গতি পেয়েছে গ্রাম আদালত
প্রকাশিত হয়েছে : ১৩ জানুয়ারি ২০২৬, ৪:০০:১৩ অপরাহ্ন
♦ ২২ মাসে মামলা বাস্তবায়নের হার ৯১.৭৭ ♦ নিস্পত্তি ১ লক্ষ ৭২ হাজার, সিলেটে ১৫৩৬টি ♦ ক্ষতিপূরণ আদায় ২৩২ কোটি

স্টাফ রিপোর্টার: সময়ের সাথে সাথে গতি পেয়েছে গ্রাম আদালত। বিকল্প বিচারব্যবস্থা গ্রাম আদালত গঠনের পর থেকে মামলার নিষ্পত্তির হার ধীরে ধীরে বাড়ছে। আইনজীবী নিয়োগ ছাড়াই অভিযোগের দ্রুত সমাধান হচ্ছে। গত ২২ মাসে (ফেব্রুয়ারী ২০২৪ থেকে নভেম্বর ২০২৫) গ্রাম আদালতে মামলা দায়ের হয়েছে ১ লক্ষ ৭২ হাজার ৭৩১টি। উচ্চ আদালত থেকে মামলা প্রেরিত হয়েছে ১৭ হাজার ৬টি। এসব মামলার নিস্পত্তির হার ৭৯ দশমিক ৯৬ শতাংশ। বাস্তবায়িত সিদ্ধান্তের হার ৯১ দশমিক ৭৭ শতাংশ। এর বিপরীতে ক্ষতিপূরণ আদায় হয়েছে ২৩২ কোটি ৬৩ লক্ষ ৮ হাজার ৯৩৭ টাকা।
মামলা দায়েরকারীর মাঝে নারীর সংখ্যা ৪৭ হাজার ২৩৩ জন। অর্থাৎ এই বিচার প্রক্রিয়ার অংশগ্রহনকারীর নারীর হার ১৫ শতাংশ। এছাড়া এই সময়ে মোট ১ লক্ষের বেশি নারী-পুরুষকে গ্রাম আদালত বিষয়ে সচেতন করা হয়েছে।
এদিকে, গত এক বছরে (জানুয়ারী ২০২৫-ডিসেম্বর ২০২৫) সিলেট জেলায় গ্রাম আদালতে মামলা নিস্পত্তির সংখ্যা ১ হাজার ৫শ ৩৬টি। এসবের মধ্যে দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা রয়েছে।সোমবার সিলেট জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে বাংলাদেশে গ্রাম আদালত সক্রিয়করণ- ৩য় পর্যায় প্রকল্প আয়োজিত গ্রাম আদালত সম্পর্কে ব্যাপক জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে গণমাধ্যমের ভূমিকা শীর্ষক সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময় সভায় এ তথ্য জানানো হয়েছে।
এসময় জানানো হয়, প্রকল্পের আওতায় দেশের আট বিভাগ, ৬১ জেলা (পার্বত্য চট্টগ্রাম ব্যতিত), ৪৬৮টি উপজেলা এবং ৪ হাজার ৪৫৭টি ইউনিয়ন পরিষদে গ্রাম আদালত স্থাপন করা হয়েছে। যেখানে ছোটখাটো দেওয়ানি ও ফৌজদারি বিরোধের নিষ্পত্তি করা হয়।
জেলা প্রশাসনের সম্মেলন কক্ষে মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম। স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক সুবর্না সরকারের সভাপতিত্বে মতবিনিময় সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন গ্রাম আদালত সক্রিয়করণ প্রকল্পের কোঅর্ডিনেশন এনালিস্ট ড. শঙ্কর পল ও গ্রাম আদালত আইন বিষয়ে উপস্থাপনা করেন লিগ্যাল এনালিস্ট ব্যারিস্টার মশিউর রহমান চৌধুরী। এসময় সিলেট প্রেসক্লাব সভাপতি মুকতাবিস উন নূর, সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম, জেলা তথ্য অফিসের সহকারী পরিচালক রকিবুল হাসান, গ্রাম আদালত সক্রিয়করণ প্রকল্পের কমিউনিকেশন এন্ড আউটরিচ এনালিস্ট সুমন ফ্রান্সিস গোমেজ, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা ও গণমাধ্যমের প্রতিনিধিবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম বলেন, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ও সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করলে স্থানীয় বিচারকার্যে সাধারণ জনগণের আস্থা বৃদ্ধি পাবে। যোগ্যতাসম্পন্ন লোকেরা বিচার করলে সে বিচার মামলা পর্যন্ত গড়াবে না। তাই ন্যায়বিচার প্রাপ্তির জন্য গ্রহণযোগ্য মানুষকে জনপ্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত করার বিকল্প নেই। তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের উদ্দেশ্যে বলেন, গ্রাম আদালতের সফলতার গল্প ও সীমাবদ্ধতা গণমাধ্যমে প্রকাশ করতে হবে। স্যোশাল মিডিয়ায় কন্টেন্ট তৈরি করে প্রচার করতে হবে। গ্রাম আদালতের বার্তা সর্বাধিক মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।জেলা প্রশাসক জানান, আদালতের সকল মামলা অটোমেশনের আওতায় নিয়ে আসা হচ্ছে। এতে ঘওে বসেই যে কেউ তাঁর মামলার সব তথ্য পেয়ে যাবেন।

উন্মুক্ত আলোচনায় সাংবাদিকরা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের গ্রাম আদালত ও আইন বিষয়ে প্রশিক্ষণ, স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপকভাবে প্রচার, স্যোশাল মিডিয়ায় সময়োপযোগী কন্টেন্ট তৈরি করে প্রচার, জেলা প্রশাসনের তদারকি বৃদ্ধি, বিচারিক কার্যক্রমে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করা, বর্তমান প্রেক্ষাপটে সামাজিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো গ্রাম আদালতে অন্তর্ভুক্ত করাসহ বিচারকার্যে জনপ্রতিনিধির পাশাপাশি মসজিদের ইমাম ও সাংবাদিক অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন।
জানা গেছে, ১৯৭৬ সালে গ্রাম আদালত অধ্যাদেশের মাধ্যমে দেশে গ্রাম আদালতের প্রচলন হয়। এরপর বেশ কয়েকবার সংশোধন হয়েছে এই আইন। ২০০৬ সালে গ্রাম আদালত আইন পাসের পর গ্রাম আদালত ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে বাংলাদেশ সরকারের স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, ইউএনডিপি ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন যৌথভাবে প্রকল্পের মাধ্যমে কাজ শুরু করে। বাংলাদেশে গ্রাম আদালত সক্রিয়করণ পাইলট প্রকল্প ২০০৯ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত ৩৫১টি ইউনিয়নে প্রথম পর্যায়ে বাস্তবায়ন করা হয়। দ্বিতীয় পর্যায়ে ১ হাজার ৮০টি ইউনিয়নে বাস্তবায়িত হয় ২০১৬ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত। বর্তমানে গ্রাম আদালত সক্রিয়করণ তৃতীয় পর্যায়ের প্রকল্প চলছে। চলবে ২০২৭ সাল পর্যন্ত। এই প্রকল্পের আওতায় বর্তমানে পার্বত্য তিন জেলা বাদে দেশের ৪ হাজার ৪৫৭টি ইউনিয়নে গ্রাম আদালত সক্রিয়করণের কাজ চলমান রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গ্রাম আদালতে ফৌজদারি মামলা করতে ১০ টাকা এবং দেওয়ানি মামলা করতে ২০ টাকা আবেদন ফি দিতে হয়। আর আদালত থেকে কোনো মামলা পাঠানো হলে তার জন্য কোনো ফি নেই। আইন অনুযায়ী, এই আদালতে অভিযোগ করতে হয় ঘটনার ৩০ দিনের মধ্যে। আর কোনো অভিযোগ দাখিল হওয়ার সর্বোচ্চ ৯০ দিনের মধ্যে তা নিষ্পত্তি করতে হয়। আইনে এই আদালত থেকে সরাসরি শাস্তির বিধান না থাকলেও সর্বোচ্চ ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত ক্ষতিপূরণের আদেশ দিতে পারে। এই আদালতের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ পক্ষ এখতিয়ার সম্পন্ন সহকারী জজ আদালতে আপিল করতে পারেন।





