তেহরানে প্রাণঘাতী বিস্ফোরণ : ইরানি নেতাদের প্রতিরোধের ডাক
প্রকাশিত হয়েছে : ১৩ মার্চ ২০২৬, ৮:৪৮:২৮ অপরাহ্ন
জালালাবাদ রিপোর্ট : ইরানের রাজধানী তেহরানে শীর্ষ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে সরকারপন্থি একটি সমাবেশের কাছে বেশ কয়েকটি প্রাণঘাতী বিস্ফোরণ ঘটেছে। সপ্তাহজুড়ে ইসরায়েল ও ইরান নতুন করে পাল্টাপাল্টি হামলা চালাচ্ছে, অন্যদিকে এই যুদ্ধ পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে গ্রাস করছে এবং বিশ্ব অর্থনীতিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। খবর বার্তা সংস্থা এএফপির।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ এখন পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে, যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে বিশ্বশক্তিগুলো এবং সৃষ্টি হয়েছে তেলের ভীষণ সংকট।
তেহরানে অবস্থানরত এএফপির সাংবাদিকরা শহরের আকাশে শুক্রবার (১৩ মার্চ) বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছেন। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় তারা পশ্চিম ও মধ্য ইরানে ২০০-র বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, কুদস দিবসের সমাবেশের কাছে হওয়া বিস্ফোরণে অন্তত একজন নারী নিহত হয়েছেন। সেই সমাবেশে হাজার হাজার মানুষ ‘আমেরিকা নিপাত যাক’ ও ‘ইসরায়েল নিপাত যাক’ স্লোগান দিচ্ছিল।
ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের প্রধান আলী লারিজানি কুদস দিবসের সমাবেশে বলেন, ‘এই হামলাগুলো ভয় এবং হতাশা থেকে করা হচ্ছে। যারা শক্তিশালী, তারা কখনোই মিছিলে বোমা হামলা চালায় না। এটা পরিষ্কার যে শত্রু পক্ষ ব্যর্থ হয়েছে।’ ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিও এই সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকাই অঙ্গীকার করে বলেছেন, ইরানের সামরিক বাহিনী যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে ‘একটি অবিস্মরণীয় শিক্ষা’ দেবে। এর কিছুক্ষণ পরেই রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানায়, ইরান ইসরায়েলের দিকে নতুন করে একঝাঁক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে।
রেশন কার্ডে রুটি এবং চরম অস্থিরতা :
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী সতর্ক করে বলেছে, নতুন কোনো সরকারবিরোধী বিক্ষোভ হলে জানুয়ারির চেয়েও কঠোরভাবে দমন করা হবে। সাধারণ ইরানিরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এএফপি-কে জানিয়েছেন, বোমাবর্ষণের নিচে তাদের জীবন চরম দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। ব্যাংকের ওপর আস্থা হারিয়ে মানুষ তাদের জমানো টাকা তোলার জন্য মরিয়া হয়ে চেষ্টা করছে। পশ্চিম ইরানের কেরমানশাহের এক নারী জানান, এখন রুটি রেশনের মাধ্যমে দেওয়া হচ্ছে। সাধারণ মানুষ চরম উৎকণ্ঠা ও ক্ষোভের মধ্যে আছে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরানে প্রায় ৩২ লক্ষ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের গোলাবারুদ সীমাহীন :
মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী পিট হেগসেথ জানিয়েছেন, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মার্কিন-ইসরায়েলি জোট ১৫ হাজারেরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চরম আক্রমণাত্মক ভাষায় লিখেছেন, ‘আমাদের অতুলনীয় ফায়ারপাওয়ার এবং সীমাহীন গোলাবারুদ রয়েছে। এই উন্মাদ লোকগুলোর আজ কী দশা হয় তা তাকিয়ে দেখুন।’
আঞ্চলিক বিস্তার ও ক্ষয়ক্ষতি :
ইরান মার্কিন সামরিক ঘাঁটি থাকা প্রতিবেশী দেশগুলোতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে। সৌদি আরব জানিয়েছে, তারা রিয়াদের কূটনৈতিক এলাকা লক্ষ্য করে আসা কয়েক ডজন ড্রোন প্রতিহত করেছে। দুবাইয়ের আকাশে কালো ধোঁয়া দেখা গেছে। ওমানে ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে দুইজন নিহত হয়েছে এবং তুরস্কে নেটোর ইনসিরলিক বিমান ঘাঁটিতে সতর্ক সংকেত বাজানো হয়েছে।
এদিকে, এই যুদ্ধে ফ্রান্স তাদের প্রথম সৈন্য হারিয়েছে। ইরাকের ইরবিল অঞ্চলে এক ইরানি ড্রোন হামলায় ৪২ বছর বয়সী আরনোড ফ্রিওন নিহত হয়েছেন। এছাড়া, ইরাকে একটি মার্কিন রিফুয়েলিং বিমান বিধ্বস্ত হয়ে চারজন ক্রু নিহত হয়েছে। লেবাননেও ইসরায়েলি হামলায় নিহতের সংখ্যা ৬৮৭ ছাড়িয়েছে; বৈরুত এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
‘বিপদের মধ্যে আছি’ :
ইরানের নতুন নেতা মোজতবা খামেনি হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখার ঘোষণা দেওয়ায় তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলারের উপরে অবস্থান করছে। দুবাইয়ের উত্তরে আটকে পড়া এক চীনা নাবিক ওয়াং শাং এএফপি-কে বলেন, ‘প্রতিদিন আমি এখান থেকে মিসাইল উৎক্ষেপণ দেখি এবং বিস্ফোরণের শব্দ শুনি। মনে হচ্ছে আমি চরম বিপদের মধ্যে আছি।’





