মশার অসহনীয় উপদ্রব
প্রকাশিত হয়েছে : ০৫ মার্চ ২০২৬, ৩:১৪:০১ অপরাহ্ন
অভিযান শুরু হলেও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন
স্টাফ রিপোর্টার : শীতের বিদায় আর বসন্তের আগমনে প্রকৃতিতে যখন পরিবর্তনের হাওয়া, ঠিক তখনই মশার উপদ্রব ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। নগর থেকে শুরু করে জেলা-উপজেলা শহরেও মশার দাপটে অতিষ্ঠ মানুষ। নগরের কিছু এলাকায় মশক নিধন অভিযান আংশিক শুরু হলেও এটির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
বছরের এই সময়ে প্রতি বছরই মশা কিছুটা বাড়ে বলেই মত কিটতত্ত্ববিদের। তবে এবার মশার উপদ্রব অনেকটা বেশি বলেই জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
এর পেছনে মোটাদাগে তিনটি কারণকে দায়ি করা হচ্ছে। প্রথমত, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় স্থানীয় সরকার প্রশাসন পুরোপুরি ভঙ্গুর অবস্থায় ছিল, মাঠপর্যায়ে প্রশাসন ছিল না বললেই চলে। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ, সিটি কর্পোরেশনের মতো স্থানীয় সরকার প্রশাসনের যে অঙ্গপ্রতিষ্ঠানগুলো ছিল পুরো কাঠামোটাই ভেঙে পড়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে চলা এই অচলবস্থার কারণে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কাজগুলো কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ায়, বিশেষ করে জনবহুল সিটি কর্পোরেশন এলাকায় মশা অধিক হারে বেড়েছে।
দ্বিতীয়ত, বর্জ ব্যবস্থাপনা ও মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমসহ সব ধরণের তৎপরতার গতি কমে যাওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘ সময় বৃষ্টি না থাকায় ড্রেন, ডোবা, নর্দমার পানি আটকে কিউলেক্স মশার বংশবৃদ্ধির জন্য উপযোগী পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
শুষ্ক সময়ে জমে থাকা পানি যদি সিটি কর্পোরেশন বা স্থানীয় প্রশাসন পরিষ্কারের ব্যবস্থা নিত তাহলে পানি পঁচতো না। মশার প্রজননের সুযোগও কমে যেত। তবে এখন যে মশাটা আছে তার ৯২ ভাগই কিউলেক্স মশা। এই মশার বংশবৃদ্ধি হয় ড্রেন, ডোবা, নর্দমার পঁচা পানিতে।
তৃতীয় কারণ হিসেবে মশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া। কেবল গত আঠারো মাসে নয়, বাংলাদেশে মশার বংশবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে কখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
এদিকে, সিলেট নগরীর ৪২টি ওয়ার্ডের মধ্যে প্রথম পর্যায়ে ৮টি ওয়ার্ডে একযোগে মশক নিধন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। নগরীর ১, ২, ৪, ১৪, ১৫, ১৬, ১৭ ও ১৮ নম্বর ওয়ার্ড। তবে এসব একাধিক ওয়ার্ডের বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, মশক নিধনের ওষুধ ছিটানো হচ্ছে ঠিক, কিন্তু মশা সেই আগের মতো রয়ে গেছে। এর কারণ হিসেবে তারা ওষুধের পর্যাপ্ততা ও কার্যকারিত নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।
এ প্রসঙ্গে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক ও কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, বাংলাদেশে সাধারণত মশা নিয়ন্ত্রণে যে ফগিং বা ধোঁয়ার ব্যবহার করা হয় সেটি কার্যকর কোনো সমাধান নয়। তিনি বলছেন, এর মাধ্যমে নাগরিকদের কেবল খুশি করার চেষ্টা করা হয়। ছোট বাচ্চাদের চকলেট দিয়ে যেমন খুশি করার চেষ্টা করা হয় ঠিক একইভাবে নাগরিকদের খুশি করার পদক্ষেপ হচ্ছে ফগিং ।
উন্নত বিশ্বের উদাহরণ টেনে কবিরুল বাশার বলেন, স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ঝুঁকি থাকায় পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশেই, মশা নিয়ন্ত্রণে ধোঁয়া ব্যবহার এখন আর অনুমোদিত নয়।
ওষুধ ছিটানোর পরও মশা কেন মরেনা, এ প্রসঙ্গে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহিদুল ইসলাম সম্প্রতি এক সাক্ষাতকারে বলেন, ফগার মেশিনে যে ওষুধ ব্যবহার করা হয়, তা মূলত দুই ধরনের হয়- একটি ‘হিউম্যান প্রোডাক্ট’ (মানুষের জন্য সহনশীল) এবং অন্যটি ‘এগ্রিকালচার প্রোডাক্ট’ (কৃষিকাজে ব্যবহৃত কড়া বিষ)। হিউম্যান প্রোডাক্টের বিষের মাত্রা এগ্রিকালচার প্রোডাক্টের চেয়ে কিছুটা কম থাকে। এর দামও বেশি। কিন্তু এটি পরিবেশ ও মানুষের ক্ষতি করে না। আমরা নগরবাসীর স্বাস্থ্য ও পরিবেশের কথা বিবেচনা করেই মূলত হিউম্যান প্রোডাক্ট ব্যবহার করে থাকি। একারণেই হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে মশা মরে যাওয়ার হার কিছুটা কম মনে হয়।
তিনি মশক নিধনের বৈজ্ঞানিক দিক তুলে ধরে আরও বলেন, আরেকটা বড় সমস্যা হলো, ফগিং বা ধোঁয়া ছিটানোর সময় মাত্র ২০ ভাগ মশা মরে। বাকি ৮০ ভাগ মশা উড়ে গিয়ে এলাকার খালি জায়গায় বা ঝোপঝাড়ে আশ্রয় নেয়। অন্যদিকে, লার্ভিসাইড (লার্ভা ধ্বংসের ওষুধ) ছিটালে ৫০ ভাগ মশা মারা যায়। মশা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে এই কার্যক্রম ধারাবাহিকভাবে ১৫ দিন পর পর করতে হয়। কিন্তু আমাদের সেই সক্ষমতা নেই।
প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা জানান, আমাদের পুরো এলাকায় একসাথে ওষুধ ছিটানোর মতো পর্যাপ্ত জনবল ও যন্ত্রপাতি নেই। সবচেয়ে বড় সংকট হলো অর্থের। পুরো সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ১৫ দিন পর পর ওষুধ ছিটাতে হলে বছরে প্রায় ২০ কোটি টাকার ওষুধের প্রয়োজন। অথচ আমরা বছরে বাজেট পাচ্ছি মাত্র ২ কোটি টাকা! এই সামান্য বাজেট দিয়ে সারা বছরে বড়জোর ২ থেকে ৩ বার ওষুধ ছিটানো যায়।




