ভারতের জিএসপি স্থগিত : ইউরোপীয় বাজারে সুবিধা বাড়ল বাংলাদেশের
প্রকাশিত হয়েছে : ২৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৯:২৭:৪১ অপরাহ্ন

জালালাবাদ ডেস্ক : ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ‘জেনারালাইজড স্কিম অব প্রেফারেন্সেস (জিএসপি)’ সুবিধা তিন বছরের জন্য স্থগিত হওয়ায় ভারতের রফতানি খাতে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। তবে এই সিদ্ধান্ত দক্ষিণ এশিয়ার বাণিজ্য-মানচিত্রে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে, যেখানে বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ জানালা খুলেছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, চামড়া ও হালকা শিল্পপণ্যে বাংলাদেশের ইউরোপীয় বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
ইইউ’র সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত তিন বছরের জন্য ভারতের জিএসপি সুবিধা প্রত্যাহার করা হয়েছে। এর ফলে ইইউতে ভারতের প্রায় ৮৭ শতাংশ রফতানি পণ্যে এখন পূর্ণ এমএফএন (মোস্ট ফেভার্ড নেশন) শুল্ক প্রযোজ্য হবে। যদিও ইউরোপীয় কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ভারতের জন্য নতুন নিয়মের প্রভাব মোট ভারতীয় রফতানির মাত্র ২.৬৬ শতাংশে পড়বে।
তবে আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভ’ বলছে, ভারতের জন্য আগে যে পণ্যগুলোতে জিএসপি সুবিধা ছিল, তার একটি বড় অংশ নতুন নিয়মে বাধ্যতামূলক ‘মোস্ট ফেভার্ড নেশন’ শুল্কের আওতায় চলে গেছে। ফলে প্রায় ৮৭ শতাংশ শুল্ক সুবিধা কার্যত হারাচ্ছে। এতে ইউরোপীয় বাজারে ভারতীয় পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাবে এবং প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
উদাহরণস্বরূপ, আগে কোনও পোশাক পণ্যে ১২ শতাংশ এমএফএন শুল্ক থাকলেও জিএসপি সুবিধায় ভারতীয় রফতানিকারককে দিতে হতো মাত্র ৯.৬ শতাংশ। এখন সেই সুবিধা উঠে যাওয়ায় পুরো ১২ শতাংশ শুল্ক গুনতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সিদ্ধান্ত স্বল্পমেয়াদে ভারতের শিল্প ও রফতানিনির্ভর খাতগুলোতে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে— বিশেষ করে এমন সময়ে, যখন ভারত ও ইইউয়ের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি (এফটিএ) চূড়ান্ত হওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। শুল্ক সুবিধা হারানোর ফলে ইউরোপীয় ক্রেতাদের কাছে ভারতীয় পণ্যের আকর্ষণ কিছুটা কমতে পারে।
বাংলাদেশ এখনও ইইউ বাজারে শুল্কমুক্ত বা স্বল্প শুল্ক সুবিধা ভোগ করছে। ফলে দাম ও সরবরাহের প্রতিযোগিতায় ইউরোপীয় ক্রেতাদের দৃষ্টি বাংলাদেশের দিকে ঘুরে আসতে পারে। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি টেক্সটাইল, চামড়া ও লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্যে বাংলাদেশ এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে রফতানি প্রবৃদ্ধিতে নতুন গতি আসতে পারে।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, ভারতের জিএসপি সুবিধা প্রত্যাহার বাংলাদেশের জন্য স্বয়ংক্রিয় সাফল্য নয়। এটি মূলত একটি সময়-সীমাবদ্ধ সুযোগ। দক্ষতা বৃদ্ধি, উৎপাদন সক্ষমতা উন্নয়ন, শ্রম ও পরিবেশগত মান বজায় রাখা এবং নীতিগত প্রস্তুতি ও কৌশলগত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে এই সুযোগ কাজে লাগাতে হবে।
বর্তমানে বাংলাদেশ ইইউতে ডিউটি-ফ্রি ও কোটামুক্ত সুবিধা পাচ্ছে। যেখানে ভারতীয় রফতানিকারকরা ৯-১২ শতাংশ শুল্ক দিতে হচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশের পণ্য ইউরোপে প্রবেশ করছে শূন্য শুল্কে। বিশেষ করে পোশাক খাতে, যেখানে মুনাফার মার্জিন অত্যন্ত কম, সেখানে এই শুল্ক পার্থক্য অর্ডার স্থানান্তরের জন্য যথেষ্ট।
ইইউ বাজারে বাংলাদেশের মোট রফতানির প্রায় তিন-চতুর্থাংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। ভারতের জিএসপি সুবিধা প্রত্যাহারের ফলে বেসিক নিটওয়্যার, ডেনিম ও ক্যাজুয়াল পোশাকের অর্ডার বাংলাদেশে আসার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। ইউরোপীয় ব্র্যান্ডগুলো এখন খরচ কমাতে এবং সরবরাহ ঝুঁকি কমাতে একাধিক সোর্সে অর্ডার ভাগ করছে। ভারতীয় পণ্যের দাম বাড়ায় সেই অর্ডারের একটি অংশ বাংলাদেশে সরিয়ে নেওয়াই সবচেয়ে সহজ সিদ্ধান্ত।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই সুযোগ স্থায়ী নয়। ভারত ও ইইউয়ের মধ্যে এফটিএ চূড়ান্ত হলে ধাপে ধাপে শুল্ক কমে আসবে। এফটিএ কার্যকর হওয়ার আগ পর্যন্ত বাংলাদেশ এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারবে।
শুধু পোশাক নয়, নতুন খাতেও সুযোগ রয়েছে। ভারতের শুল্ক সুবিধা হারানোর কারণে চামড়া, হোম টেক্সটাইল, প্লাস্টিক, প্যাকেজিং ও হালকা প্রকৌশল পণ্য প্রতিযোগিতায় পড়বে। বাংলাদেশ ধীরে ধীরে সক্ষমতা বাড়াচ্ছে, যা অর্ডার টানার ক্ষেত্রে সুবিধা দিতে পারে।
বাংলাদেশের বড় ঝুঁকি হলো এলডিসি উত্তরণ। এলডিসি পরবর্তী সময়ে যদি বাংলাদেশ ইইউর জিএসপি প্লাস সুবিধা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে ভারতীয় শুল্কচাপের মতো অবস্থায় পড়তে পারে। তাই এই সময়টা শুধু অর্ডার বাড়ানোর নয়, বরং ক্রেতার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি, মূল্য সংযোজন বৃদ্ধি ও পণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধিরও।
ইইউর কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট মেকানিজম (সিবিএএম) ভবিষ্যতে বাংলাদেশের রফতানিতেও প্রভাব ফেলবে। তবে গ্রিন ফ্যাক্টরি সংখ্যা বেশি হওয়ায় সঠিক প্রস্তুতি নিলে এটি প্রতিযোগিতামূলক সুবিধায় পরিণত হবে। কার্বন ফুটপ্রিন্ট পরিমাপ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও পরিবেশবান্ধব উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপের মূল্যসংবেদনশীল বাজারে ১-২ শতাংশ শুল্ক পরিবর্তনও অর্ডার স্থানান্তরের জন্য যথেষ্ট। আগে যেখানে ভারতীয় গার্মেন্টস পণ্যে ৯.৬ শতাংশ শুল্ক দিতে হতো, এখন ১২ শতাংশ দিতে হবে। বাংলাদেশ এখনও ডিউটি-ফ্রি সুবিধায় এগিয়ে রয়েছে। এক ইউরোপীয় সোর্সিং এজেন্ট জানিয়েছেন, ভারতীয় সরবরাহকারীর দাম বাড়লে বাংলাদেশ স্বাভাবিক বিকল্প হিসেবে দেখা যাবে।
জিএসপি হলো ইইউর একতরফা বাণিজ্য সুবিধা, যার আওতায় উন্নয়নশীল দেশগুলো কম শুল্কে বা শুল্কমুক্তভাবে ইউরোপে পণ্য রফতানি করতে পারে। নির্দিষ্ট পণ্যে রফতানি সীমা অতিক্রম করলে সুবিধা প্রত্যাহার হয়। সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ ইইউ কমিশন ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও কেনিয়াকে ২০২৬-২০২৮ মেয়াদের জন্য জিএসপি সুবিধা থেকে গ্র্যাজুয়েট করেছে।





