এমপি-মন্ত্রীদের শপথ মঙ্গলবার
প্রকাশিত হয়েছে : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৯:৩৫:৫৭ অপরাহ্ন
প্রস্তুত সংসদ সচিবালয়

জালালাবাদ রিপোর্ট : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের সবধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে জাতীয় সংসদ সচিবালয়। সংসদ ভবনের ভেতর ও বাইরে পরিচ্ছন্নতা, রক্ষণাবেক্ষণ, প্রয়োজনীয় সংস্কার ও অবকাঠামোগত কাজ শেষ হয়েছে। মঙ্গলবার শপথ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিব কানিজ মওলা গণমাধ্যমকে বলেন, প্রস্তুতি অনেক আগেই শুরু হয়েছে। এটি আমাদের নিয়মিত দায়িত্বের অংশ। যেদিন নির্দেশনা পাওয়া যাবে, সেদিনই শপথ অনুষ্ঠান আয়োজন করা সম্ভব। সংসদ সচিবালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, মঙ্গলবারকে সামনে রেখে প্রস্তুতি এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তবে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখনও আসেনি।
গত ১৩ ফেব্রুয়ারি নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের গেজেট প্রকাশ করা হয়। সাধারণত জাতীয় সংসদের স্পিকার নির্বাচিত সদস্যদের শপথবাক্য পাঠ করান। কিন্তু জুলাই অভ্যুত্থানের পর বর্তমানে সংসদ কার্যকর নয়, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের পদও শূন্য। এ অবস্থায় নতুন সংসদ সদস্যদের শপথ কে পড়াবেন— এ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপিত হইবার তারিখ হইতে পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে এই সংবিধানের অধীন এতদুদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা তদুদ্দেশ্যে অনুরূপ ব্যক্তি কর্তৃক নির্ধারিত অন্য কোনো ব্যক্তি যে কোনো কারণে নির্বাচিত সদস্যদের শপথ পাঠ পরিচালনা করিতে ব্যর্থ হইলে বা না করিলে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার উহার পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে উক্ত শপথ পাঠ পরিচালনা করিবেন, যেন এই সংবিধানের অধীন তিনিই ইহার জন্য নির্দিষ্ট ব্যক্তি।’ অর্থাৎ সংবিধান অনুযায়ী, নির্বাচনের ফল গেজেট প্রকাশের তিন দিনের মধ্যে নির্ধারিত ব্যক্তি শপথ পড়াবেন। রাষ্ট্রপতি চাইলে কাউকে এ দায়িত্ব দিতে পারেন। যদি নির্ধারিত ব্যক্তি তিন দিনের মধ্যে শপথ পড়াতে ব্যর্থ হন, তাহলে পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার শপথ পড়াবেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আগামীকাল মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) সকালে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী সদস্যদের শপথবাক্য পাঠ করাবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দীন। আর বিকালে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ হবে জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায়। সংবিধান অনুযায়ী মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ পড়াবেন রাষ্ট্রপতি।
শপথ অনুষ্ঠান ঘিরে গত শুক্র ও শনিবার দিনভর বৈঠক করেছেন সংসদ সচিবালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। প্রোটোকল, নিরাপত্তা, অতিথি আপ্যায়ন ও প্রযুক্তিগত প্রস্তুতিসহ সববিষয় চূড়ান্ত করা হয়েছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় অধিবেশন কক্ষসহ সংসদ সচিবালয়ে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলো মেরামত করে পুনরায় প্রস্তুত করা হয়েছে।
সংবিধানের ৭২(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সাধারণ নির্বাচনের ফল ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করতে হবে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং ১৩ ফেব্রুয়ারি গেজেট প্রকাশিত হয়। সে হিসাবে আগামী ১৩ মার্চের মধ্যে রাষ্ট্রপতিকে প্রথম অধিবেশন আহ্বান করতে হবে। ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে রমজান মাস শুরু হয়ে ১৮ মার্চ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা থাকায় মার্চের শুরুতেই অধিবেশন বসতে পারে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি উৎসবমুখর পরিবেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত দেশের ২৯৯ আসনে ভোটগ্রহণ হয়। নির্বাচনে ২০৯টি আসনে জয় পেয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। ৬৮ আসনে জয় পেয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। এ ছাড়া জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ৬টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২টি, খেলাফত মজলিস ১টি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ১টি, গণসংহতি আন্দোলন ১টি, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপি ১টি এবং গণঅধিকার পরিষদ ১টি আসন পেয়েছে। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয় পেয়েছেন ৭টি আসনে। উচ্চ আদালতে মামলা বিচারাধীন থাকায় দুটি আসনের গেজেট এখনও প্রকাশ হয়নি।
এবারের সংসদ কাঠামোয় আসছে বড় পরিবর্তন। বাংলাদেশে এতদিন এক কক্ষবিশিষ্ট সংসদ থাকলেও এবার প্রথমবারের মতো দুই কক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠিত হবে— নিম্নকক্ষ ও উচ্চকক্ষ। জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত ৩০০ সদস্য এবং সংরক্ষিত ৫০ নারী সদস্য নিয়ে গঠিত হবে নিম্নকক্ষ।
প্রথম অধিবেশন শুরুর ২১০ দিনের মধ্যে উচ্চকক্ষ গঠন করা হবে। প্রথম ১৮০ দিন নিম্নকক্ষের সদস্যরা সংবিধান সংস্কারের কাজ করবেন। এরপর ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারে (পিআর পদ্ধতি) ১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষ গঠিত হবে। কোনো দল ৪০ শতাংশ ভোট পেলে তারা উচ্চকক্ষে ৪০ আসন পাবে। উচ্চকক্ষের মেয়াদ থাকবে নিম্নকক্ষের শেষ কার্যদিবস পর্যন্ত।
উচ্চকক্ষ গঠনের পদ্ধতি সংশোধিত সংবিধান ও প্রণীত আইনের ওপর নির্ভর করবে। সদস্যরা সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হতে পারেন, আবার পরোক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থাও থাকতে পারে। বিশেষজ্ঞ, নারী বা সংখ্যালঘু প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে মনোনয়ন ব্যবস্থাও রাখা হতে পারে। উচ্চকক্ষে মোট সদস্য হবেন ১০০ জন। সংসদ নির্বাচনে বিভিন্ন দল যে পরিমাণ ভোট পাবে, সেই আনুপাতিক হারে (পিআর পদ্ধতি) সদস্য মনোনীত হবে। অর্থাৎ কোনো দল যদি ৪০ শতাংশ ভোট পায়, তাহলে তারা ৪০ আসন পাবে। আবার কেউ ১ শতাংশ ভোট পেলে তাদের ১ জন প্রতিনিধি থাকবে উচ্চকক্ষে।
বাংলাদেশের সংসদ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান। এখানে একজন স্পিকার ও এক বা একাধিক ডেপুটি স্পিকার অধিবেশন পরিচালনা করেন। একটি অধিবেশন শেষ হওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে পরবর্তী অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। সংসদে বিল উত্থাপন, আলোচনা ও ভোটের মাধ্যমে আইন পাস হয়। কর আরোপ বা রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রেও সংসদের অনুমোদন প্রয়োজন। সংসদে কোরাম নিশ্চিত করতে নির্দিষ্টসংখ্যক সদস্যের উপস্থিতি আবশ্যক। সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে নিম্নকক্ষের দুই-তৃতীয়াংশ এবং উচ্চকক্ষের সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার সমর্থন প্রয়োজন হবে।




