দিল্লি নয় পিন্ডি নয়, সবার আগে বাংলাদেশ : তারেক রহমান
প্রকাশিত হয়েছে : ২৩ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০৫:১৯ অপরাহ্ন

স্টাফ রিপোর্টার : ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় এবারো বিশাল জনসভার মাধ্যমে সিলেট থেকে অনুষ্ঠানিক ভোটের প্রচারণা শুরু করলেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সিলেটবাসীর কাছে চাইলেন ধানের শীষে ভোট। বললেন, যেমন দিল্লি নয়, তেমন পিন্ডি নয়, নয় অন্য কোনো দেশ। সবার আগে বাংলাদেশ। ধানের শীষ নির্বাচিত হলে স্বৈরাচার মুক্ত দেশে গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হবে বলেও তিনি উল্লেখ করলেন।
সিলেট নগরের সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে বৃহস্পতিবার এই প্রথম নির্বাচনী জনসভা সকাল ১০টা ৫০ মিনিটে কোরআন তিলাওয়াতের মধ্য দিয়ে শুরু হয়। সিলেট জেলা ও মহানগর এবং সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির উদ্যোগে আয়োজিত এ সমাবেশ মঞ্চে তারেক রহমান আসেন দুপুর ১২টা ২৫ মিনিটে এবং প্রায় আধা ঘণ্টা বক্তব্য দেন। তিনি আসার আগেই লোকে লোকারণ্য হয়ে পড়ে সমাবেশস্থল। উপস্থিত ছিলেন সিলেট ও সুনামগঞ্জের বিভিন্ন আসনের বিএনপির প্রার্থীরা। তবে জনসভায় দলের প্রার্থীদের হাত উচিয়ে পরিচয় করিয়ে দিতে দেখা যায়নি তারেক রহমানকে।
বিএনপি দেশের প্রত্যেক মানুষকে স্বাবলম্বী হিসেবে গড়ে তুলতে চায় উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, কুফরির বিরুদ্ধে, হঠকারিতার বিরুদ্ধে, মিথ্যার বিরুদ্ধে আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আমাদের টেক ব্যাক বাংলাদেশে থাকতে হবে। আমরা দেশকে স্বৈরাচার থেকে মুক্ত করেছি। এখন মানুষের অধিকারকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। শুধু ভোট, শুধু কথা বলার অধিকার প্রতিষ্ঠিত করলে হবে না, মানুষকে সাবলম্বী করে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে।
নির্বাচন নিয়ে দেশের ভেতরে ষড়যন্ত্র হচ্ছে উল্লেখ করে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, কয়েকদিন ধরে খেয়াল করছি, দেশের ভেতরের কিছু কিছু মহল ষড়যন্ত্র শুরু করেছে। পোস্টাল ব্যালট নিয়ে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। ঠিক যেমন ফ্যাসিস্টরা ভোটাধিকার হরণ করেছিলো, একই রকম ষড়যন্ত্র শুরু করেছে একটি কুচক্রি মহল।
সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় ‘আপনারা ভালা আছইন নি’ বলে বক্তব্য শুরু করে তারেক রহমান বলেন, যারা একবছর আগে দেশ ছেড়ে পালিয়েছে তারা মানুষের টুঁটি চেপে ধরেছিলো। বাকস্বাধীনতা হরণ করেছে। বিএনপি নেতাকর্মীদের গুম, খুন করেছে। জেলে বন্দি করে রেখেছিলো। কিন্তু তার পরও মানুষ মাথা নত করেনি। মানুষ তাদের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে এসেছে। অসংখ্য মানুষের প্রাণ ও রক্তের বিনিময়ে দেশ স্বৈরাচার মুক্ত হয়েছে। ১৯৭১ সালে মানুষ যেভাবে বাংলাদেশকে স্বাধীন করেছিলো, ২০২৫ সালে মানুষ রাস্তায় নেমে স্বাধীনতা রক্ষা করেছে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের কথা উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, তারা উন্নয়নের নামে দেশের সম্পদ লুট করেছে। হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছে। আগে সিলেট থেকে ঢাকা আসা যেতো ৪/৫ ঘন্টায়। তথাকথিত উন্নয়নের ফলে এখন ১০ ঘন্টা লাগে। এই সময়ে সিলেটের মানুষজন লন্ডন চলে যেতে পারে।
গত তিনটি নির্বাচনের সমালোচনা করে তিনি বলেন, গত ১৫ বছরে আমরা দেখেছি ভোটের নামে ব্যালেট ডাকাতি হয়েছে। নিশি রাতের নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষের ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়েছিলো।
তিনি বলেন, আমরা এসব অবস্থার পরিবর্তন করতে চাই। আমরা দেশের কৃষক ভাইদের পাশে দাঁড়াতে চাই। আগামী নির্বাচনে ধানের শীষকে বিজয়ী করলে কৃষকদের পাশে দাঁড়াতে পারবো। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময়ে খাল খনন শুরু করেছিলেন। আমরা বিজয়ী হলে আবার খাল খনন শুরু করবো।
আগামী দিনের নিজের পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, আমাদের দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। আমরা তাদের সাবলম্বী করে গড়ে তুলতে সকল পরিবারকে ফ্যামেলি কার্ড পৌঁছে দিতে চাই। এই ফ্যামেলি কার্ডকে বাস্তবায়ন করতে, কৃষি কার্ড বাস্তবায়ন করতে ধানের শীষকে বিজয়ী করতে হবে।
আমরা শিক্ষিত নারীদের অর্থনৈতিকভাবে সাবলম্বী করতে চাই। বেকারদের জন্য কর্মসংস্থান তৈরি করতে চাই। আমরা কাউকে বেকার রাখতে চাইনা। সিলেটের বিদেশগামী তরুণদের টেনিং ও ভাষা শিক্ষা দিয়ে দক্ষ হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। দক্ষ মানুষদের আমরা সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিতে চাই।
সবশেষে তিনি বলেন, ইনশাল্লাহ, বিএনপি বিজয়ী হলে আমরা নবী করিম (স.) এর ন্যায়পরায়ানতার ভিত্তিতে দেশ গড়ে তুলবো।
তারেক রহমান জনসভায় আসার পর নেতা-কর্মীরা ‘দুলা ভাই, দুলা ভাই’-স্লোগানে চারপাশ মুখর করে তোলেন। মঞ্চে উঠে বিএনপির চেয়ারম্যান হাত নেড়ে উপস্থিত নেতা-কর্মীদের শুভেচ্ছা জানান। এর আগে তিনি শহরতলীর বিমানবন্দর এলাকায় গ্র্যান্ড সিলেট হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টে প্রায় শতাধিক তরুণ শিক্ষার্থীর সঙ্গে মতবিনিময় করেন।
প্রধান বক্তার বক্তব্যে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, দীর্ঘ ১৫ বছর মানুষ গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছে। গুম হয়েছে, খুন হয়েছে। কিন্তু মাথা নত করেনি।
ফখরুল আরও বলেন, জিয়াউর রহমানের দর্শন ছিল বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, বাংলাদেশের উন্নয়ন। আজকে সিলেট থেকে বাংলাদেশকে নতুন করে গড়ে তোলার যাত্রা শুরু হলো।
সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী। এ সময় মঞ্চে সিলেট বিভাগের চার জেলার সংসদীয় আসনের বিএনপি-মনোনীত ও সমর্থিত প্রার্থীরা উপস্থিত ছিলেন। সভা সঞ্চালনা করেন মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী ও সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরী।
মঞ্চে তারেক রহমানের স্ত্রী ডা: জুবাইদা রহমানসহ বিএনপি-মনোনীত প্রার্থী ও কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন। শুরুতে স্থানীয় বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের শীর্ষ নেতারা বক্তব্য দেন।
সমাবেশে বক্তব্য রাখেন- বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও সিলেট-১ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, উপদেষ্টা ও সিলেট-৪ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী, উপদেষ্টা ও সিলেট-৩ আসনে বিএনপির সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী এম এ মালিক, উপদেষ্টা ও সিলেট-২ আসনের প্রার্থী তাহসিনা রুশদি লুনা, উপদেষ্টা ড. মোহাম্মদ এনামুল হক চৌধুরী, কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব হুমায়ুন কবির, কেন্দ্রীয় আইন বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিষ্টার এম এ সালাম, কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক জি কে গউছ, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ সিদ্দিকী, সাবেক এমপি শাম্মী আক্তার, ইসলামী ঐক্যজোটের কেন্দ্রীয় নেতা এডভোকেট মাওলানা আব্দুর রকিব, কেন্দ্রীয় বিএনপির সহ-ক্ষুদ্র ঋণ বিষয়ক সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক, কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ডা. শাহরিয়ার হোসেন চৌধুরী, জিল্লুর রহমান জিল্লু, কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আবুল কাহের চৌধুরী শামীম, মিজানুর রহমান চৌধুরী মিজান, সিলেট-৫ আসনে বিএনপি জোট মনোনীদ প্রার্থী জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের কেন্দ্রীয় সভাপতি মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক, সিলেট জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সিলেট-৬ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী এডভোকেট এমরান আহমদ চৌধুরী, কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও সুনামগঞ্জ-৫ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী কলিম উদ্দিন আহমদ মিলন, সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সুনামগঞ্জ-৪ আসনের ধানের শীষের প্রার্থী এডভোকেট নুরুল ইসলাম নুরুল, সুনামগঞ্জ-৩ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী কয়ছর এম আহমদ, সুনামগঞ্জ-১ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী কামরুজ্জামান কামরুল প্রমূখ।
এর আগে সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার বিভিন্ন সংসদীয় আসনের নেতা-কর্মীরা সকাল থেকেই খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে জনসভাস্থলে আসেন। তাঁরা ধানের শীষ, বিএনপি, জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের নামে স্লোগান দেন। অনেকে মাথায় ধানের শীষের ছবিসংবলিত টুপি আর কপালে দলীয় পতাকা বেঁধে সভায় হাজির হন। বাইরে থাকা ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে প্লাস্টিকের ধানের শীষ কিনেও অনেকে সভায় আসেন।
সিলেটের জনসভা শেষে তারেক রহমান সড়কপথে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন। পথে তিনি সিলেট-ঢাকা মহাসড়কসংলগ্ন ছয় জেলার আরও ছয়টি স্থানে আয়োজিত নির্বাচনী সভায় ভাষণ দেন। এর মধ্যে প্রথমে মৌলভীবাজারের সদর উপজেলার শেরপুরের আইনপুর খেলার মাঠে এবং পরে হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার প্রস্তাবিত নতুন উপজেলা পরিষদের মাঠে আয়োজিত সভায় যোগ দেন।
পরে তারেক রহমান ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সরাইল উপজেলার কুট্টাপাড়া ফুটবল খেলার মাঠে, কিশোরগঞ্জের ভৈরব স্টেডিয়ামে, নরসিংদীর পৌর পার্কে এবং নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার এলাকায় আয়োজিত সমাবেশে যোগ দেন। এসব জনসভায় তিনি সংশ্লিষ্ট জেলাগুলো বিএনপি-মনোনীত ও সমর্থিত প্রার্থীদের আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচয় করিয়ে দেন।





