ওসমানীনগরে কাটা হচ্ছে ফসলি জমির মাটি, নির্বিকার প্রশাসন
প্রকাশিত হয়েছে : ১০ মার্চ ২০২৬, ৯:০৪:১৪ অপরাহ্ন

মো. মুহিব হাসান, ওসমানীনগর : ওসমানীনগরে দিনে রাতে সমানতালে কেটে বিক্রি করা হচ্ছে ফসলি জমির মাটির উপরিভাগের পুষ্টিগুণ সম্পন্ন উর্বর টপ সয়েল। আর এই টপ সয়েল কেটে বিক্রির কারণে জমির উর্বরতা শক্তি বিনষ্ট এবং ট্রাকযোগে মাটি স্থানান্তরের কারণে উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের কাচা রাস্তা ভেঙ্গে ব্যবহার অনুপযোগী ও পাকা রাস্তায় ট্রাকের মাটি উপচে পড়ে বৃষ্টিতে রাস্তা পিচ্ছিল হয়ে নাজুক অবস্থা বিরাজ করছে।
গত রোববার রাতে বৃষ্টি হলে বৃষ্টির পানিতে রাস্তায় পড়ে থাকা মাটি মিশে একাকার হয়ে কাদায় রূপ নিয়ে উপজেলার প্রতিটি হাওর তীরের গ্রাম সংলগ্ন রাস্তাগুলোতে রাত থেকে পরদিন পর্যন্ত অসংখ্য দুর্ঘটনা ঘটেছে। বৃষ্টির পানিতে মাটি মিশে রাস্তা কর্দমাক্ত পিচ্ছিল হলে মোটরসাইকেল, সিএনজি অটোরিক্শা, নোহা গাড়ী দুর্ঘটনার শিকার হয়ে যাত্রীরা সীমাহীন ক্ষতির সম্মুখিন হয়েছেন। শুকনো মৌসুমে মানুষের ঘরবাড়ি, আঙিনা, রাস্তাঘাট ভরাট করতে দেদারছে চলছে কৃষি জমির টপ সয়েল কাটার মহোৎসব। দিনের বেলায় মাঝে মধ্যে উপজেলা প্রশাসন কয়েকটি স্থানে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে জেল জরিমানা করলেও এদের দমানো যাচ্ছেনা। সন্ধ্যার পর থেকে ভোর পর্যন্ত চলে মাটি ব্যবসায়ীদের কৃষি জমির টপ সয়েল কেটে স্থানান্তর। তবে রাতের বেলায় কৃষি জমির টপ সয়েল কাটাতে প্রশাসনের কোন অভিযান না থাকায় সচেতন মহলে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তাছাড়া উপজেলা সদরের পুরাতন মাটি ব্যবসায়ীরা উপরমহলে প্রদানের কথা বলে, মফস্বলের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ৪০/৫০ হাজার টাকা করে চাঁদা তুলে নির্বিঘ্নে টপ সয়েল কাটার সুযোগ করে নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এই ব্যবসায়ীরা একটি সিন্ডিকেট তৈরি করে উপরমহলের সাথে আঁতাত করে কোথাও জরিমানা হলে সবাই এ জরিমানায় চাঁদা দিয়ে সমানভাগে অংশিদার হচ্ছেন বলে জানা গেছে। তাই প্রশাসনের পক্ষ থেকে দিনের বেলায় লোক দেখানো কয়েকটি অভিযান পরিচালনা করে জেল জরিমানা করলেও, রাতের আঁধারে ঠিকই নির্বিঘ্নে এসব মাটি ব্যবসায়ীরা কৃষি জমির টপ সয়েল কেটে তাদের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। এতে ভবিষ্যতে এলাকার কৃষি জমির উর্বরাশক্তি হ্রাস পেয়ে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হয়ে কৃষক পরিবারে উৎপাদিত খাদ্যের সংকট দেখা দেবে বলে মনে করছেন অভিজ্ঞমহল।
জানা যায়, উপজেলার তাজপুর, গোয়ালাবাজার, উছমানপুর, দয়ামীর, বুরুঙ্গা, পশ্চিম পৈলনপুর, সাদীপুর ও উমরপুরসহ মোট ৮ ইউনিয়নের প্রায় সবকটি হাওর ও কৃষি জমি থেকে মাটি ব্যবসায়ীরা কৃষি জমির টপ সয়েল কেটে স্থানীয় লোকদের সরবরাহ করছেন। তাজপুর ইউনিয়নের কাদিপুর, দুলিয়ারবন, মজলিসপুর, হস্তিদূর, মোল্লাপাড়া, কাশিকাপন,কাশিপাড়া, উছমানপুর ইউনিয়নের লতিবপুর, থানাগাঁও, মির্জাপুর, উছমানপুর, পাঁচপাড়া, রাউৎখাই, মাধবপুর, মুমিনপুর, দয়ামীর ইউনিয়নের শোয়ারগাও, চিন্তামনি, কুরুয়া, নতুন বাজার, গোয়ালাবাজার ইউনিয়নের কালাসারা, দত্তগ্রাম, ভোদরপুর, ব্রাহ্মনগ্রাম, জহিরপুর, করনসী, উমরপুর ইউনিয়নের মাটিহানি, মান্দারুকা, খাদিমপুর, সিকন্দরপুর, উমরপুররের আশপাশ, বুরুঙ্গা ইউনিয়নের মুক্তারপুরের হাওর, কামারগাঁও, পশ্চিম পৈলনপুরের হাজিপুর, গলমুকাপন, বেগমপুর, সাদীপুর ইউনিয়নের চাতলপাড়, নুরপুর, বাংলাবাজার, সাদীপুর, সুরিকোনাসহ উপজেলার প্রায় সবকটি ছোট বড় হাওরের কৃষি জমি জুড়ে চলছে টপ সয়েল কেটে বিক্রির হিড়িক।
প্রবাসী অধ্যুষিত ওসমানীনগরের প্রবাসীদের কেয়ারটেকার ও বর্গা চাষিরা জমিতে ধান হচ্ছেনা- এমন অজুহাত দেখিয়ে এক কেদার তথা ৩০ শতাংশ জমির উপরের দেড় থেকে দুই ফুট টপ সয়েল ৫৫/৬০ হাজার টাকায় মাটি ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করছেন। আর এসব মাটি ব্যবসায়ীরা বাসা বাড়ি দোকান কোঠার মালিকদের কাছে দেড় দুই লক্ষ টাকায় বিক্রি করছেন বলে জানা গেছে। উপজেলার প্রায় সব হাওরে কৃষি জমির টপ সয়েল তথা মাটি কেটে নেওয়ার ফলে প্রয়োজনীয় উপাদানের অভাবে জমির উর্বরতা চিরতরে বিনষ্ট হয়ে জৈব উপাদান হারিয়ে ফসল উৎপাদন কমে গিয়ে জমি মরুভূমিতে পরিণত হওয়ার মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকি ও পরিবেশ বিপর্যয়ের আশংকা রয়েছে।
উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নে রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় রয়েছে একটি মাটি ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা বছরের শুকনো মৌসুমে কৃষি জমির টপ সয়েল কেটে ঘর বাড়ি, পুরাতন পুকুর, দোকান কোঠা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভবনের নিচ, খেলার মাঠ ভরাট করতে মাটি সরবরাহ করে থাকেন। আর এই মাটি সরবরাহ করতে আইনত নিষিদ্ধ কৃষি জমির টপ সয়েল কেটে তারা এলাকার কৃষি জমিকে মরভূমির দিকে নিয়ে যাচ্ছেন।
এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় উপজেলার সচেতন মহলের চোখ নির্বাচনের দিকে থাকায় প্রথমার্ধে দিনের বেলায় দেদারছে শুরু হয় মাটি কাটা। এসময় নির্বাচনের অজুহাত দেখিয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোন পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। নির্বাচন পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিবাদ শুরু হলে উপজেলার ৩/৪ টি স্থানে প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযান চালিয়ে জেল জরিমানা করা হয়েছে, কিন্তু মাটি কাটা বন্ধ হয়নি। এখন দিনের পাশাপাশি রাতের বেলায় চলে ব্যবসায়ীদের মাটি কাটা। সন্ধ্যার পর থেকে উপজেলার হাওর গুলোতে দেখা যায় মাটি কাটা হচ্চে এবং সারি সারি মাঝারি আকারের ট্রাক মাটি স্থানাস্তর করছে। আর প্রশাসন মাটি ব্যবসায়ীদের লোক দেখানো জরিমানা করলে সিন্ডিকেটের সব ব্যবসায়ী সমান চাঁদা দিয়ে এ জরিমানায় অংশিদার হচ্ছেন।
গোয়ালাবাজার আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় পেরিয়ে কালাসারা নামক হাওরে কৃষি জমির টপ সয়েল কাটা হচ্ছে জেনে সরজমিনে গেলে ভেকু মেশিনের চালক জানান, এই মেশিন মাটি ব্যবসায়ী হিরন মিয়ার। কৃষি জমির টপ সয়েল কাটা প্রসঙ্গে হিরন মিয়ার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি মাটি কাটছি না, শুধু গাড়ি ও ভেকু মেশিন সাপ্লাই দিচ্ছি। জেলা পরিষদের সাবেক এক সদস্য নিজস্ব জমি থেকে তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সুপ্রিম ফিলিং স্টেশনের পাশের গর্ত ও নিচু জায়গা ভরাট করতে মাটি নিচ্ছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মফস্বলের এক মাটি ব্যবসায়ী বলেন, আমরা সমগ্র উপজেলা থেকে ৪০/৫০হাজার টাকা করে চাঁদা তুলে পুরাতন ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে উপরমহলে দিয়েছি। কোথাও কোথাও অভিযানে জরিমানা হলে ব্যবসার স্বার্থে আমরা সমান চাঁদা দিচ্ছি। তাজপুর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান কবির আহমদ বলেন, মাটি কেটে জমির উপরিভাগ নষ্ট করা হচ্ছে। রাস্তাঘাটে ট্রাকের ফেলা মাটি বৃষ্টির পানিতে মিশে কাদা হওয়ায় মানুষ দুর্ঘটনার পড়ছেন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা উম্মে তামিমা বলেন, কৃষি জমির টপ সয়েল মাটির পুষ্টিগুন সম্পন্ন। আমরা উপ সহকারিদের মাধ্যমে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছি, যাতে তারা জমির টপ সয়েল বিক্রি না করেন। ওসমানীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুনমুন নাহার আশা’র সরকারি মোবাইলে বার বার কল দেওয়া হলে রিং হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। সিলেটের জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম বলেন, আমি একটা মিটিং এ আছি। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে মাটি কাটা হচ্ছে এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি কোথায় বলে কল কেটে দেন। সিলেট বিভাগীয় কমিশনার খান মোঃ রেজা-উন-নবীর’র মোবাইলে কল দিলে তার সহকারী কল রিসিভ করে বলেন, স্যার এখন একটি ট্রেনিং এ আছেন, পরে কথা বলবেন।





