কিছু শব্দ ও শ্লোগান প্রসঙ্গে
প্রকাশিত হয়েছে : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:২৬:১৮ অপরাহ্ন
বর্তমানে কয়েকটি শব্দ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ মিডিয়ায় রীতিমতো তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। কিছু শ্লোগান নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে দেশব্যাপী। শব্দগুলোর মধ্যে রয়েছে ইনকিলাব, ইনসাফ ও আজাদী আর শ্লোগান হচ্ছে ইনকিলাব জিন্দাবাদ। এসব শব্দ ও শ্লোগান বাংলা ভাষায় বিশেষভাবে বাংলাদেশের সচেতন ও শিক্ষিত মহলে বহুল ব্যবহৃত। যে কোন স্বল্পশিক্ষিত এমনকি অনেক অশিক্ষিত মানুষও এগুলোর অর্থ জানে ও বুঝে। কিন্তু কয়েকদিন আগে বিদ্যুৎ ও জ্বালানীমন্ত্রী বলেন, বাংলাকে যদি ধারণ করতে হয়, বাংলা ভাষাকে যদি মায়ের ভাষা বলতে হয় তাহলে ইনকিলাব জিন্দাবাদ চলবে না। ইনকিলাব জিন্দাবাদ, ইনকিলাব মঞ্চ এগুলো বাংলার সাথে কোন সম্পর্ক নেই। যারা আমাদের মায়ের ভাষা কেড়ে নিতে চেয়েছিলো এগুলো তাদের ভাষা।’ তার এই বক্তব্যের প্রতিবাদে সোশ্যাল মিডিয়া এসব শব্দ ও শ্লোগানে সয়লাব হয়ে গেছে। বলা যায়, শিক্ষিত ও সচেতন মানুষ ফুঁসে ওঠেছেন। এরই প্রতিফলন ঘটেছে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীর আমির ডাঃ শফিকুর রহমানের সোশ্যাল মিডিয়ায় দেয়া একটি স্ট্যাটাসে। গত ২২ ফেব্রুয়ারী ভোরে নিজের ভেরিফাইড ফেইসবুক পেইজে একটি পোস্ট দেন ডাঃ শফিকুর রহমান। মাত্র দুই বাক্যের সেই স্ট্যাটাসে তিনি লিখেন, ইনশাল্লাহ, আগামীর বাংলাদেশ ইনসাফের বাংলাদেশ। ইনকিলাব জিন্দাবাদ। তার এই বক্তব্য এদেশের কোন মানুষের না বুঝার কথা নয়। তার এই বক্তব্য এদেশের কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ের কথা, প্রাণের আকুতি এর প্রমাণ, পোস্টটি দেওয়ামাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তা ভাইরাল হয়ে যায়। অল্প সময়েই ওই পোস্টে প্রায় ২ লাখ রিয়েকশন পড়েছে। মন্তব্য করেছেন কুড়ি হাজারেরও বেশি মানুষ। পোস্টটি শেয়ার করেছেন প্রায় ৩ হাজার মানুষ। অপরদিকে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী শিশির মনিরের দুই শব্দের একটি স্ট্যাটাসে রীতিমতো ঝড় ওঠেছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। গত ২১ ফেব্রুয়ারী ফেইসবুকে নিজের ভেরিফায়েড আইডিতে স্ট্যাটাসটি দেন তিনি। ওই স্ট্যাটাসে লিখেন, ইনসাফ, ইনসাফ। যা মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়।
লক্ষণীয় যে, ভাষার মাস ফেব্রুয়ারীতে মাতৃভাষা নিয়ে আলোচনা, সমালোচনা ও গবেষণা নতুন কিছু নয়। তবে সেই আলোচনা যখন গঠনমূলক না হয়ে বিদ্বেষ প্রসূত ও রাজনৈতিক হয়, তখন জনমনে ক্ষোভ সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক। বিদ্যুৎমন্ত্রী টুকু ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ শ্লোগান ও ‘ইনকিলাব মঞ্চ’ নামক সংগঠন নিয়ে যে বক্তব্য রেখেছেন তা ভাষাকেন্দ্রিক না হয়ে রাজনৈতিক বিদ্বেষপ্রসূত বলেই প্রতীয়মান হয়েছে সচেতন মহলে। তাই এর বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়াও হয়েছে ব্যাপকভাবে। প্রকৃতপক্ষে ইনকিলাব, ইত্তেফাক, আওয়ামী, ইনসাফ, আজাদী এসব শব্দ বিদেশী ভাষা থেকে এলেও এগুলো এখন বাংলা ভাষায় রূপ নিয়েছে। এগুলোর মধ্যে ইনসাফ ও আজাদী বহুল ব্যবহৃত বাংলা শব্দ, যেগুলো বিদেশী ভাষা থেকে বাংলা ভাষায় এসে বাংলা শব্দের মতোই ব্যবহৃত হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইনকিলাব শব্দটি বহুলভাবে ব্যবহৃত একটি জনপ্রিয় শব্দ। কারণ শব্দটি গত জুলাই বিপ্লবের সময় বিপ্লবীরা ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেন। এর আগে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনেও বিপ্লবীরা শব্দটি ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেন। আর জিন্দাবাদ শব্দটি তো বাংলাদেশে বহুল ব্যবহৃত একটি রাজনৈতিক শ্লোগান। যে মন্ত্রী ইনকিলাব জিন্দাবাদ নিয়ে প্রশ্ন ও আপত্তি তুলেছেন, তার দল বিএনপিরও জনপ্রিয় শ্লোগান হচ্ছে বাংলাদেশ জিন্দাবাদ। তাই ইনকিলাব জিন্দাবাদ শ্লোগানের জিন্দাবাদকে গ্রহণ করে শুধু ইনকিলাব শব্দের বিরোধিতা ও আপত্তি কি হাস্যকর ও স্ববিরোধীতা নয়? এ প্রশ্ন এখন সচেতন মহলের।
ইনকিলাব ও জিন্দাবাদ শব্দ দু’টি বিদেশী ভাষা থেকে এলেও এগুলো এখন বাংলা শব্দের মতোই ব্যবহৃত হচ্ছে। এভাবে হাজারো বিদেশী শব্দ এখন বাংলায় রূপান্তরিত হয়ে বাংলা শব্দ বা ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। চেয়ার, টেবিল, হাসপাতাল, রিকশা, আলমারি, আনারস এ রকম অগণিত বিদেশী শব্দকে কেউ বিদেশী শব্দ বলে বর্জনের কথা বললে তাকে বদ্ধ উন্মাদ বলবে শিক্ষিত সমাজ। আর কিছু কিছু শব্দ ও শ্লোগান এদেশের জনগণের আবেগ ও চেতনার সাথে জড়িয়ে আছে, যা নিয়ে বিতর্ক বা সমালোচনা চলে না। চলা উচিতও নয়। ইনকিলাব জিন্দাবাদ শ্লোগান এবং জিন্দাবাদ শব্দটি এমন আবেগাশ্রয়ী ও চেতনামিশ্রিত শব্দ। এগুলো যে এদেশের মানুষের মনন ও চেতনা জুড়ে বিস্তৃত, এগুলোর শেকড় যে এদেশের জাতীয় সত্তার গভীরে প্রোথিত এর প্রমাণ সোশ্যাল মিডিয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত ও প্রমাণিত। তাই এ বিষয়ে বেফাঁস মন্তব্য কখনোই কাম্য ও প্রত্যাশিত নয়। আমরা এ বিষয়ে সকলের সচেতনতা কামনা করি। বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ ও বেগবান করে শেষ পর্যন্ত বাংলায় রূপান্তরিত হয়েছে, এমন সকল শব্দের বহুল প্রচার কামনা করি। আর যেসব শ্লোগান এদেশকে গোলামী ও শোষণ থেকে মুক্ত সেইসব দেশী বা বিদেশী ভাষা থেকে আগত শ্লোগানকে হৃদয়ে ধারণের আহবান জানাচ্ছি।


