সুনামগঞ্জের ৫টি আসনে ভোটের লড়াই তুঙ্গে
প্রকাশিত হয়েছে : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৬:০০:৪২ অপরাহ্ন
♦২টিতে বিদ্রোহীদের চাপে বিএনপি ♦৩টিতে বিএনপি-জামায়াত দ্বিমুখী লড়াইয়ের আভাস

এমজেএইচ জামিল : ভোটের বাকী মাত্র ৩ দিন। শেষ মুহুর্তের প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন হাওরপাড়ের প্রার্থীগণ। দিনরাত চলছে বিরামহীন প্রচারণা। সাথে প্রতিশ্রুতির ফুলঝুড়ি। সবমিলিয়ে সুনামগঞ্জের ৫টি আসনে ভোটের লড়াই তুঙ্গে। দীর্ঘদিন পর পতিত আওয়ামী লীগ ব্যতিত বাকী সবদলের অংশগ্রহণে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হতে যাচ্ছে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতামুলক।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সুনামগঞ্জের ৫টি আসনের মধ্যে ২টিতে বিএনপির বিদ্রোহী (বহিস্কৃত) প্রার্থীদের চাপে রয়েছেন খোদ বিএনপির প্রার্থীগণ। বহিস্কারেও বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা থেকে বিরত রাখা যাচ্ছেনা নেতাকর্মীদের। ফলে দিন দিন বিদ্রোহী প্রার্থীদের ভোটের মাঠ ভালো হচ্ছে। বাকী ৩টি আসনে বিএনপি ও জামায়াত প্রার্থীদের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। বিজয়ী হলেও ভোটের ব্যবধান তেমন বেশী হবেনা বলেও মন্তব্য করেছেন কেউ কেউ।
এদিকে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ না নেয়ায় তাদের নেতাকর্মীদের ভোট টানতে বিভিন্ন কৌশলে এগুচ্ছে বিএনপি ও জামায়াত। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতাকর্মীরা কাদের দ্বারা বেশী হয়রানী, হামলা-মামলার শিকার হয়েছেন- সে টি সামনে আনছেন অনেকেই। ফলে একক কোন দল বা প্রার্থীর পক্ষে আওয়ামী লীগের ভোট যাবেনা বলেই বলছে মাঠের খবর। তাই আগামী নির্বাচনে যারাই আওয়ামী লীগের ভোট বেশী টানতে পারবে তারাই জয়ী হবে। দীর্ঘ ২ যুগেরও বেশী সময় এক সাথে নির্বাচন ও আন্দোলন করার ফলে বিএনপি ও জামায়াতের নিজস্ব ভোট ব্যাংক ঠিক কতো সেটিও নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছেনা। ফলে এবারের নির্বাচনের হিসাব বড়ই জটিল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জানা গেছে, সুনামগঞ্জে বিএনপির মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়া বিদ্রোহীরা ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থীদের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন। একদিকে জামায়াতকে মোকাবিলা অন্যদিকে দলের অভ্যন্তরীণ বিবাদ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন নেতারা। জেলার পাঁচ আসনের মধ্যে দুটিতে ত্রিমুখী ও দুটিতে দ্বিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে। সুনামগঞ্জ-১, ২ ও ৫ আসনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে। আর সুনামগঞ্জ-৩ ও ৪ আসনে বিএনপি, জামায়াত জোট ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের নিয়ে ত্রিমুখী লড়াই জমে উঠতে পারে। সুনামগঞ্জ জেলায় মোট ভোটার ২০ লাখ ৮০ হাজার ৩৩৫ জন।
সুনামগঞ্জ-১ (জামালগঞ্জ, তাহিরপুর, ধর্মপাশা ও মধ্যনগর) :
জামালগঞ্জ, তাহিরপুর, ধর্মপাশা ও মধ্যনগর নিয়ে গঠিত আসনটিতে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপির কামরুজ্জামান কামরুল এবং জামায়াতের মাওলানা তোফায়েল আহমদের মধ্যে। এর বাইরে নেজামে ইসলাম থেকে বই প্রতীকে নির্বাচন করছেন মুজাম্মিল হক। আসনে বিএনপির প্রাথমিক মনোনয়ন পেয়েছিলেন আনিসুল হক। তবে শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত মনোনয়ন পান কামরুজ্জামান কামরুল। তাঁর জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী নেতা-কর্মীরা। একদিকে বিএনপি প্রার্থী কামরুজ্জামানের কামরুলের জনপ্রিয়তা অপরদিকে জামায়াত প্রার্থী মাওলানা তোফায়েল আহমদ খানের ব্যক্তিত্ব ও শক্তিশালী সাংগঠনিক কার্যক্রম। এই দুটির মধ্যে কোনটি বেছে নিবেন ভোটার, শেষ মুহুর্তে চলছে এই হিসাব। এদিকে আনিসুল হককে প্রথমদিকে মনোনয়ন দিয়ে পরবর্তীতে প্রার্থী পরিবর্তনের ফলে তার সমর্থকদের ভোট কোন দিকে যাবে সেটি নিয়েও দেখা দিয়েছে সংশয়। যদিও আনিসুল হক বিএনপির প্রার্থী কামরুজ্জামানের পক্ষে ভোটের মাঠে সক্রিয় রয়েছেন।
সুনামগঞ্জ-২ (দিরাই ও শাল্লা) :
দিরাই ও শাল্লা নিয়ে গঠিত আসনটিতে জামায়াতের হেভিওয়েট নেতা আইনজীবী শিশির মনির। বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন বর্ষীয়ান নেতা সাবেক এমপি নাছির উদ্দিন চৌধুরী। দুজনের পক্ষেই প্রচারে নেমেছেন নেতা-কর্মীরা। ভোটাররা বলছেন, মূলত তাঁদের দুজনের মধ্যেই হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। এর বাইরে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি থেকে কাস্তে প্রতীকে নির্বাচন করছেন নিরঞ্জন দাস। দিরাই উপজেলায় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্টতা থাকলেও শাল্লা উপজেলায় রয়েছে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্টতা। ফলে আসনটিতে ভোটের ভিন্ন হিসাব বিরাজ করছে। এছাড়া আওয়ামী লীগের তৃণমূল ভোটারের দিকে রয়েছে উভয় প্রার্থীর দৃষ্টি। তাদের ভোট টানতে নিচ্ছেন নানা কৌশল। বিএনপির প্রার্থী নাছির উদ্দিন চৌধুরী প্রবীণ ও বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ হলেও তাঁর শারীরিক অবস্থার কারণে সচেতন অনেক ভোটারের ভোট থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। এক্ষেত্রে জামায়াত প্রার্থী তরুণ আইনজীবী শিশির মনির নানা কার্যক্রমের মাধ্যমে ইতোমধ্যে দিরাই-শাল্লা নিয়ে তার কর্মপদ্ধতি ও বাস্তবমূখী পরিকল্পনার মাধ্যমে শক্ত অবস্থান তৈরী করতে সক্ষম হয়েছেন।
সুনামগঞ্জ-৩ (জগন্নাথপুর ও শান্তিগঞ্জ) :
এবারের নির্বাচনে প্রবাসী-অধ্যুষিত জগন্নাথপুর ও শান্তিগঞ্জ নিয়ে গঠিত সুনামগঞ্জ-৩ আসনে ৭জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও শেষ মুহুর্তে বিএনপি ও বিএনপি বিদ্রোহী প্রার্থীর মধ্যে দ্বিমূখী লড়াই জমে উঠেছে। জামায়াত ও ১১ দলীয় জোটের একক প্রার্থী না থাকায় জোটের ৩টি শরিক দল থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ৩ জন। এতে পাল্লা ভারী হচ্ছে বিএনপির বিদ্রোহী (বহিস্কৃত) স্বতন্ত্র প্রার্থীর।
আসনটিতে ধানের শীষের প্রার্থী যুক্তরাজ্য বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক কয়ছর এম আহমদ। স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচন করছেন বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত আনোয়ার হোসেন (তালা)। ১১ দলীয় জোটের শরিক দল বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের শাহীনুর পাশা চৌধুরী (রিকশা), এবি পার্টির সৈয়দ তালহা আলম (ঈগল) ও খেলাফত মজলিসের মাওলানা মুশতাক আহমদ (দেয়াল ঘড়ি) মার্কায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। যদিও সর্বশেষ গতকাল নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন তিনি। ফলে এখন জোটের ভোট ২ ভাগ হচ্ছে। এতে লাভবান হচ্ছেন বিএনপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থী। তবে শেষ মুহুর্তে ১১ দলীয় জোট থেকে একক প্রার্থী নির্ধারিত হলে কপাল খুলতে পারে জোটের প্রার্থী শাহীনুর পাশা চৌধুরীর। এতে লড়াই হতে পারে ত্রিমুখী। কারণ আসনটিতে জামায়াতের পাশাপাশি সৈয়দ তালহা আলমের একটা নিজস্ব ভোট ব্যাংক রয়েছে। সব ভোট এক বাক্সে পড়লে বদলে যেতে পারে ভোটের হিসাব। যদিও এমন কোন উদ্যোগ কিংবা সম্ভাবনা এখন পর্যন্ত চোখে পড়ছেনা। ফলে সিদ্ধান্তহীনতায় ১১ দলীয় জোটের সমর্থক ও ভোটাররা।
সুনামগঞ্জ-৪ (সদর ও বিশ্বম্ভরপুর) :
সুনামগঞ্জ সদর ও বিশ্বম্ভরপুর নিয়ে গঠিত আসনটিতে ধানের শীষের প্রার্থী জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাঠের নেতা খ্যাত সাবেক জনপ্রিয় ছাত্রনেতা এডভোকেট নূরুল ইসলাম নূরুল। এই আসনে মনোনয়নবঞ্চিত হয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন হাসন রাজার বংশধর দেওয়ান জয়নুল জাকেরীন (মোটরসাইকেল)। সুনামগঞ্জে বিএনপির বহিষ্কৃত এই নেতার রয়েছে নিজস্ব ভোটব্যাংক আছে। দলীয় ও বিদ্রোহী প্রার্থীর দ্বন্দ্বে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন জামায়াত প্রার্থী এডভোকেট মো. শামছ উদ্দিন। আসনটিতে জাতীয় পার্টি থেকে এডভোকেট নাজমুল হুদা ও ইসলামী আন্দোলন থেকে শহীদুল ইসলাম নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। তবে বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় আসনটিতে বিএনপিকে বেগ পেতে হবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। একদিকে বিএনপির প্রার্থী এডভোকেট নুরুল ইসলাম নুরুলের মাঠের সক্রিয় রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হচ্ছে বিদ্রোহী প্রার্থী দেওয়ান জয়নুল জাকেরিনের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা। শেষ মুহুর্তে দল ও বিদ্রোহীর চাপে জামায়াত প্রার্থী কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে।
সুনামগঞ্জ-৫ ( ছাতক ও দোয়ারাবাজার) :
ছাতক ও দোয়ারাবাজার উপজেলা নিয়ে গঠিত আসনটিতে ধানের শীষের প্রার্থী বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও জেলা আহ্বায়ক কলিম উদ্দিন আহমেদ মিলন। আসনটিতে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী শীর্ষ স্থানীয় আলেমে দ্বীন শায়খ অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুস সালাম আল মাদানী। আসনটিতে খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মোহাম্মদ আব্দুল কাদির, জাতীয় পার্টির প্রার্থী মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম এবং ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (এনপিপি) প্রার্থী মো. আজিজুল হক মাঠে থাকলেও, মূল লড়াই হবে বিএনপি ও জামায়াত প্রার্থীর মধ্যে। আসনটিতে বিএনপির জনপ্রিয় প্রার্থী ছিলেন মিজানুর রহমান চৌধুরী। তবে দল থেকে মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে মনোনয়ন জমা দিয়েছিলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের অনুরোধে মনোনয়ন প্রত্যাহার করেন। যদিও তিনি বিএনপি প্রার্থীর পক্ষে মাঠে সক্রিয় রয়েছেন, তবুও দলের নেতাকর্মী ছাড়াও ব্যক্তি মিজান চৌধুরীর কিছু সাধারণ সমর্থক ও শুভাকাঙ্খী রয়েছেন। তাদের ভোট শেষ পর্যন্ত কোন দিকে যাবে সেটা নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছেনা। এছাড়া আওয়ামী লীগের ভোটারদের ভোট যিনিই টানতে পারবেন তিনিই হাসবেন শেষ হাসি।
জেলা নির্বাচন অফিসের তথ্যমতে, পাঁচটি আসনে মোট ভোটার ২০ লাখের বেশি। হাওরাঞ্চল হওয়ায় ৩২৩টি কেন্দ্রকে দুর্গম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ভোট গ্রহণে দায়িত্ব পালন করবেন ১৪ হাজারের বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারী।
জামায়াত নেতারা বলছেন, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজিবিরোধী অবস্থানের কারণে তারা জনসমর্থন পাচ্ছেন। বিএনপি নেতাদের দাবি, শেষ পর্যন্ত পাঁচটি আসনেই তাদের প্রার্থীরা বিজয়ী হবেন। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনে নীরব ভোটারদের সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে।





