অর্থনৈতিক স্থবিরতায় ব্যবসা-বাণিজ্যে দুর্দিন
প্রকাশিত হয়েছে : ১৯ জানুয়ারি ২০২৬, ৮:৩৭:৪২ অপরাহ্ন

জালালাবাদ ডেস্ক: দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে চলছে অত্যন্ত ধীর গতি। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন এগোচ্ছে খুঁড়িয়ে। লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি। নির্মাণ খাত সংকোচনের ধারায়। একই সঙ্গে নির্মাণ কার্যক্রম ও কর্মসংস্থান সূচকে প্রবৃদ্ধির গতি মন্থর। ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না শেয়ারবাজার। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সবার মধ্যে রয়েছে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা। রাজনৈতিক দৃশ্যপট বদলাচ্ছে প্রতিদিনই। এ নিয়ে ব্যবসায়ী মহলে রয়েছে অস্থিরতা। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্যে দুর্দিন বিরাজ করছে। এর সঙ্গে রয়েছে মুল্যস্ফীতি উচ্চ চাপ, ব্যাংক খাতের অনিশ্চয়তা, ঋণের চড়া সুদ, বৈশ্বিক মন্দা পরিস্থিতি এই সংকটকে করেছে ঘনীভূত। বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত এই অনিশ্চয়তা কাটার সম্ভাবনা নেই। এমনকি নির্বাচিত সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্বে না আসা পর্যন্ত দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির গতি বাড়ারও সম্ভাবনা নেই।
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, বৈশ্বিক চাহিদা কমে যাওয়া ও রপ্তানি প্রতিযোগিতা হ্রাসের কারণে রপ্তানি খাতে চাপ, অভ্যন্তরীণ চাহিদার পতন এবং বিনিয়োগ স্থবিরতার ফলে এই অবস্থা।জানা গেছে, নির্মাণ খাতে আগের সময়ে পাওয়া কিন্তু এখনও সম্পন্ন না হওয়া কাজের পরিমাণ (অর্ডার ব্যাকলগ) কমছে। অর্থাৎ নতুন কাজ আসার তুলনায় পুরনো কাজ শেষ হয়ে যাওয়ার গতি বেশি। অন্যদিকে গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এবার এডিপি বাস্তবায়নের হার ও ব্যয় উভয়ই কমেছে। গত অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান, সরকার পতন এবং প্রশাসনে ব্যাপক অস্থিরতা থাকা সত্ত্বেও মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো এডিপি খাতে ৫০ হাজার ২ কোটি টাকা ব্যয় করতে সক্ষম হয়েছিল। সেই তুলনায় চলতি অর্থবছরের একই সময়ে ব্যয় কমেছে ৮ হাজার ১২৫ কোটি টাকা। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে ব্যয় হয়েছে ৪১ হাজার ৮৭৬ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। এডিপি ব্যয়ের এই চিত্র গত আট অর্থবছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
এদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) প্রকাশিত পরিসংখ্যানে দেখা যায়, নভেম্বর পর্যন্ত ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪২ হাজার কোটি টাকা। গত পাঁচ মাসে ১ লাখ ৭৩ হাজার ২৩ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে রাজস্ব আদায় হয়েছে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৯৭৬ কোটি টাকা। কেবল নভেম্বর মাসেই লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় আদায় কম হয়েছে প্রায় ৬ হাজার ৬৬৭ কোটি টাকা।
তবে জাতিসংঘের শিল্প-বাণিজ্য সংস্থা আঙ্কটাড বলছে, আগামী নভেম্বরে উন্নয়নশীল দেশের চূড়ান্ত স্বীকৃতি পেতে যাওয়া বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি চলতি বছর হবে ৪.৬ শতাংশ। যা গেল বছরের তুলনায় কিছুটা বেশি। আগামী বছর এই প্রবৃদ্ধি বেড়ে দাঁড়াবে ৫.৪ শতাংশে।
এদিকে দেশের অর্থনীতি ও রপ্তানির অন্যতম প্রধান খাত পোশাক শিল্পে সতর্ক সংকেত দেখা দিয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাস জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ২৬টি দেশে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমেছে। যা রপ্তানির নেতিবাচক প্রবৃদ্ধিকে প্রভাবিত করেছে। বিশেষ করে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বড় বাজারগুলোতে এই নেতিবাচক প্রবণতা চ্যালেঞ্জের নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি কমেছে ২.৬৩ শতাংশ। এ সময়ে মোট পোশাক রপ্তানি হয়েছে ১ হাজার ৯৩৬ কোটি ৫৪ লাখ ডলারের, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে হয়েছিল ১ হাজার ৯৮৮ কোটি ৭৭ লাখ ডলারের। এর সঙ্গে শাক-সবজি, মাছ, হিমায়িত খাদ্য, অপ্রচলতি পণ্য রপ্তানিও কমেছে। দেশের ভেতরেও ব্যবসার গতি কমেছে। ক্ষুদ্র, মাঝারি, বড় শিল্প মালিক সবাই উদ্বিগ্ন নির্বাচন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে।
শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, ২০২৫ বছরটি ছিল কেবল টিকে থাকার লড়াই। তবে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের পর একটি নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিলে অর্থনীতির এই অচলাবস্থা কাটার প্রত্যাশা রয়েছে। সেই প্রত্যাশা নিয়ে অনেকেই লোকসান দিয়ে হলেও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখছেন। তারা বলছেন, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও জ্বালানি সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাইরেও বেসরকারি খাতে নানা কাঠামোগত সমস্যায় তারা জর্জরিত। উচ্চ সুদহার ও কঠোর ঋণনীতির কারণে বিনিয়োগ ব্যয় বেড়েছে। যার ফলে গত এক বছরে ব্যবসা পরিচালনার খরচ বেড়েছে প্রায় ৩৫ শতাংশ। কিন্তু সেই অনুপাতে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা না বাড়ায় পণ্যের বিক্রি কমেছে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ।
দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতি যে কঠিন সময় পার করছে তা খোদ সরকারের পক্ষ থেকেও স্বীকার করা হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ স্টেট অব দি ইকোনমি ২০২৫’ শীর্ষক প্রতিবেদন বলছে, দেশের অর্থনীতি সংকটময় পরিস্থিতি পার করছে, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি কমে গেছে, ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণে ধীরগতি দেখা দিয়েছে, সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় উদ্যোক্তারা নতুন উদ্যোগ নিতে নিরুৎসাহী হচ্ছেন। ফলে কর্মসংস্থান ও উৎপাদন উভয় ক্ষেত্রেই স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। প্রতিবেদনে দুর্বল বেসরকারি বিনিয়োগ ও শিল্প কার্যক্রমকে প্রবৃদ্ধির বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।





