জনশক্তি রপ্তানিতে ধাক্কা : কমতে পারে রেমিট্যান্স
প্রকাশিত হয়েছে : ১৩ মার্চ ২০২৬, ৯:৫৯:৩৬ অপরাহ্ন

জালালাবাদ ডেস্ক : মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে দীর্ঘমেয়াদি অভিঘাত পড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি ও প্রাবাসী আয়ে। চলমান ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে গত ১৩ দিনে বাতিল করা হয়েছে ৪২৩টি ফ্লাইট। মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে তীব্র যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ায় নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে ফেরা এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে অনেক প্রবাসীর। নতুন করে বিদেশ যাত্রার জন্য যাদের ভিসা ও চাকরির প্রস্তুতি ছিল, তাদের অনেকেই এখন ফ্লাইট সংকটের কারণে বিদেশে যেতে পারছেন না। ফলে ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কার পাশাপাশি চাকরি হারানোর শঙ্কাও রয়েছে। একই সঙ্গে টিকিট বাতিল, যাত্রী কমে যাওয়া এবং ভিসা প্রসেসিং জটিলতায় যাত্রীদের পাশাপাশি বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছে বিদেশে কর্মী পাঠানোর কাজে নিয়োজিত ট্রাভেল এজেন্সি ও রিক্রুটিং প্রতিষ্ঠানগুলো।
যদিও মধ্যপ্রাচ্যে বেশকিছু রাষ্ট্র ইতোমধ্যে শ্রমিকদের ছুটির মেয়াদ বাড়িয়েছে, তবে ভিসা মেয়াদ পেরিয়ে গেলে পুরায় ভিসা পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা রয়েই গেছে। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বিদেশে কর্মী পাঠানো কমে যাবে, সেইসঙ্গে রেমিট্যান্স প্রবাহেও ভাটা দেখা দিতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মুন্সি এয়ার ট্রাভেলসের মালিক মো. সামছুল ইসলাম বলেন, ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রভাব ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের জীবনে গুরুতর দুর্ভোগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে সৌদি আরব, ওমান, কাতার, বাহরাইন ও দুবাইগামী যাত্রীদের মধ্যে অনেকেই ছুটিতে দেশে এসেছেন, কিংবা পরিবারের সঙ্গে ঈদ উদ্যাপনের জন্য আগেই টিকিট কেটে রেখেছিলেন। কিন্তু চলমান ফ্লাইট বিপর্যয়ের কারণে তাদের নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে ফিরে যাওয়া অনেকটাই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছেন সৌদি আরব প্রবাসীরা। অনেকের ভিসার মেয়াদ শেষের পথে, আবার অনেকের ছুটির মেয়াদও প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। কিন্তু ফ্লাইট সংকটের কারণে তারা সময়মতো ফিরতে পারছেন না। ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে তাদের সৌদি আরবে আবার প্রবেশ করা সম্ভব হবে না, যা তাদের জন্য বড় ধরনের আর্থিক ও মানসিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য তিনি বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমানে অনেক কর্মীর সৌদি আরবের ভিসা সম্পন্ন হলেও ম্যানপাওয়ার-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে অনেকে এখনও দেশ ছাড়তে পারছেন না। এ বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।
লাল এয়ার ইন্টারন্যাশনাল নামের এক এজেন্সির মালিক সাদ্দাম হোসেন বলেন, তাদের প্রতিষ্ঠান থেকে সাধারণত প্রতি মাসে ১২ থেকে ২০ জন কর্মী মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কাজের উদ্দেশে যেতেন। তবে সাম্প্রতিক যুদ্ধের চলমান পরিস্থিতির কারণে সাময়িকভাবে জনশক্তি পাঠানো কিছুটা ব্যাহত হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবারও নিয়মিতভাবে কর্মী পাঠানো শুরু হবে এবং অনেক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
সাশ্রয় এয়ার সার্ভিসের মালিক জোবায়ের আহমেদ অপু বলেন, যুদ্ধের চলমান পরিস্থিতির কারণে দুবাই, কাতার ও কুয়েতগামী অনেক টিকিট ইতোমধ্যেই বাতিল করতে হয়েছে। আগে যেসব টিকিট নেওয়া হয়েছিল, সেগুলো বাতিল হওয়ায় আমরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছি। এ পরিস্থিতির প্রভাবে যাত্রী চলাচল কমে গেছে, ফলে ব্যবসায়িক কার্যক্রমও অনেকটা ধীর হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, বর্তমানে কিছু যাত্রী পাঠানো গেলেও আগের মতো স্বাভাবিকভাবে ফ্লাইট পরিচালনা করা যাচ্ছে না। অনেক ফ্লাইট সরাসরি গন্তব্যে না গিয়ে রিয়াদ, জেদ্দা কিংবা মদিনার মতো জায়গায় ডাইভার্ট করা হচ্ছে। এতে যাত্রীদের খরচ বেড়ে যাচ্ছে এবং অনেকেই অতিরিক্ত খরচ বহন করতে না পারায় যাত্রা স্থগিত রাখছেন। এর ফলে ট্রাভেল এজেন্সিগুলোকেও নানা ধরনের সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে।
সরকারি সহযোগিতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ বিষয়ে সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমানে সংগঠনগুলোতে প্রশাসক থাকলেও নেতৃত্বস্থানীয় প্রতিনিধিত্ব না থাকায় ট্রাভেল এজেন্সি ব্যবসায়ীদের সমস্যাগুলো যথাযথভাবে সরকারের কাছে তুলে ধরা যাচ্ছে না। ফলে ব্যবসায়ীদের দুর্ভোগ ও ক্ষতির বিষয়টি অনেকটাই অমীমাংসিত থেকে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজের (বায়রা) সাবেক যুগ্ম মহাসচিব ফখরুল ইসলাম বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্টদের করার মতো খুব বেশি কিছু নেই। যুদ্ধের কারণে অনেক ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় ইতোমধ্যে কয়েকশ’ যাত্রী নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে যেতে পারেননি। ফলে অনেকের ভিসার মেয়াদ ইতোমধ্যে শেষ হয়ে গেছে, আবার অনেকের শেষ হওয়ার পথে রয়েছে বা শিগগিরই শেষ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে তারা সরাসরি ক্ষতির মুখে পড়ছেন। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে কাতার সরকার ভিসার মেয়াদ এক মাস বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একইভাবে ওমান, বাহরাইন, দুবাই ও সৌদি আরবের মতো দেশগুলোও যদি যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে যেতে না পারা কর্মীদের ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়, তাহলে প্রবাসী কর্মীদের জন্য তা বড় ধরনের স্বস্তি বয়ে আনবে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিকভাবে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত অনেক বাংলাদেশি কর্মীও অনিশ্চয়তার মধ্যে আছেন। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে অনেক জায়গায় কর্মস্থলে স্বাভাবিকভাবে কাজ করা যাচ্ছে না, অনেককে বাসায় অবস্থান করতে হচ্ছে এবং নিরাপত্তা ঝুঁকিও রয়েছে। যুদ্ধ কতদিন চলবে তার ওপর নির্ভর করে তাদের পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে বিদেশে কর্মী যাওয়ার প্রবণতা কমে যেতে পারে। এতে নতুন কর্মী পাঠানো কমে যাবে এবং প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স প্রবাহের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সরকারকে কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে এসব সমস্যার সমাধানে উদ্যোগী হতে হবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে কিছু দেশে কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া সাময়িকভাবে ধীর হয়ে গেছে। তবে সরকার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রবাসী কর্মীদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবারও নিয়মিতভাবে কর্মী পাঠানোর কার্যক্রম জোরদার করা হবে। এতে দেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান বাড়বে এবং রেমিট্যান্স প্রবাহও আরও শক্তিশালী হবে।
বিএমইটি’র তথ্যমতে, বাংলাদেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়ার বহির্গমন ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সৌদি আরবে ১২ হাজার ৩৬৯ জন, কাতারে ৩ হাজার ৫৩৫ জন, কুয়েতে ১ হাজার ২৩ জন, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৭০৫ জন, জর্ডানে ৬৮৭ জন, ইরাকে ৪১১ জন ও লেবাননে ২৯ জন। তাদের ১ মার্চ থেকে ১২ মার্চ পর্যন্ত বহির্গমন ছাড়পত্র দেওয়া হয়। যদিও ফ্লাইট বন্ধ থাকার কারণে তারা এখনো দেশে আছেন।
উপসাগরীয় অঞ্চলে চলমান উত্তজনার মধ্যে কাতারে আটকে পড়া বাংলাদেশিদের দেশে ফেরাতে বিশেষ ফ্লাইটের ব্যবস্থা করছে দোহার বাংলাদেশ দূতাবাস। এ বিষয়ে তারা কাতার সরকার ও কাতার এয়ারওয়েজের সঙ্গে কাজ করছে। ১১ মার্চ জারি করা এক জরুরি বার্তায় দূতাবাস জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভ্রমণ সহজ করতে তারা কাতার সরকার ও কাতার এয়ারওয়েজের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রক্ষা করছে।





