যুক্তরাজ্যে দারিদ্র্য ও সরকারি সুবিধা নেয়ার শীর্ষে বাংলাদেশী অভিবাসীরা
প্রকাশিত হয়েছে : ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৯:২৫:৫১ অপরাহ্ন

জালালাবাদ ডেস্ক : যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে দারিদ্র্যের হার ও সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরতায় শীর্ষে বাংলাদেশী অভিবাসীরা। এমন তথ্য উঠে এসেছে সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণা ও দেশটির সরকারি পরিসংখ্যানে।
সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের দাতব্য এবং সামাজিক নীতি গবেষণা সংস্থা জোসেফ রাউন্ট্রি ফাউন্ডেশনের (জেআরএফ) এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, যুক্তরাজ্যে বসবাসরতদের মধ্যে দারিদ্র্যের হারে সবচেয়ে এগিয়ে বাংলাদেশীরা। দেশটিতে বসবাসরত বাংলাদেশীদের অর্ধেকেরও বেশি দারিদ্র্যের শিকার। প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যের সামগ্রিক গড় দারিদ্র্যের হার ২১ শতাংশ। তবে বাংলাদেশীদের ক্ষেত্রে এ হার ৫৩ শতাংশ। দেশটির গড় দারিদ্র্যের তুলনায় বাংলাদেশী পরিবারগুলোর মধ্যে দারিদ্র্যের হার দ্বিগুণেরও বেশি। আর শ্বেতাঙ্গ পরিবারগুলোর তুলনায় এ হার প্রায় ২ দশমিক ৯ গুণ। শ্বেতাঙ্গ পরিবারগুলোর মধ্যে দারিদ্র্যের হার ১৮ শতাংশ। এমনকি এশিয়া ও আফ্রিকার অন্যান্য দেশের অভিবাসীদের তুলনায়ও বাংলাদেশী অভিবাসীদের মধ্যে দারিদ্র্যের হার বেশি। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানি পরিবারগুলোতে দারিদ্র্যের হার ৪৯ শতাংশ, চীনা পরিবারগুলোর মধ্যে দারিদ্র্যের হার ৩৬ শতাংশ এবং ভারতীয় পরিবারগুলোতে এ হার ২৬ শতাংশ।
এছাড়া চরম দারিদ্র্যের (যেসব পরিবারের আয় রাষ্ট্রীয় গড় আয়ের ৪০ শতাংশ কম) ক্ষেত্রেও বাংলাদেশীরা তালিকার শীর্ষে অবস্থান করছে। শ্বেতাঙ্গ পরিবারগুলোতে চরম দারিদ্র্যের হার ৮ শতাংশ হলেও বাংলাদেশী পরিবারগুলোর মধ্যে চরম দারিদ্র্যের হার প্রায় ২৩ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি চারজন বাংলাদেশীর মধ্যে একজন চরম দারিদ্র্যের শিকার। পাকিস্তানি পরিবারগুলোর মধ্যে চরম দারিদ্র্যের হার ২০ শতাংশ, আর অন্যান্য এশীয় পরিবারগুলোর মধ্যে এ হার ২০ শতাংশ।
দারিদ্র্যের সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে বাংলাদেশী শিশুদের ক্ষেত্রে। যেখানে শ্বেতাঙ্গ শিশুদের মধ্যে দারিদ্র্যের হার ২৪ শতাংশ, সেখানে বাংলাদেশী শিশুদের ৬৫ শতাংশই দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। আর অন্তত ২৮ শতাংশ বাংলাদেশী শিশু চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বেড়ে উঠছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘমেয়াদি চরম দারিদ্র্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশীরা শ্বেতাঙ্গদের তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ বেশি ঝুঁকির সম্মুখীন।
২০১১ থেকে ২০২৩ সালের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ১১ শতাংশ বাংলাদেশী পরিবার দীর্ঘমেয়াদি চরম দারিদ্র্যের শিকার, যেখানে শ্বেতাঙ্গদের ক্ষেত্রে এ হার মাত্র ২ শতাংশ। শিশুদের ক্ষেত্রে এ হার ১৩ শতাংশ। প্রতিবেদনে এ উচ্চ হারের দারিদ্র্যের পেছনে কর্মসংস্থানের অভাব এবং পরিবারের গঠনগত ধরনকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ৬৮ শতাংশ বাংলাদেশী কর্মক্ষম প্রাপ্তবয়স্ক এমন পরিবারে বাস করেন, যেখানে সব সদস্য কাজে নিয়োজিত নন, শ্বেতাঙ্গদের মধ্যে এ হার ৩৭ শতাংশ। পরিবারের বড় আকার (তিন বা ততোধিক সন্তান) এবং লন্ডনের মতো ব্যয়বহুল শহরগুলোতে উচ্চ আবাসন ব্যয়ের কারণে নিম্ন মজুরির খাতে কর্মরতদের আয়ের একটি বড় অংশ আবাসন ও নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয়ে চলে যায় এবং আর্থিক সংকট বৃদ্ধি পায়।
এদিকে এ দারিদ্র্যের ফলে বাংলাদেশীদের বড় অংশই সরকারি সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। ২০২২ সালে যুক্তরাজ্য সরকার বিভিন্ন জনগোষ্ঠীকে প্রদানকৃত সরকারি সহযোগিতার বিষয়ে তথ্য প্রকাশ করে। সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত সরকারি সহযোগিতা গ্রহণের ক্ষেত্রে শীর্ষে ছিল বাংলাদেশীরা। তিন বছরে ৫২ শতাংশ বাংলাদেশী কোনো না কোনো ধরনের সরকারি সহযোগিতা গ্রহণ করেছে। এ তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশীদের তুলনায় অন্য জনগোষ্ঠীরা কম সরকারি সহযোগিতা গ্রহণ করেছে। এ সময়ে পাকিস্তানিদের মধ্যে ৪৮ শতাংশ, ভারতীয়দের মধ্যে ৩৯ শতাংশ, চীনাদের মধ্যে ২৫ শতাংশ, অন্যান্য এশীয়দের মধ্যে ৩৯ শতাংশ আর কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে ৪০ শতাংশ সরকারি সহযোগিতা গ্রহণ করেছে।
সম্প্রতি বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের জন্য অভিবাসন প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। যেসব কারণে এ কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে তার মধ্যে অভিবাসীদের সরকারি সুবিধা গ্রহণের বিষয়টিও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসীদের মধ্যে কোন দেশের নাগরিকরা বেশি সরকারি সহায়তা (ওয়েলফেয়ার) নিচ্ছেন, তার একটি তালিকা জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে প্রকাশ করেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ ওই তালিকা প্রকাশ করেছিলেন তিনি। ১২০টি দেশ ও অঞ্চলের ওই তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৯তম। ‘ইমিগ্র্যান্ট ওয়েলফেয়ার রেসিপিয়েন্ট রেটস বাই কান্ট্রি অব অরিজিন’ শিরোনামের ওই তালিকায় দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশী অভিবাসী পরিবারগুলোর ৫৪ দশমিক ৮ শতাংশই সরকারের কাছ থেকে সুবিধা নিয়ে থাকে।
এ তালিকা প্রকাশের একদিন পরই যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশসহ ২৫টি দেশকে ভিসা বন্ড শর্তযুক্ত দেশের তালিকায় যুক্ত করে। এ নিয়ে তালিকায় মোট দেশের সংখ্যা হয়েছে ৩৮টি। তালিকায় থাকা দেশগুলোর ভ্রমণকারীদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করার আগে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার ডলার (প্রায় ১৮ লাখ ৩৫ হাজার টাকা) পর্যন্ত বন্ড (জামানত) জমা দিতে হবে বলে জানিয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর। যুক্তরাজ্যেও সরকারি সুবিধা গ্রহণকারীদের ক্ষেত্রে বাংলাদেশীরা এগিয়ে থাকায় যুক্তরাজ্যও এ ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অভিবাসনসংশ্লিষ্টরা। এরই মধ্যে দেশটি অভিবাসন নীতি কঠোর করতে পারে এমন আলাচনা রয়েছে।





