৯১.৭% সহিংসতার সঙ্গে জড়িত বিএনপি, ২০.৭% আ.লীগ : টিআইবি
প্রকাশিত হয়েছে : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৯:১৯:২১ অপরাহ্ন
১৭ মাসে ১৫৮ জন রাজনৈতিক কর্মী নিহত

জালালাবাদ রিপোর্ট : ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ঘটা ৯১.৭ শতাংশ রাজনৈতিক সহিংসতার সঙ্গে বিএনপি জড়িত রয়েছে বলে জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। গতকাল সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) ‘স্বৈরাচারের পতনের দেড় বছর : প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরে সংস্থাটি। টিআইবির গবেষণায় আরও দেখা গেছে, ২০.৭ শতাংশ ঘটনায় আওয়ামী লীগ, ৭.৭ শতাংশ ঘটনায় জামায়াতে ইসলামী, ২.২ শতাংশ ঘটনায় বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন, ১.২ শতাংশ ঘটনায় জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), ০.৮ শতাংশ ঘটনায় জাতীয় পার্টি ও ১.২ শতাংশ ঘটনায় অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সম্পৃক্ততা রয়েছে।
টিআইবি জানায়, বিভিন্ন দলের মধ্যে অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং রাজনৈতিক সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত—এই ১৭ মাসে সারাদেশে মোট ৬০০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে, যাতে ১৫৮ জন রাজনৈতিক কর্মী নিহত এবং ৭ হাজার ৮২ জন আহত হয়েছেন। এই ঘটনাগুলোর মধ্যে ৫৫০টিতে বিএনপির নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে, আর ১২৪টি ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ সদস্যরা জড়িত ছিল। জামায়াতে ইসলামী ৪৬টি, এনসিপি ৭টি, জাতীয় পার্টি ৫টি, বৈষম্য বিরোধী আন্দোলন ১৩টি ও অন্যান্য রাজনৈতিক দল ৭টি ঘটনায় জড়িত ছিল। তবে সর্বশেষ গত ২৮ জানুয়ারি শেরপুরে বিএনপির হামলায় নিহত শ্রীবর্দী উপজেলা জামায়াতাতের সেক্রেটারী মাওলানা রেজাউল করিমের তথ্য এই প্রতিবেদনে উঠে আসেনি।
টিআইবির মতে, সরকার পতনের পর আগে আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণে থাকা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও কার্যক্রমের দখল নেওয়ার চেষ্টাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ ও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। এর মধ্যে রয়েছে পরিবহন টার্মিনাল ও স্ট্যান্ডে চাঁদাবাজি, সিলেটের পাথর কোয়ারি ও নদী থেকে অবৈধ পাথর উত্তোলন এবং ব্রিজ, বাজার, ঘাট, বালু মহাল ও জলাশয়ের ইজারা দখলের লড়াই। গবেষণায় দেখা গেছে যে, রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অনেকাংশেই অকার্যকর ছিল এবং দলগুলো সহিংসতা ও অবৈধ কর্মকাণ্ডে লিপ্ত নিজ কর্মীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে।
এছাড়া শিক্ষাখাতে লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি চলমান বলেও জানিয়েছে টিআইবি। শিক্ষার্থীদের হাত ধরে গড়ে ওঠা ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সরকার পতন ঘটে। জুলাই আন্দোলনের অন্যতম চাওয়া ছিল শিক্ষাখাতে দলীয় লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি বন্ধ করা। অথচ অন্তর্বর্তী সরকার সেই চাওয়া পূরণে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে।
টিআইবির পর্যবেক্ষণ বলছে, দেশের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে এখনো দলীয় লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি চলমান। দুটি খাতের সংস্কার এ সরকারের যথাযথ মনোযোগও পায়নি। পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারকে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতের অংশীজনদের সব মতামতকে অগ্রাহ্য করার প্রবণতা বেশি দেখা গেছে।
পর্যবেক্ষণে বলা হয়, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্থানীয় সরকার খাতের সংস্কার সরকারের যথাযথ মনোযোগ না পাওয়া, এসব খাতে অংশীজনদের মতামতকে অগ্রাহ্য করার প্রবণতা দেখা গেছে। একদিকে, বিভিন্ন খাতে অস্থিরতার পেছনে রাজনীতি ও আমলাতন্ত্রের প্রভাব, অন্যদিকে যৌক্তিক ও অযৌক্তিক আন্দোলনের মুখে দাবি মেনে নেওয়ার প্রবণতা ছিল। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আর্থিকসহ অন্যান্য খাতের সংস্কার উদ্যোগে সিন্ডিকেটে প্রভাব অব্যাহত বলেও উল্লেখ করেছে টিআইবি।
অনুষ্ঠানে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, মব সন্ত্রাস যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে সেটি অন্য সবকিছুর মতো নির্বাচনেও প্রভাব ফেলতে বাধ্য। এ ক্ষেত্রে সরকারেরও দায় আছে। সরকার শুরু থেকে মব সহিংসতা প্রতিরোধে তৎপরতা দেখাতে পারেনি। তিনি বলেন, আর যেন নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা না হয়। তবে সহিংসতার ঝুঁকি শুধু ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন পর্যন্ত নয়, এর পরবর্তী কয়েক দিনও থাকতে পারে। সরকার এই ঝুঁকির বিষয়টি ভালোভাবেই জানে এবং ব্যবস্থা নেওয়ার পূর্ণ ক্ষমতা ও সক্ষমতা তাদের রয়েছে।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, রাজনীতিবিদ ও আমলাতন্ত্র জুলাই আন্দোলন থেকে কোনো শিক্ষা গ্রহণ করেনি। তারা তাদের স্বার্থ বজায় রাখতে চায়। এ কারণে ঐকমত্য কমিশনে জনগণের কাছে জবাবদিহি সরকারব্যবস্থার জন্য যে পদ্ধতিগুলো উপস্থাপন করা হয়েছিল, প্রতিটি ক্ষেত্রে তাদের আপত্তি ছিল।
নোট অব ডিসেন্টের মৌলিক কনসেপ্ট ধারণ করলে আপত্তি থাকলেও যেসব বিষয়ে ঐকমত্য বা সিদ্ধান্ত হয়েছে, সেটিই বাস্তবায়িত হবে বলে মন্তব্য করেন ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠদের মতামতকে প্রাধান্য দেওয়ার রীতি বিশ্বব্যাপী প্রচলিত আছে। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এমনটি হবে কি না, সেটি দেখার বিষয়। গণভোটের রায় ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে গেলে সে ক্ষেত্রে যারা সরকারে যাবে, তাদের সদিচ্ছার ওপর সংস্কার বাস্তবায়ন নির্ভর করবে।
সরকারের সম্প্রচার কমিশন অধ্যাদেশ ও গণমাধ্যম কমিশন অধ্যাদেশ নিয়ে সমালোচনা করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক। এক প্রশ্নের জবাবে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, মিডিয়া বিশেষভাবে সরকার কর্তৃক উপেক্ষিত হয়েছে এবং মিডিয়ার প্রতি নতুন করে ঝুঁকি সৃষ্টি করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সরকারের ভেতরের ও বাইরের শক্তি কাজ করেছে। বাইরের শক্তিকে সরকারই অতিক্ষমতায়িত করেছে।
ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিচারক নিয়োগ কমিটি, স্বাধীন বিচার বিভাগ সচিবালয়ের মতো কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে সচিবালয় কতটুকু কার্যকর হবে, তার জবাব পরবর্তী সরকারকে দিতে হবে। এ ছাড়া বিচারব্যবস্থার ভেতরে দলীয়করণ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। গণতান্ত্রিক সংস্কার সফল করতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও পেশাজীবী সংগঠনগুলোকে রাজনীতিমুক্ত করার বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর দৃঢ় অঙ্গীকার প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন ইফতেখারুজ্জামান।





