সুপার মার্কেট, মিতালী ম্যানশন, আজমীর হোটেল, মধুবন মার্কেট, মান্নান ভিউ, শুভেচ্ছা-২২৬, চৌকিদেখী ৫১/৩ সরকারি ভবন, নবপুষ্প-২৬/এ, রাজা ম্যানশন, কিবরিয়া লজ, মিতালী-৭৪, মেঘনা-এ-৩৯/২, পাঠানটুলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ওয়ারিছ মঞ্জিল, হোসেইন মঞ্জিল, শাহনাজ রিয়াজ ভিলা, নূরানি-১৪, পৌর বিপণি ও শপিং সেন্টার এবং লেচুবাগান এলাকার প্রভাতী ও শ্রীধরা হাউস।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. জহির বিন আলম বলেন, ভূতাত্ত্বিক কারণে সিলেট অঞ্চল ভূমিকম্পপ্রবণ। অতীতে এখানে বড় ধরনের ভূমিকম্প হয়েছে। আজ হোক কাল হোক আবার বড় ভূমিকম্প হতে পারে। তাই জানমালের ক্ষতি কমাতে সতর্কতামূলক প্রস্তুতি অপরিহার্য। এই প্রস্তুতির গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভবনগুলো যতদূর সম্ভব ভূমিকম্প সহনীয় রাখা, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ভেঙে ফেলা, উদ্ধারকাজের জন্য আধুনিক যন্ত্রপাতির মজুদ রাখা, সড়কগুলো প্রশস্ত রাখা, যাতে উদ্ধারকাজ চালানো সম্ভব হয়।
জানতে চাইলে সিসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রেজাই রাফিন সরকার জালালাবাদকে বলেন, আমরা ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ভেঙে ফেলার কথা বলিনি। আমরা বলেছি, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন বিষয়ে কমিটি করে দেওয়া হয়েছে। তারাই সিদ্ধান্ত নেবে। তিনি বলেন, কমিটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। মন্ত্রণালয় চাইলে সেটা জমা দেওয়া হবে। তাহলে এসব ভবন কী ভাঙা হবে না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কমিটির প্রতিবেদনের আলোকে উর্ধতন কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নেবে।





