দূষণে ভূগছে সিলেটের বিসিক শিল্পনগরী
প্রকাশিত হয়েছে : ১২ মার্চ ২০২৬, ৩:১৪:৩৮ অপরাহ্ন
তামিম মজিদ:
দূষণে ভূগছে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশনের (বিসিক) সিলেটের খাদিমনগর ও গোটাটিকর শিল্পনগরী। খাদিমনগর বিসিক শিল্পনগরীর সড়ক ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নে গত ৩ বছরে ১২ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ হলেও দৃশ্যত উন্নয়ন চোখে পড়েনি। একই দশা গোটাটিকর শিল্পনগরীর। সেখানেও ৩৬ লাখ টাকার উন্নয়ন কাজ হলেও বেহাল দশা। দুই বিসিকের ভেতরের সরু ড্রেনেজ ব্যবস্থা অল্প বৃষ্টি হলেই পানি জমে থাকে। এছাড়া কারখানাগুলোর ইটিপি না থাকায় বর্জ্য সরাসরি ড্রেনে গিয়ে পড়ে। এতে পুরো শিল্পনগরী দূর্গন্ধময় হয়ে উঠছে। ফলে এখানে উৎপাদিত পণ্যের মান নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিল্প কারখানার বর্জ্য নিরসণে ইনফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (ইটিপি) নেই অনেক কারখানার। ফলে কারখানার দূষিত বর্জ সরাসরি খোলা ড্রেনে গিয়ে পড়ে পরিবেশে ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে। তবে কর্তৃপক্ষ বলছে, বিসিক মূলত কর্মস্থান তৈরি করে। তাই এখানে কোনো কারখানা বন্ধ হোক সেটা চায় না। পরিবেশ দূষণের বিষয়টি পরিবেশ অধিদপ্তর দেখে থাকে। তবে বিসিক কর্তৃপক্ষ কারখানাগুলোকে পরিবেশ সম্মত ইটিপি বাস্তবায়নে পরামর্শ দেয়। কারখানার বর্জ্য যাতে পরিবেশ দূষণ না করে।
শিল্প আইন বলছে, ১০ শতাংশের একটি শিল্প প্লটে ৮ শতাংশ জমিতে কারখানা ও ২ শতাংশ জমিতে ইনফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (ইটিপি) নির্মাণ করার কথা। কিন্তু বাস্তবে এর কোনো প্রয়োগ নেই খাদিমনগর ও গোটাটিকর শিল্পনগরীর কারখানাগুলোতে। সরজমিনে দেখা গেছে, খাদিমে ৮-১০টি কারখানা ছাড়া কোনোটিতেই নেই ইনফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (ইটিপি)। ফলে ছানা পানি (শিল্পের বর্জ্য) সরাসরি ড্রেনে গিয়ে পড়ে। এতে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ ও এর সংশোধনীসমূহ (২০০০, ২০০২, ২০১০) আইনের আওতায় দূষণ ঘটালে সর্বোচ্চ ৩ বছর কারাদণ্ড বা ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা, কিংবা উভয় দণ্ডই হতে পারে। সংশোধিত ধারায় কখনো কখনো এর চেয়েও বেশি দণ্ডের উল্লেখ রয়েছে। এছাড়াও রয়েছে পরিবেশ আদালত আইন, ২০১০- যেখানে সর্বোচ্চ ৫ বছর কারাদণ্ড ও ৫ লাখ টাকা জরিমানা হতে পারে। পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালাসহ আরও নানা উপ- বিধি। তবে সেই আইন শুধু কাগজে কলমেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। বাস্তবে পরিবেশ দূষণ রোধে পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনো পদক্ষেপ নেই।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, খাদিমনগরের বিসিক শিল্প নগরী পাশের সিলেট-তামাবিল মহাসড়কের পাশের খালটি প্লাস্টিক, বোতল ও শিল্প বর্জ্যে ভরা। দূর্গন্ধময় বিষাক্ত কালো পানিতে বিষাক্ত হয়ে উঠেছে বাতাস। বিসিকের কারখানা কর্মী ও পথচারীরা মুখে হাত দিয়ে নাক বন্ধ করে চলাচল করতে হচ্ছে। প্লাস্টিক বর্জ্যে খালটি প্রায় ভরে গেছে। এছাড়া ব্রিটিশ গ্যাস কুকার কোম্পানী খালের উপর দিয়ে কনটেইনার বসানোর ফলে বর্ষাকালে পানি চলাচলে বিঘ্ন ঘটে বলে জানান বিসিকের কর্মকর্তারা।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বিসিকের সামনের যে খালটি প্রবাহিত হয়েছে, এই খাল দিয়েই বিসিকের শিল্প কারখানার বর্জ্য বংশী নদীতে গিয়ে পড়ে। পরে বংশী নদী থেকে কুশিখালী হয়ে সুরমা নদীতে গিয়ে প্রবাহিত হয়। সরেজমিনে দেখা যায়, স্থানীয় এলাকার লোকজন বংশী নদীর মুখটি মাটি ভরাট করে বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে পানি প্রবাহে বিঘ্ন ঘটে। এতে বর্ষকালে শিল্প এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয় বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, ৭৪টি শিল্প কারখোনার মধ্যে ফুলকলি, পিউরিয়া, বনফুল, ট্রেস্টি ট্রিটসহ ৮-১০টি কারখানার বর্জ্য নিস্কাশনে ইনফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (ইটিপি) রয়েছে। বাকি ৬২-৬৪টি কারখানারই ইটিপির ক্যাপাসিটি নেই। ফলে শিল্পের বর্জ্য সরাসরি খাল, বংশী নদী ও কুশিখালী হয়ে সুরমা নদীতে গিয়ে পড়ে। ফলে নদীর মাছসহ জীব বৈচিত্রে বিরুপ প্রভাব পড়ছে।
বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে শিল্পবর্জ্য নির্গমন বাড়বে ১০৯ শতাংশ। নানা ধরনের কেমিক্যাল একদিকে যেমন জলাশয় বিষাক্ত করবে, অন্যদিকে মানুষের খাদ্যশৃঙ্খলাকে বিনষ্ট করবে। তাই ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতি মোকাবিলায় এখনই বাংলাদেশকে প্রস্তুতি নিতে হবে। এ জন্য উন্নত দেশের বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে অনুসরণ করতে হবে এখন থেকেই। শিল্প খাতের উন্নয়নের পাশাপাশি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর পানীয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বিশেষ করে পোশাক খাতের বর্জ্য নির্গমন ব্যবস্থাপনায় জোর দিতে হবে।
তথ্য বলছে, সিলেট শহরতলির খাদিমনগরে বিসিক শিল্পনগরীর যাত্রা শুরু হয় ১৯৯২ সালে। এটি সিলেটের দ্বিতীয় শিল্পনগরী। এখানে ৭৪টি শিল্প ইউনিটের মধ্যে ৭১টিতে পুরোদমে উৎপাদন চালু রয়েছে। বাকি তিনটির মধ্যে ২টিতে চলছে অবকাঠামো নির্মাণ ও ১টি কারখানার উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। এসব শিল্পকারখানায় মোট বিনিয়োগ প্রায় ২০০ কোটি টাকা। বার্ষিক উৎপাদন হচ্ছে ৪০০ কোটি টাকা। ৫ হাজার ৭৩০ জন মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে খাদিমনগর বিসিকের বিভিন্ন শিল্পকারখানায়। তবে পরিবেশবান্ধব কারখানা এই বিসিক শিল্পনগরীতে মাত্র হাতেগানা ক’টি।
বিসিক সিলেট জেলা কার্যালয়ের তথ্য বলছে, ২০২২-২৩ অর্থ বছর থেকে ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে খাদিম বিসিকে দেয়াল, ড্রেন ও সড়কের উন্নয়নে ১২ কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে। এখানে ৭৩টি শিল্প গ্রুপ ১১৯টি প্লটে কারখানা করেছে।
একইভাবে সিলেটের অন্য শিল্পনগরী গোটাটিকরও ধুঁকছে নানা সমস্যায়। অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে জলাবদ্ধতা ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ বিরাজ করছে বিসিকের অভ্যন্তরে, ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। কর্তৃপক্ষ ২০২০-২১ অর্থবছরে ৩৬ লাখ টাকার উন্নয়নকাজ হয়েছে দাবি করলেও বাস্তবে এর কোনো কিছুই চোখে পড়েনি। দেখা গেছে, সীমানা প্রাচীর না থাকায় চারদিক অরক্ষিত। কোথাও ভাঙাচোরা, কোথাও কাঁচা রাস্তা। বেশির ভাগ এলাকায় ড্রেন নোংরা। নষ্ট হয়ে যাওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ বিশুদ্ধ পানির নলকূপ। বিভিন্ন স্থানে ময়লা-অবর্জনার স্তূপ পড়ে রয়েছে। পানি ও বিদ্যুতের লাইনও অপর্যাপ্ত।
১৯৬৪ সালে কাজ শুরু হলেও ১৯৭৮ সালে গোটাটিকর বিসিকের যাত্রা শুরু। ৭২টি শিল্প ইউনিটের মধ্যে বর্তমানে এ বিসিকে ৬৬টি কারখানা উৎপাদনে রয়েছে। এর মধ্যে ৪২টিই মিষ্টি ও খাদ্যজাত পণ্য উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত। এর মধ্যে মাত্র তিনটি প্রতিষ্ঠানের ইটিপি রয়েছে। এসব শিল্পকারখানায় মোট বিনিয়োগ ১৫ কোটি টাকা। বার্ষিক উৎপাদন হচ্ছে ২৩০ কোটি টাকা। ৪ হাজার ৪০০ জন মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে গোটাটিকর বিসিকের বিভিন্ন শিল্পকারখানায়।
বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গোটাটিকর বিসিকের সবচেয়ে বড় সমস্যা জলাবদ্ধতা। সামনের সড়কসহ আশপাশের সব স্থাপনা উঁচু। ফলে ভেতরে নালার ব্যবস্থা থাকলেও বিসিকের পানি বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। বিসিক শিল্পমালিক সমিতির প্রতিনিধি মঈন উদ্দিন বলেন, কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনায় এখানকার পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। ড্রেনেজব্যবস্থা না থাকায় বৃষ্টি হলেই ময়লা-দুর্গন্ধযুক্ত পানি ঢুকে আমাদের লাখ লাখ টাকার মালামাল নষ্ট হয়ে যায়। এখানে ভোগান্তির শেষ নেই। তবে গোটাটিকর বিসিক শিল্পনগরীর কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবিদুর রহমান খান বলেন, বিসিকের ভেতরের নালাগুলো সংস্কার করা হয়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে ৩৬ লাখ টাকার উন্নয়নকাজ হয়েছে।
বিসিক সিলেট জেলা কার্যালয়ের উপ-মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী ম. সুহেল হাওলাদার জালালাবাদকে বলেন, বিসিক মূলত শিল্পের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে কাজ করে। নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হোক, কোনা কারখানা বন্ধ হোক আমরা চাই না। তবে পরিবেশটাও যাতে ঠিক থাকে, এটাও আমরা চাই। আর ইটিপির বিষয়টি পরিবেশ অধিদপ্তর দেখে থাকে। তিনি বলেন, গত ৩ বছরে খাদিম বিসিকে ১২ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ হয়েছে। মালিক সমিতির সহায়তায় ৩৬টি সিসি ক্যামেরা লাগানোর কাজ চলছে। বর্তমানে ৪ জন সিকিউরিটি গার্ড নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছে। এটা ১০ জন সিকিউরিটি গার্ডে উন্নীত করা হবে।





