নির্বাচনে বিচারিক ক্ষমতা পেলেন হাসিনার ভোটের দুই শতাধিক কর্মকর্তা
প্রকাশিত হয়েছে : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৯:১৫:৩০ অপরাহ্ন
জালালাবাদ ডেস্ক : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার জন্য ১ হাজার ৫১ কর্মকর্তাকে বিচারিক ক্ষমতা দিয়েছে সরকার। মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) জনপ্রশাসন থেকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিয়োগ পাওয়া এসব কর্মকর্তার মধ্যে এমন দুই শতাধিক কর্মকর্তা রয়েছেন, যারা শেখ হাসিনার আমলের ‘রাতের ভোট’ (২০১৮) ও ‘আমি-ডামি নির্বাচনে’ (২০২৪) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় ছিলেন। এ ছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী-সচিবদের পিএস-এপিএস হিসেবে দায়িত্বপালনকারী, ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত এবং আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত একাধিক কর্মকর্তাও রয়েছেন তালিকায়।
বিষয়টি স্বীকার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মিঞা মুহাম্মদ আশরাফ রেজা ফরিদী বলেন, লোকবলের অভাবে অভিযুক্তদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আমরা প্রায় ১ হাজার জনের মতো তালিকা দিয়েছি। সাধারণত সহকারী সচিব থেকে সিনিয়র সহকারী সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তারা এই দায়িত্বপালন করেন। নির্বাচন কমিশন থেকে আমাদের বলা হয়েছে, প্রতি আসনে ১০ জন করে ম্যাজিস্ট্রেট দিতে। অর্থাৎ ৩০০ আসনে আমাদের তিন হাজার ম্যাজিস্ট্রেট লাগবে। কিন্তু এই পদমর্যাদার মোট অফিসারই আছেন আমাদের দুই থেকে আড়াই হাজারের মতো। এর মধ্যে ১ হাজার ১০০ জন ইতোমধ্যে মাঠে রয়েছেন। ফলে নির্বাচন কমিশনের চাহিদা মেটাতে আমাদের আরও ২ হাজার অফিসার দরকার ছিল। কিন্তু আমরা সব খুঁজেও ১ হাজার ২০০ জনের বেশি অফিসার পাইনি। ফলে উপায় না পেয়ে নিয়োগ দিতে হয়েছে।
গত ১২ অক্টোবরে সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী ঘোষণা দেন, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে দায়িত্বপালনকারীদের ত্রয়োদশ নির্বাচনে বিরত রাখা হবে।
বিচারিক ক্ষমতা পেলেন যে বিতর্কিত কর্মকর্তারা : প্রাথমিকভাবে যাচাই করে বিতর্কিত ১৮ কর্মকর্তার বিস্তারিত তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। প্রজ্ঞাপনের ৫১ নম্বরে রয়েছে জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের (নিপোর্ট) উপপরিচালক ফয়সাল হকের নাম। তিনি ২০২৪ সালের নির্বাচনে গাজীপুর সদরে সহকারী রিটার্নিং অফিসারের দায়িত্বে ছিলেন। ২১৭ নম্বরে থাকা দিপন দেবনাথ সাবেক মুখ্যসচিব এবং শেখ হাসিনার উপদেষ্টা কামাল আবদুল নাসের চৌধুরীর একান্ত সচিব ছিলেন। সাবেক সচিব আবদুল মালেকের সাবেক পিএস ফেরদৌস ওয়াহিদের নাম আছে ৩০৯ নম্বরে। তিনি ২০২৪ সালের নির্বাচনে কোটালীপাড়ার সহকারী রিটার্নিং অফিসার ছিলেন। ছাত্রজীবনে ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ করতেন ফেরদৌস। ৫ আগস্ট থেকে পলাতক সাবেক মুখ্যসচিব তোফাজ্জল হোসেন মিয়ার সাবেক একান্ত সচিব সায়েদুল আরেফিনের নাম আছে প্রজ্ঞাপনে ৪০১ নম্বরে। প্রজ্ঞাপনে ৪৯২ নম্বরে রয়েছেন পিন্টু বেপারী। তিনি নির্বাচন কমিশনের বিতর্কিত সচিব হেলাল উদ্দীন আহমেদের পিএস ছিলেন। পিন্টুকে এর আগে ভোলা জেলা পরিষদে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়। ৪৯৮ নম্বরে থাকা বারিউল করিম খান হাসিনার আমলে জনপ্রশাসনের সিনিয়র সচিব মেজবাহ উদ্দিন চৌধুরীর একান্ত সচিব ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক নেতা ও ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু কামরুল হাসান সোহেল আছেন ৫১১ নম্বরে। ৩৪ বিসিএস ব্যাচের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সোহেল আওয়ামী লীগ আমলে নিজের প্রভাব বাড়াতে সরকারি চাকরি করেও শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে বই লিখেছিলেন। আওয়ামী লীগের সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ এ আরাফাতের একান্ত সচিব তৌহিদ এলাহীর নাম রয়েছে ৫৩১ নম্বরে। ৫৬৮ নম্বরে থাকা নাহিয়ান আহমেদ ছিলেন সালমান এফ রহমানের এপিএস।
২০১৮ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের জেলা প্রশাসক মতিউল ইসলাম চৌধুরীর (বর্তমানে ওএসডি) আপন ছোট ভাই জিয়াউল ইসলাম চৌধুরীর নাম রয়েছে ৫৮৪ নম্বরে। ৬০৬ নম্বরে থাকা পারভেজুর রহমান শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের প্রভাবশালী নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি ৩০ বিসিএস ব্যাচের সাবেক সভাপতি। সাভার উপজেলার সাবেক এই ইউএনও ২০১৮ সালের নির্বাচনে সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্বে ছিলেন টাঙ্গাইল সদরে। আওয়ামী লীগের পলাতক মাহবুবুল আলম হানিফের আত্মীয় এবং কুষ্টিয়ার প্রভাবশালী আওয়ামী পরিবারের সদস্য রিফাত ফেরদৌস রয়েছেন প্রজ্ঞাপনের ৬০৯ নম্বরে। ৬১২ নম্বরে থাকা হোসাইন মোহাম্মদ হাই জকী জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক শীর্ষ নেতা। ৩৩ বিসিএস ব্যাচের সাবেক সভাপতি। ২০২৪ সালের নির্বাচনের গাজীপুরের কালিয়াকৈর আসনে সহকারী রিটার্নিং অফিসারের দায়িত্বে ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রলীগ নেতা এবং ৩৫ বিসিএস ব্যাচের সাবেক সভাপতি ৭৮৮ নম্বরে থাকা মো. আদনান চৌধুরী। ১০১৫ নম্বরে আছেন মো. আব্দুল্লাহ আল মাহফুজ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক শীর্ষ নেতা। ৩৪ বিসিএস ব্যাচের সাবেক সভাপতি এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় সহকারী রিটার্নিং অফিসার ছিলেন।





