শীতের শেষ লগ্নে বসন্তের সুবাতাস!
প্রকাশিত হয়েছে : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২:২৮:০৮ অপরাহ্ন
দীর্ঘ বছর পর প্রতিদ্বন্ধিতাপূর্ণ নির্বাচন

আহবাব মোস্তফা খান :
একটি নতুন ভোর ও একটি আকাঙ্খিত সূর্যোদয় হলো দেশে। দীর্ঘ বছর পর দেখা মিললো একটি প্রতিদ্বন্ধিতাপূর্ণ ও আনন্দমুখর নির্বাচনের। সূচনা হলো গণতন্ত্রের পথে নতুন যাত্রা…।
সেনাবাহিনীর অনবদ্য ভূমিকা, অন্তর্বর্তী সরকারের দৃঢ়তা ও বিএনপি-জামায়াত জোটের স্বত:স্ফূর্ততায় বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হলো ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট। বিচ্ছিন্ন কয়েকটি ঘটনা ছাড়া সার্বিকভাবে ভোট ছিল শান্তিপূর্ণ।
সম্প্রীতির নগর সিলেটে ভোটের দিনের শেষ বেলায়ও পরিবেশ ছিলো সম্প্রীতিতে ভরা। বিএনপি-জামায়াতের একাধিক প্রার্থীর কোলাকোলি ও কুশল বিনিময়ের চিত্র ভাসছিলো প্রশংসায়। শীতের শেষ লগ্নে প্রীতিতে পূর্ণ এ ভোট যেন বসন্তের সুবাতাস নিয়ে এলো।
নির্বাচনে হ্যাঁ ভোটের জয় হয়েছে। নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছে বিএনপি জোট। জামায়াতও ইতিহাসের সেরা ফল পেয়েছে। ফলের আগে কিংবা পরে কোন জোটকেই আক্রমণাত্বক ভঙ্গিমায় দেখা যায়নি।
এমন চিত্র দেখে উচ্ছ্বসিত প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস মুহাম্মদ বললেন, আজ নতুন বাংলাদেশের জন্মদিন। আজ তাঁর জীবনের মহাআনন্দের দিন। মুক্তির দিন। দুঃস্বপ্নের অবসান, নতুন স্বপ্নের শুরুর দিন। সবার উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘ঈদ মোবারক’।
আর সিইসি নাসির উদ্দীন বললেন, ঐতিহাসিক ভোট গ্রহণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ গণতন্ত্রায়ণের ট্রেনে উঠে গেছে। সন্ধ্যা রাতে আরো একধাপ এগিয়ে জামায়াত আমীর ডা. শফিকুর রহমান বললেন, এই নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক, কেউ মেনে না নিলেও জামায়াত মেনে নেবে।
উচ্ছ্বাসে ভরা এসব কথামালার মাঝে উৎসবের দেখা মিললো সিলেটের বিভিন্ন ভোটকেন্দ্র ঘুরেও। সিলেট নগরের বখতিয়ার বিবি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে দেখা যায়, সকাল ১০টার মধ্যে ২৯২৫ ভোটের মধ্যে ৫০০ ভোট পড়েছে। ৮৫ নং শাহমির প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রিজাইডিং অফিসার আবু নসর মো: মুজিবুল্লাহ জানালেন, সকাল সাড়ে ১০টার মধ্যেই পুরুষ বুথে ভোট পড়েছে ২৫ শতাংশ। অধর নারী বুথে ২৬ শতাংশের মতো।
নগরের আনোয়ার মতিন একাডেমীরর প্রিজাইডিং অফিসার আবু মুসা তারেক জানালেন, বেলা দেড়টার মধ্যে ভোট পড়েছে সাড়ে ৩৬ শতাংশ।
সদর উপজেলার ভাদেশ্বর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রিজাইডি অফিসার বায়েজিদ ভুঁইয়া জানালেন, বেলা সাড়ে ১১টার মধ্যে ভোট পড়েছে ৩১.৭২ শতাংশ।
রাগিব রাবেয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সব ভোটর চা শ্রমিক। এই কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার রফিক আজাদ জানান, দুপুর ১২টার মধ্যে ভোটের হার ৩৫ শতাংশ। যে চা শ্রমিকদের ভোটে আসা নিয়ে শঙ্কা ছিলো, তারাও ভোটের উৎসবে যোগ দিলেন অসীম আগ্রহে।
সিলেট ছাড়াও অন্য চার জেলার চিত্রও প্রায় এক। সেখানেও সাত-সকালে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ভোটার উপস্থিতি দেখা গেছে। নগরের চেয়ে গ্রামের ভোটার উপস্থিতি দেখা গেছে বেশি। বিএনপি প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, কেন্দ্রে ভোটারদের উপস্থিতি প্রমাণ করে ভোট উৎসবই হচ্ছে এবং জনগণ এবার স্বাধীনভাবেই তাদের মতামত ব্যক্ত করতে পারছেন।
কেন্দ্রে কেন্দ্রে ভোটারদের উপস্থিতি দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেন সিলেট-১ আসনের জামায়াত প্রার্থী মাওলানা হাবিবুর রহমান। তিনি বলেন, ভোটের পরিবেশ ভালো। উৎসবমুখর পরিবেশেই ভোটগ্রহণ হচ্ছে।
সকালে সিলেটের কাজিরবাজার ভোট কেন্দ্রে কথা হয় সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার আব্দুল কুদ্দুছ চৌধুরীর সঙ্গে। তিনিও ভোটারের উপস্থিতি ও ভোটের পরিবেশ দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেন। ভোটারের উপস্থিতি নিয়ে দুপুরেও সন্তুষ্টির বিষয়টি সাংবাদিকদের জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা সরওয়ার আলম।
এদিকে, এবারই প্রথম একই সঙ্গে ভোটাররা সংবিধানের বেশ কিছু মৌলিক পরিবর্তন আনার প্রস্তাবের পক্ষে-বিপক্ষে ‘হ্যাঁ’-‘না’ ভোট দিয়ে নিজেদের মত জানালেন। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে তা হবে সংবিধানের মৌলিক সংস্কার বাস্তবায়নের সূচনা।
শুধু কী সুন্দর ভোটের সূচনা? সূচনা হয়েছে নতুন রাজনীতিরও। ফল প্রকাশের আগেই হার মেনে নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে অভিনন্দনের উষ্ণতায় ভাসাতে দেখা গেছে। সুনামগঞ্জ-২ আসনের এডভোকেট শিশির মনির হেরেও ফুল ও মিষ্টি নিয়ে গেছেন নাসির চৌধুরীর বাড়িতে ।
সিলেট-১ আসনের বিজয়ী খন্দকার মুক্তাদির মিষ্টি নিয়ে গেছেন পরাজিত প্রার্থী মাওলানা হাবিবুর রহমানের বাসায়। অন্য এলাকাগুলিতেও এমন চিত্র দেখা গেছে।
আজ মাঘের শেষ দিন অর্থাৎ এবারের মতো শীতকালের ইতি। শীতের বিদায়লগ্নে প্রকৃতিতে বসন্তের সুবাতাস বয়ে যায়, যা উষ্ণ তাপমাত্রা এবং পলাশ-শিমুল ফুলের আগমনের বার্তা নিয়ে আসে। সকালের কুয়াশা কমে গিয়ে হালকা উষ্ণ রোদ এবং বিকেলে মৃদু হাওয়ায় প্রকৃতির রূপ বদলাতে শুরু করে। একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও সম্প্রীতির আলোয় উদ্ভাসিত ভোটে বিজয়ীদের দ্বারা দেশের চিত্রটাও বদলাবে-এমন প্রত্যাশাই ভোটারদের।





