গণভোট ‘হ্যাঁ’ জিতলে খুলবে সংস্কারের পথ
প্রকাশিত হয়েছে : ৩০ জানুয়ারি ২০২৬, ৮:৫৪:৩০ অপরাহ্ন

জালালাবাদ ডেস্ক : আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে সংবিধানে মৌলিক সংস্কারের পথ খুলবে। সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন ও প্রস্তাবিত পরিবর্তন বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থায় কাঠামোগত পরিবর্তন আসবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এতে প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা কিছুটা কমবে, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং সাংবিধানিক পদে নিয়োগ প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ হবে। সংসদে ভোট প্রদানের ক্ষেত্রে সদস্যদের স্বাধীনতা বৃদ্ধি পাবে এবং ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি হবে।
সংসদীয় সংস্কার প্রক্রিয়ায়, আগামী সংসদ দ্বিকক্ষবিশিষ্ট হবে। সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনা হবে যাতে কোনো একটি দল এককভাবে সংবিধান সংশোধন করতে না পারে। মূলনীতি ও মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা সমন্বিত হবে।
গণভোটের মাধ্যমে জয়ী ‘হ্যাঁ’ ফলাফলের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধন প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন করা হবে। এই প্রক্রিয়া তিন স্তরে সম্পন্ন হবে। প্রথম স্তরে জারি হবে সংবিধান সংস্কার আদেশ, যা ইতোমধ্যেই ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে জারি করা হয়েছে। দ্বিতীয় স্তর হবে গণভোট। গণভোটে হ্যাঁ জয়ী হলে তৃতীয় স্তরে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করা হবে। সংসদ সদস্যরা একই সঙ্গে নিয়মিত সংসদের সদস্য এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। এই পরিষদ ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন করবে।
সংবিধান সম্পর্কিত ৪৮টি প্রস্তাবের মধ্যে ১৯টি মৌলিক সংস্কার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বাকি প্রস্তাবগুলো সরকারি আদেশ, অধ্যাদেশ বা আইন মাধ্যমে বাস্তবায়নযোগ্য। তবে সংবিধান-সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো অধ্যাদেশ বা কোনো আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। এই প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা সীমিত হবে। উদাহরণস্বরূপ, নির্বাচনী কমিশন, ন্যায়পাল, সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি), মহাহিসাব নিরীক্ষক এবং দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বিরোধী দলের মতামতের সুযোগ থাকবে।
প্রধানমন্ত্রীর জন্য বিধান করা হয়েছে, একই ব্যক্তি জীবনে সর্বোচ্চ ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন এবং একই সঙ্গে দলের প্রধান হবেন না। এটি সরকারের নেতৃত্বে ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করবে।
রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাও বৃদ্ধি পাবে। জুলাই সনদের প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে রাষ্ট্রপতি মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল, আইন কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে নিজ এখতিয়ারে নিয়োগ দিতে পারবেন। এটি রাষ্ট্রপতিকে নির্বাহী পর্যায়ে স্বাধীনতা প্রদান করবে।
সংসদে জবাবদিহি বৃদ্ধির জন্য জাতীয় সংসদকে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট করা হবে। উচ্চকক্ষে আনুপাতিক প্রতিনিধি (পিআর) পদ্ধতিতে আসন বরাদ্দ করা হবে। সংবিধান সংশোধনের জন্য নিম্নকক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ এবং উচ্চকক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন প্রয়োজন হবে। এভাবে একক দলে সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা কমবে। সংসদ সদস্যরা আস্থা বা অর্থবিল ছাড়া অন্যান্য বিষয়ে স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবেন। গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় কমিটি এবং কমিটির সভাপতি বিরোধী দলের কাছ থেকে আসবে।
সংসদ ও সরকার কার্যক্রমের বৈধতা নিশ্চিত করার জন্য জুলাই জাতীয় সনদ ও সংবিধান সংস্কার আদেশে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগ হয়েছে। অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন ঘটেছে এবং অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছে। গণভোটে হ্যাঁ জয়ী হলে জুলাই জাতীয় সনদ ও সংবিধান সংস্কার আদেশ বৈধ হবে।
সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে উচ্চকক্ষ গঠন হবে। সংবিধান সংস্কার পরিষদ অনুমোদন দেওয়ার ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে উচ্চকক্ষ গঠন সম্পন্ন হবে। এছাড়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল, নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমাসংক্রান্ত বিধান, বিচার বিভাগ বিকেন্দ্রীকরণ, জরুরি অবস্থা ঘোষণা, প্রধান বিচারপতি নিয়োগ, সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো এবং রাষ্ট্রপতির নির্বাচন পদ্ধতিতে পরিবর্তনও আসবে।
অধ্যাপক আলী রীয়াজ, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রধান এবং বর্তমান প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী, বলেন, সংস্কারগুলো বাস্তবায়িত হলে শাসনব্যবস্থায় কাঠামোগত পরিবর্তন আসবে। ক্ষমতার এককেন্দ্রীকরণ রোধ হবে এবং স্বাধীন প্রতিষ্ঠান তৈরি হবে। জবাবদিহি নিশ্চিত হবে এবং সাংবিধানিক একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ বন্ধ হবে।
সংক্ষেপে, গণভোটে হ্যাঁ জয়ী হলে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ভারসাম্য, সংসদে স্বাধীনতা, উচ্চকক্ষের গঠন এবং বিভিন্ন স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান গঠনসহ বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন আসবে।





